সাইফুল হক মোল্লা দুলু
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:২৪ পিএম
প্রতিবছর এপ্রিল মাসের শেষ বুধবার বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক শব্দসচেতনতা দিবস পালন করা হয়ে থাকে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রতিবছর এপ্রিল মাসের শেষ বুধবার বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক শব্দসচেতনতা দিবস পালন করা হয়ে থাকে। শব্দদূষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমেরিকান ‘সেন্টার ফর হিয়ারিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন’ ও ‘লিদিন ফর দ্য হার্ড অব হেয়ারিং’ ১৯৯৬ সাল থেকে এপ্রিল মাসের শেষ বুধবার দিবসটি পালন করে আসছে। যদিও বাংলাদেশে ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারিভাবে এবং ২০১৫ সাল থেকে সরকারিভাবে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। এ বছর ২৯ এপ্রিল দিসবটি পালন করা হচ্ছে। শব্দদূষণের উৎস, শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিকসমূহ শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে করণীয় সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা, শব্দদূষণের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বিষয়ে প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা এবং সকল স্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এই দিবসটি পালন করা হলে তবেই দিবস উদযাপনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।
আন্তর্জাতিক শব্দসচেতনতা দিবস পালনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারত্বমূলক প্রকল্প’ পক্ষ থেকে রাজধানী ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, আবাসিক সোসাইটি, পরিবেশবাদী ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে সমাবেশ আয়োজন করা হয়েছে। সারা দেশে ৬৪ জেলায় জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা ও বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে দিবসটি উপলক্ষে শোভাযাত্রা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। একই সাথে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটওভার ব্রিজে ব্যানার ও দৃশ্যমান স্থানে ফেস্টুন সাঁটানো হয়েছে।
যেসব কারণে শব্দদূষণ বেড়ে চলেছে তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো গাড়ির হর্ন ও ইঞ্জিনের শব্দ, বিভিন্ন নির্মাণ কাজের শব্দ, মেশিনে ইট ও পাথর ভাঙার শব্দ, কলকারখানার মেশিন হতে নির্গত শব্দ, গ্রিলের দোকানে ও ওয়ার্কশপের শব্দ, শিল্প কলকারখানা/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান/বাণিজ্যিক ভবন হাসপাতাল/ক্লিনিকে ব্যবহৃত জেনারেটরের শব্দ, নির্বিচারে লাউড স্পিকারের শব্দ, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মাইক বা লাউড স্পিকারের শব্দ ইত্যাদি শব্দদূষণের অন্যতম কারণ বা উৎস। পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারত্বমূলক প্রকল্প’ পক্ষ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিচালিত জরিপ প্রতিবেদনে ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগের শব্দদূষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। যার মধ্যে গাড়ির হর্নকে শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়ার জন্য অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারিভাবে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্টজনদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ আটচল্লিশ হাজারজনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। জনগণের মধ্যে সচেতনতাবোধ বাড়াতে ক্যাম্পেইন কার্যক্রম চলমান আছে। সারাদেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। পত্রিকা, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা কার্যক্রম চলমান আছে। একই সাথে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালাকে হালনাগাদ করে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২৫ জারি করা হয়েছে। এই বিধিমালায় বেশ কিছু নতুন এবং কার্যকরী বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ ১. কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ব্যতীত পাবলিক প্লেসে বা জনপরিসরে লাউড স্পিকার, মাইক, এমপ্লিফায়ার, মিউজিক সিস্টেম বা অন্য কোনো উচ্চশব্দ উৎপন্নকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না; ২. কোনো ব্যক্তি ট্রাফিক সার্জেন্ট পদমর্যাদার কোনো পুলিশ কর্মকর্তার সম্মুখে শব্দদূষণের কোনো অপরাধ সংঘটন করলে উক্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই তাকে জরিমানা আরোপ করতে পারবেন; ৩. নীরব এলাকায় যানবাহনে কোনো প্রকার হর্ন বাজানো যাবে না; ৪. আবাসিক এলাকার ৫০০ মিটারের মধ্যে নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত উচ্চশব্দ সৃষ্টিকারী মেশিন সন্ধ্যা ৭টা হতে ভোর ৭টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে না; ৫. যেকোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যা ৯০ ডেসিবলের বেশি হতে পারবে না ও রাত্রিকাল ১১ ঘটিকা অতিক্রম করবে না; ৬. বনে অর্থাৎ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে বনভোজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, মানবদেহের জন্য শব্দের নিরাপদ মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবল। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, হাইড্রোলিক হর্ন ৯০-১১৫ ডেসিবল, শব্দযন্ত্র/সাউন্ড সিস্টেম ১২০ ডেসিবল, হেডফোন ১৩৫ ডেসিবল শব্দ তৈরি করে। শব্দদূষণের ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া, বধিরতা, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, শিক্ষার্থীদের স্মরণশক্তি হ্রাস, অমনোযোগী আচরণ, ঘুমের ব্যাঘাতসহ নানারকম সমস্যা দেখা দেয়। উচ্চশব্দ শিশু, গর্ভবতী মা এবং হৃদরোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। উচ্চমাত্রার শব্দে শিশুর শ্রবণশক্তি হ্রাসসহ মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শব্দদূষণের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়ে বিশ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ শব্দদূষণের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ৩০টি কঠিন রোগের কারণসমূহের মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ মাত্রা ৪৫-৬০ ডেসিবল। ৫০ ডেসিবলের উচ্চশব্দ উচ্চরক্তচাপের কারণ। ৬৫ ডেসিবলের উচ্চশব্দ হৃদরোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। ৯০ ডেসিবলের অধিক শব্দ স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ১০০ ডেসিবলের উচ্চশব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি ধ্বংস করে বধির করে দেয়। গর্ভবতী নারী দীর্ঘ সময় শব্দদূষণের মধ্যে অবস্থান করলে সন্তান বধির হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
শুধু মানুষ নয়, শব্দদূষণের কারণে প্রাণীর বংশবৃদ্ধি হ্রাস পায় ও শস্যের উৎপাদন কমে যায়। আকস্মিক উচ্চশব্দে এবং তীব্র আলোর কারণে হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে প্রাণীর মৃত্যুও ঘটে। নদীতে চলাচলকারী জলযানের উচ্চশব্দে মাছের প্রজনন কমে যায় এবং বিরল প্রজাতির জলজ প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে। এমনকি উচ্চশব্দের কারণে প্রার্থনা পর্যন্ত ব্যাহত হয় এবং অফিস আদালতে কাজের মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিশুসহ অসুস্থদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।
পরিবেশের যতগুলো দূষণ আছে তার মধ্যে শব্দদূষণ একটি অন্যতম দূষণে পরিণত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই শব্দদূষণের উৎস বেড়ে চলেছে। ফলে প্রতিনিয়তই শব্দদূষণ বেড়ে চলেছে। জেলা, উপজেলা শহরে পর্যন্ত সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি শব্দদূষণ হচ্ছে। আর বিভাগীয় শহরের কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। শব্দদূষণের কারণে মানুষের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় প্রভাব পড়ছে। শব্দদূষণের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্ক রোগী বিশেষ করে হৃদরোগে আক্রান্তদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে শব্দদূষণ। অনেকে শব্দদূষণকে নীরব ঘাতক বলে থাকে। প্রকৃতপক্ষে শব্দদূষণ সরব ঘাতক, যা নীরবে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি সকলের সচেতনতাবোধ এবং এর সাথে সংশ্লিষ্টজনদের দায়িত্বশীলতাই পারে ভয়াবহ আকার ধারণ করা শব্দদূষণের মতো একটি পরিবেশগত দূষণের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নানামুখী আইন আর উচ্চ আদালতের দুই দফায় নির্দেশনা জারির পরও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না নীরব এই ঘাতককে। যারা শব্দদূষণ করছে তারাও সরাসরি এর ক্ষতির শিকার হচ্ছে। কাজেই সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি আমাদের সকলকেই সচেতন হতে হবে। শব্দদূষণমুক্ত পরিবেশ বিনির্মাণে সরকারি উদ্যোগে শব্দদূষণের উৎসসমূহ বন্ধ করার পাশাপশি এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে এবং দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, তবেই শব্দদূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
সাইফুল হক মোল্লা দুলু
সিনিয়র সাংবাদিক