× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ সম্ভব হবে কি

শরিফুল খান প্লাবন

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:০৯ পিএম

আওয়ামী লীগের পতন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগের পতন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তা হলোÑ আওয়ামী লীগ আর রাজনীতিতে ফিরতে পারবে কি না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের পরিবর্তিত  রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি অবান্তর নয়। কেননা, দীর্ঘ পনের বছরের দুঃশাসনে ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটি জনমনে এতটাই ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল যে, প্রচণ্ড গণরোষের মুখে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে যেতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের এ পতন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। দেশের রাজনীতির প্রধান দুই নিয়ন্ত্রক দলের একটির হঠাৎ দৃশ্যপট থেকে সরে যাওয়া অনিবার্য শূন্যতা সৃষ্টি করেছে তা অস্বীকার করা যাবে না। দলটি একখন কার্যত নিষিদ্ধ। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সৃষ্ট এ রাজনৈতিক শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে? নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি কি সে শূন্যস্থান পূরণ করবে, নাকি আওয়ামী লীগই আবকার ফিরে আসবে? 

ক্ষমতার মসনদ থেকে ছিটকে পড়ার পর থেকেই ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ কথাািট শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ মাঠে নামছে এমন একটি কথা চাউর হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত এর বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি। ধারণাটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এই আলোচনার সাথে জুড়ে গেছে সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম। বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা।

গুঞ্জনের সূত্রপাত ২০২৫ সালের মার্চে। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেসবুকে দাবি করেন, উচ্চপর্যায়ে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ গঠনের পরিকল্পনা আলোচনা হয়েছে এবং সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরীন শারমিন ও ফজলে নূর তাপসকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ১১ মার্চ দুপুরে তার কাছে এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয় এবং আসন সমঝোতার বিনিময়ে প্রস্তাব মেনে নিতে বলা হয়। প্রস্তাবকারীদের বক্তব্য ছিল, নতুন নেতৃত্ব শেখ হাসিনাকে প্রত্যাখ্যান করবে, শেখ পরিবারের অপরাধ স্বীকার করবে এবং ‘বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ’ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হবে। হাসনাত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং তা প্রকাশ্যে জানান। তবে গণঅভ্যুত্থানের আরেক নেতা সারজিস আলম বিষয়টিকে কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, সেনাপ্রধান এটিকে সরাসরি ‘প্রস্তাব’ হিসেবে নয়, বরং ‘অভিমত’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই দুই বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি হলো ষড়যন্ত্রের সরাসরি অভিযোগ, আর অন্যটি হলো রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে একটি প্রস্তাব। দুটির মধ্যে যেটিই সত্য হোক না কেন, মূল বিষয়টি স্পষ্টÑ আওয়ামী লীগের একটি নতুন সংস্করণের কথা উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে এবং এই আলোচনা এখন আর কেবল গুজবের পর্যায়ে নেই।

এই বিতর্কের মাঝেই সাম্প্রতিক আইনি প্রক্রিয়ায় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর জামিনপ্রাপ্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত ৭ এপ্রিল ভোরে ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ এবং জুলাই আন্দোলনের সময়কার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়। তারপর মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে, ১২ এপ্রিল সন্ধ্যায় কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি। দেড় বছরেরও বেশি সময় আত্মগোপনে থাকার পর এই দ্রুত গ্রেপ্তার এবং তারও চেয়ে দ্রুত জামিনে মুক্তির বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই দ্রুত জামিন নিয়ে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এক দল মনে করে এটি রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রথম সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। অন্য দল মনে করে এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ইকতেদার আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, জামিনযোগ্য অপরাধে আদালত জামিন দিতেই পারেন এবং এটি বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ এখতিয়ার। আন্তর্জাতিক চাপে এসব জামিন হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ (অব.)  বীরবিক্রমও এই জামিনকে ‘ভালো সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং বলেছেন বিচার বিভাগ নিশ্চয়ই বিচার-বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন এবং এরপর থেকে টানা তিন মেয়াদে এই দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এই রাজনীতিবিদ দলীয় কোন্দল বা দুর্নীতির বড় অভিযোগে কখনও সমালোচিত হননি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার পরিচিতি ছিল। এই কারণেই তাকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ ধারণাকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো স্পষ্টভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জুলাই গণহত্যার বিচারের আগে আওয়ামী লীগের যেকোনো তৎপরতা ফ্যাসিবাদের পুনরুজ্জীবন রোধ এবং দলটির নিবন্ধন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলঅদেশের মতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বহুদলীয় প্রতিযোগিতার জন্য আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ একটি দলের তৎপরতা অপরিহার্য। এর আগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক একটি প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠকে জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই, তবে অভিযুক্তদের বিচার হবে। এই অবস্থান মূলত দুটি লক্ষ্যের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টাÑ একদিকে ন্যায়বিচার, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীরে শিকড় প্রোথিত একটি শক্তি। ১৯৭৫ সালের ভয়াবহ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পরেও দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে দলটির যে আবেগীয় এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, তা উপেক্ষা করা খুব সহজ নয়। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে যে শত শত মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, তাদের পরিবারের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার তথা জাতির সে আকাঙ ্ক্ষার বিপরীতে গিয়ে কোনো রকম রাজনৈতিক সিদ্ধা্ন্ত বুমেরাং হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। 

প্রকৃতপক্ষে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ প্রশ্নটি একটি মৌলিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে রয়েছে গণঅভ্যুত্থানের ন্যায়বিচারের দাবি, অন্যদিকে রয়েছে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সকলের অংশগ্রহণের নীতি। এই দুটি দাবিকে একসাথে সম্মান জানানোর পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধী নেতা-কর্মীকে বাদ দিয়ে দলটিকে পুনর্গঠন করা গেলে অনেক প্রশ্নেরই ইতি ঘটবে। চব্বিশের গণঅভুত্থান ও পনের বছরের লীগ শাসনামলে উৎপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ছঁেটে ফেলে যদি উদ্যোক্তারা দলটিকে পুনর্জীবিত করতে পারেন, সেক্ষেত্রে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ ধারণাটি বাস্তব রূপ পেলে পেতেও পারে। নচেৎ তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। 

বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করার নিয়ামক শক্তি  এদেশের জনগণ। কোনো দলকে কৃত্রিমভাবে পুনর্বাসন বা ওপর থেকে চাপিয়ে দিলে তা টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার কোনো দলকে জোরপূর্বক রাজনীতি থেকে চিরতরে মুছে ফেলাও কঠিন। ইতিহাস এর সাক্ষী। একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন জবাবদিহিতা, সংস্কার এবং সত্যিকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাÑ কেবল নামের পরিবর্তন নয়। যদি কথিত রিফাউন্ড আওয়ামী লীগ ধারণা বাস্তবেক রূপ নেয়, তাহলে দলটিকে তার চরিত্রের সব কলুষতা ধুয়েমুছে সাফ করে পরিশীলিত গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে হবে। মনে রাখতে হবে, অগণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে যে তকমা আওয়ামী লীগের গায়ে লেগেছে, তা থেকে মুক্ত হতে হলে দলটির নেতাকর্মীদের মানসিকতা ও নীতি-আদর্শও রিফাইন্ড করতে হবে।


শরিফুল খান প্লাবন

মালয়েশিয়া প্রবাসী লেখক-সাংবাদিক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা