হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:১৮ পিএম
বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট যে দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করছে, তার স্পষ্ট সতর্কবার্তা এসেছে জাতিসংঘে পেশ করা সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’-এ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট যে দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করছে, তার স্পষ্ট সতর্কবার্তা এসেছে জাতিসংঘে পেশ করা সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’-এ। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ৪৭টি দেশের প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকট ও অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাসÑ সব মিলিয়ে বিশ্ব এক অনিশ্চিত খাদ্য ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলোকে খাদ্য সংকটের ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। যদিও দেশটি এখনও তীব্র দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েনি, তবুও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একদিকে জনসংখ্যার চাপ এবং নগরায়ণের কারণে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি উৎপাদন বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও লবণাক্ততা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংকট, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছেÑ সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে খাদ্য সংকট সবচেয়ে তীব্র। যদিও বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধবিধ্বস্ত নয়, তবে বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও নয়। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়ছে। ফলে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি সমন্বিত ও দূরদর্শী খাদ্য নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করা।
প্রথমত, কৃষি খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। উন্নত বীজ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং ঝুঁকি কমবে।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। লবণাক্ততা সহনশীল ধান, খরা সহনশীল ফসল এবং স্বল্প সময়ে ফলনশীল জাতের উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য বীমা সুবিধা চালু করা গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য। উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ শৃঙ্খলে নানা ধরনের অপচয় ও মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষক-ভোক্তা সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস এই ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
চতুর্থত, খাদ্য মজুদ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। আধুনিক গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ এবং প্রযুক্তি-নির্ভর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুললে এই অপচয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
পঞ্চমত, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ করতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এতে প্রকৃত উপকারভোগীরা সহায়তা পাবেন এবং অপচয় কমবে।
ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা প্রয়োজন। খাদ্য আমদানির ক্ষেত্রে বহুমুখী উৎস নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে আরও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার দিকে জোর দিতে হবে। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বিকল্প খাদ্য উৎসের উন্নয়ন এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাÑ এই তিনটি বিষয়ের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, খাদ্য সংকট এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়Ñ এটি একটি চলমান বাস্তবতা। জাতিসংঘের সতর্কবার্তা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেতÑ এখনই সময় প্রস্তুতি নেওয়ার। পরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং কার্যকর নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, সমন্বিত পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।
হাবিব বাবুল
জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক