× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিশুদের খাবারে শকুনের থাবা

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫৪ পিএম

শিশুদের খাবারে শকুনের থাবা

বেশ কয়েক বছর আগে লায়ন্স ক্লাবস ইন্টারন্যাশনালের একজন নবনির্বাচিত গভর্নরের আহ্বান ছিলÑ ‘শিশুর যত্নে পৃথিবী সুন্দর’। তিনি যে তার আহ্বান হিসেবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে নির্ধারণ করেছিলেন, তা অস্বীকার করা যাবে না। কেননা, শিশুরাই আগামীর নাগরিক। শুধু একটি দেশ নয়, তারা গোটা পৃথিবীর সম্পদ। তারা যদি সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে, তাহলে পরবর্তী সময়ে দেশ, জাতি, এমনকি বিশ্বের নেতৃত্বের ড্রাইভিং সিটে বসতে পারবে। বলা হয়ে থাকে, ‘সুস্থ শিশু, সুস্থ জাতি’। আজকের শিশুরা যদি সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়, তাহলে তারা পরবর্তী সময়ে সুস্থ নাগরিক হিসেবে দেশ, জাতি এবং পৃথিবীর কল্যাণে অবদান রাখতে পারবে।

শিশুদের স্বাস্থ্য পরিচর্যার অংশ হিসেবেই সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি চালু করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল বহুমাত্রিক। প্রথমত, স্কুলে অধ্যয়নরত শিশুরা যাতে বাড়ির বাইরে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পায় তার ব্যবস্থ করা। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা। তৃতীয়ত, শিশুরা যাতে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত হয়। চতুর্থত, বাড়ির বাইরে দীর্ঘক্ষণ থাকার সময় যাতে শিশুরা অভুক্ত না থাকে। কেননা, দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকলে শারীরিক দুর্বলতা শিশুদের শ্রেণিকক্ষে অধ্যয়নে মনোনিবেশ ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। সেজন্য এই মধ্যাহ্ন খাবারের ব্যবস্থা করেছে সরকার। শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি। সেদিকে লক্ষ রেখে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করাও এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। শিশুরা যাতে সঠিকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত টিফিন পায়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে একটি কমিটি এ কার্যক্রম দেখাশোনা করে। নির্ধারিত ঠিকাদার শিশুদের জন্য প্রতিদিন তালিকাভুক্ত বিদ্যালয়সমূহে খাবার সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে।

গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘লোভে বিপন্ন শিশুরা’ শিরোনামে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এ কথা বলা বোধ করি অত্যুক্তি হবে না যে, শিশুদের খাবারেও অর্থলোভী শকুনদের নজর পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিকর ও মানসম্মত টিফিন সরবরাহ করার কড়া নির্দেশ থাকলেও ঠিকাদাররা থোড়াই কেয়ার করে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করছে। মাঝেমধ্যেই পরিবেশন করা হচ্ছে পচা কিংবা অপরিপক্ব কলা, ছোট ও নিম্নমানের ডিম, ফাঙ্গাস পড়া বনরুটিসহ দুর্গন্ধযুক্ত খাবার। এসব খাবার খেয়ে বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নরসিংদী, মাদারীপুর, পিরোজপুর, কিশোরগঞ্জ, ঝালকাঠি, বরগুনা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মানহীন ও পচা খাবার খেয়ে শিশুদের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত রবিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মকরমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিফিন হিসেবে দেওয়া ডিম খেয়ে শতাধিক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরকম ঘটনা দেশের অন্যান্য এলাকায়ও ঘটেছে। তা ছাড়া বেশিরভাগ সময় শিশুদের পুরো খাবার না দিয়ে আংশিক দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সরবরাহকৃত খাবারে নির্দিষ্ট প্যাকেজিং বা চিহ্ন না থাকায় শিশুদের না দিয়ে সে খাবার ঠিকাদাররা বাইরে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী নরসিংদীর কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করার সময় এ ব্যাপারে অব্যস্থাপনা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং শিশুদের মানসম্পন্ন টিফিন সরবরাহের কড়া নির্দেশ দেন বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর নরসিংদী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তার পরদিনই মিড-ডে মিলে শিশুদের নির্ধারিত খাবার দেওয়া হয়নি। মিলে বনরুটি ও ডিম দেওয়ার কথা থাকলেও সেদিন শুধু ডিম দেওয়া হয়েছে। 

শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ বা নরসিংদীতেই নয়, অনুসন্ধান করলে সারা দেশেই এমন চিত্র পাওয়া যাবে। আমাদের সমাজের একশ্রেণির মানুষের নৈতিক অধঃপতন এতটাই হয়েছে যে, এরা কোমলমতি শিশুদের খাবারে মুখ লাগাতেও দ্বিধা করে না। দুঃখজনক হলো, এ চিত্র একমাত্র আমাদের দেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও পাওয়া দুষ্কর। পৃথিবীর সব দেশে শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। আর খাদ্য ও ওষুধের মান রক্ষায় উন্নত দেশগুলোর সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। সেসব দেশের আদালত ইচ্ছা করলে খুনের মামলার আসামিকে খালাস দিতে পারে। কিন্তু খাদ্য বা ওষুধে ভেজাল দানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমা করে না। আমাদের দেশেও সে আইন আছে। তবে তার কার্যকারিতা নেই। অপরাধীরা তাই নানা উপায়ে অভিযোগের জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে যেতে পারে। 

শিশুদের মিড-ডে টিফিন নিয়ে যে ধরনের অনিয়ম সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ঘটছে, তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ জরুরি বলে আমরা মনে করি। অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য যারা শিশুদের মুখের খাবার কেড়ে খায় বা তাদের অখাদ্য-কুখাদ্য খাইয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তারা মনুষ্য পদবাচ্যের অযোগ্য। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় বলেছেন, ‘প্রার্থনা করো-যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,/ যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ।’ জাতীয় কবির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও দাবি তুলছি, শিশুদের মুখের গ্রাস কেড়ে খাওয়া ওইসব মানব-শকুনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা