× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ডিজেল ও সার সংকটে করণীয়

ড. মো. শহিদুল ইসলাম

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:২৪ পিএম

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক কঠিন ও সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামান্য ব্যত্যয়ও উৎপাদনব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।  গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক কঠিন ও সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামান্য ব্যত্যয়ও উৎপাদনব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক কঠিন ও সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামান্য ব্যত্যয়ও উৎপাদনব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ভরা বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলের ঘাটতি ও অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য এবং একই সঙ্গে বাজারে সারের অপ্রতুলতাÑ এই দুই সংকট একযোগে কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, কোথাও কোথাও ইউরিয়া নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০-৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে; আবার অনেক এলাকায় ডিজেলের অভাবে সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, যা ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, কৃষকের লাভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে এবং সার্বিকভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে মৌসুমি প্রেক্ষাপটটি গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বোরো ধানের ক্ষেত্রে অধিকাংশ জমিতে সারের প্রয়োগ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে; এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নিরবচ্ছিন্ন ও সময়মতো সেচ নিশ্চিত করা, যা ফলন নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সামনে জুলাই-সেপ্টেম্বরের আমন মৌসুম এবং তার পরপরই রবি মৌসুম (গম, ভুট্টা, আলু, সরিষা, ডাল, বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজি)Ñ এই সময়গুলোতে সারের চাহিদা আবার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। ফলে এখনই সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করলে, আগামী মৌসুমগুলোতে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংকটের মূল কারণ

এই সংকটের পেছনে কয়েকটি গভীর ও কাঠামোগত কারণ কাজ করছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। 

প্রথমত, গ্যাস সংকটের কারণে দেশের চারটি প্রধান সার কারখানাÑ শাহজালাল সার কারখানা (সিলেট), চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল), যমুনা সার কারখানা (জামালপুর) এবং আশুগঞ্জ সার কারখানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) দীর্ঘদিন ধরে আংশিকভাবে বন্ধ ছিল, যা বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশীয় সার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের স্বল্পতার কারণে ডিএপি (DAP) সারের উৎপাদনও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, যা ফসফরাস সরবরাহে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

বর্তমানে কেবল নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপন্ন হচ্ছে। তবে দেশের মোট চাহিদার তুলনায় এই উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত, যা সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রাখতে যথেষ্ট নয়।

দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ডিজেলের মূল্য ও সরবরাহকে সরাসরি প্রভাবিত করছে, যা কৃষি খাতে তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি করছে। 

তৃতীয়ত, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন সংকট এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি- এই বিষয়গুলো মাঠপর্যায়ে সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং কৃষকদের ভোগান্তি বৃদ্ধি করছে। 

চতুর্থত, প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ এখনও ডিজেল-নির্ভর হওয়ায় জ্বালানির ওপর কৃষির অতিনির্ভরতা একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

তাৎক্ষণিক করণীয় (স্বল্পমেয়াদি)

প্রথমত, সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে সারের সরবরাহ-শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। ডিলার পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত মূল্য আদায় কঠোরভাবে দমন করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে সার পেতে পারেন। 

দ্বিতীয়ত, বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম সচল রাখতে কৃষি অঞ্চলে ডিজেলের বিশেষ বরাদ্দ বা ‘অগ্রাধিকার সরবরাহ’ নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ভর্তুকি বা মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষকদের সেচ খরচ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা দরকার।

তৃতীয়ত, বিদ্যুতের লোডশেডিং কমিয়ে বৈদ্যুতিক সেচব্যবস্থাকে সচল ও নিরবচ্ছিন্ন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে সম্ভব, ডিজেলচালিত পাম্পের পরিবর্তে বিদ্যুতচালিত পাম্প ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তাও দিতে হবে।

চতুর্থত, দ্রুত আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন করে আমন মৌসুমের আগেই পর্যাপ্ত সার মজুদ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ইউরিয়া, টিএসপি/ডিএপি এবং এমওপিÑ এই তিনটি প্রধান সারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ‘সেফটি স্টক’ বজায় রাখা অত্যাবশ্যক, যাতে হঠাৎ কোনো ঘাটতি দেখা দিলে তা দ্রুত মোকাবিলা করা যায় এবং কৃষি উৎপাদন বিঘ্নিত না হয়। 

মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট থেকে টেকসই উত্তরণের জন্য কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য। 

প্রথমত, দেশীয় সার কারখানাগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখতে হবে, যাতে উৎপাদন ধারাবাহিক থাকে এবং আমদানির ওপর চাপ কমে। দ্বিতীয়ত, আমদানির উৎস বৈচিত্র্য করতে হবে, যাতে কোনো একটি অঞ্চল বা দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমে এবং সরবরাহ ঝুঁকি হ্রাস পায়। তৃতীয়ত, কৃষিতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে বিকল্প শক্তির ব্যবহারÑ যেমন সৌরচালিত সেচ পাম্পÑ দ্রুত সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত জরুরি। এটি একদিকে ডিজেল এবং বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে সেচ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে। চতুর্থত, ‘বেশি সার ব্যবহার’ থেকে ‘প্রতি ইউনিট সারে বেশি উৎপাদন’Ñ এই নীতিতে একটি সুস্পষ্ট রূপান্তর ঘটাতে হবে। অর্থাৎ সার ব্যবহারের দক্ষতা (NUE) বৃদ্ধি করাই হবে মূল লক্ষ্য, যাতে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেই অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা যায় এবং কৃষিব্যবস্থাকে আরও টেকসই করা সম্ভব হয়।

কৃষকদের জন্য বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ

বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদেরও কিছু কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক কৌশল অবলম্বন করা জরুরি, যা স্বল্প খরচে উৎপাদন ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

১। সেচ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা: জমিতে অপ্রয়োজনীয় পানি প্রয়োগ না করে ‘অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (AWD)’ পদ্ধতি অনুসরণ করলে ২০-৩০% পর্যন্ত পানি ও জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। এতে একদিকে খরচ কমে, অন্যদিকে মাটির স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটে।

২। সুষম সার প্রয়োগ: শুধুমাত্র ইউরিয়ার ওপর নির্ভর না করে ফসফরাস, পটাশ, সালফার ও জিংকসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সুষমভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এতে ফলন বৃদ্ধি পায় এবং ইউরিয়ার কার্যকারিতা আরও বাড়ে।

৩। স্প্লিট অ্যাপ্লিকেশন: ইউরিয়া একবারে প্রয়োগ না করে ২-৩ কিস্তিতে প্রয়োগ করলে নাইট্রোজেনের ক্ষতি কমে এবং সারের ব্যবহার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

৪। গভীর স্থাপন (UDP/গুটি ইউরিয়া): বিশেষ করে ধান চাষের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে নাইট্রোজেনের অপচয় কমে এবং তুলনামূলক কম সার দিয়েই বেশি ফলন অর্জন করা সম্ভব হয়।

৫। জৈব সার ও মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা: গোবর, কম্পোস্ট, মুরগি সার, ভার্মি কম্পোস্ট, সবুজ সার ইত্যাদি ব্যবহার করে মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করলে রাসায়নিক সারের চাহিদা কমে এবং মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ে, যা সেচের প্রয়োজনও কমাতে সহায়তা করে।

৬। সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ: কৃষকরা দলবদ্ধভাবে ডিজেল ক্রয়, সেচ ব্যবস্থাপনা বা কৃষিযন্ত্রের যৌথ ব্যবহার করলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

নীতিনির্ধারকদের জন্য বার্তা

এই সংকট শুধুমাত্র একটি মৌসুমি সমস্যা নয়Ñ এটি কৃষিব্যবস্থার গভীরতর কাঠামোগত দুর্বলতার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত তাৎক্ষণিক বা স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দিকে সমানভাবে নজর দেওয়া। বিশেষ করে কৃষি খাতে জ্বালানি ও সারের স্থিতিশীল, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার একটি মৌলিক পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

বস্তুত ডিজেল ও সারের বর্তমান সংকট যদি দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা না করা হয়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা, বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়বে। তবে সুপরিকল্পিত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপÑ একদিকে সরকারের কার্যকর নীতি ও প্রশাসনিক তৎপরতা, অন্যদিকে কৃষকের দক্ষ ও সচেতন ব্যবস্থাপনাÑ এই দুইয়ের সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এখনই সময় বাস্তবমুখী, তথ্যভিত্তিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণের, যাতে আসন্ন আমন ও রবি মৌসুম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায় এবং দেশের কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে ‘সময়ের এক ফোড়, অসময়ের দশ ফোড়’ প্রবচনটি স্মরণে রাখা আবশ্যক।


ড. মো. শহিদুল ইসলাম

মৃত্তিকাবিজ্ঞানী ও প্রাক্তন মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা