ড. মিহির কুমার রায়
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫১ পিএম
ইরান যুদ্ধের কারণে তীব্র জ্বালানি সংকটসহ নানা ইস্যুতে বিপর্যস্ত দেশের অর্থনীতি। সাধারণ মানুষ কোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় সম্প্রতি সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। এতে অর্থনীতির সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সরাসরি প্রভাব পড়বে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তিনটি খাতÑ শিল্প, কৃষি ও সেবায়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এক দিনের মধ্যেই এই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাস, ট্রাক ও লঞ্চসহ গণপরিবহনে ভাড়া বাড়াতে চাপের মুখে সরকার সংশ্লিষ্ট মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে। এদিকে বাজারে বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। এ ছাড়াও শিল্প ও কৃষি উৎপাদন খাতেও আমদানি ও উৎপাদন খরচ নির্ঘাত বাড়বে, যা এক সপ্তাহের মধ্যে স্পষ্ট হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অপরদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাবে। এককথায় সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি নানামুখী চাপে পড়বে। তাদের মতে, বাজেট সামনে রেখে যখন দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ছিল, তখন সরকারের এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে আরও বাধাগ্রস্ত করবে। এদিকে এত বিপদের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ অন্তত জ্বালানি সংগ্রহ বা তেল পাম্পগুলোতে চলমান যে সীমাহীন দুর্ভোগ চলছে তা থেকে মুক্তি পেতে চান। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেনÑ কারণ যাই হোক, সরকার তো শেষ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে জনভোগান্তি কমাতে চায়, তাহলে সরকার এমন সিদ্ধান্ত আগে নিল না কেন। যদিও তেল পাম্পগুলোর দীর্ঘ লাইন প্রমাণ করেছে সরকার দাম বাড়িয়েও সংকটের সমাধান করতে পারবে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, দুই কারণে তেলের দাম বেড়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপ। যদিও সরকার বলছে, তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে উল্লেখ্য, ইরান যুদ্ধ ঘিরে বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি লিটার অকটেনে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতে সামগ্রিকভাবে জনজীবনে নানামুখী প্রভাব পড়েছে।
অনেকেই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের কথা বলে সরকার হঠাৎ করে দাম বাড়িয়েছে। এর ফলে সব নিত্যপণ্য ও সেবার দাম বাড়বে। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য সব সময় অজুহাত খোঁজেন। এবার তাদের হাতে আরও একটি অজুহাত ধরিয়ে দেওয়া হলো। এর আগেই তেলের মজুদদারসহ এ খাতের সব ব্যবসায়ী দাম বাড়ানোর জন্য সরকারকে চাপ দিয়ে আসছিলেন। এখন তারা সফল হলেন। জ্বালানি তেলের সঙ্গে নিত্যপণ্যসহ সবকিছুই সরাসরি জড়িত। সে কারণেই সব পণ্যমূল্যে ‘আগুন, হুট করে তেলের দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি। তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর খুচরা বাজারে বেশ কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে ৫-৭ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বেশিরভাগ সবজির দাম ৮০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। কিছু সবজির দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে কোম্পানিগুলো। সরবরাহ একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে পণ্যের বাজারে ক্রেতার হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি বেগুন মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ১০৫-১২৫ টাকা, যা এক দিন আগে ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর সাত দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকায়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সব ধরনের গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। পরিবহন মালিক সমিতি ও সরকার, ইতোমধ্যে সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে ইতোমধ্যে মোটরবাইকের রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া বাড়িয়েছেন চালকরা। মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা হয়ে গেছে। কেউ ২০০ টাকার ভাড়া ২২০ থেকে ২৩০ টাকা আদায় করছেন। যেহেতু সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, ভাড়াও সমন্বয় করতে হবে। আগে তেলের দাম বাড়ানোর সময় গণপরিবহনের ভাড়া কত বাড়বে, তা বলে দেওয়া হতো। এবার সেটা করা হয়নি। দ্রুতই এটা করতে হবে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়বে, এটা স্বাভাবিক। তবে সেটা যৌক্তিক হতে হবে। জ্বালানি তেলের মূল্য এক টাকা বৃদ্ধি বা কমলে ভাড়া এক পয়সা বাড়ানো বা কমানোর রীতি দীর্ঘদিন ধরেই চলে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধির ফলে ভাড়া ১৫ পয়সা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ২০২২ সালের পর বাস-মিনিবাসের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়নি। এর মধ্যে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে খুচরা যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিন অয়েলের খরচ বেড়েছে। সেটাও আমলে নিতে হবে। অন্যদিকে লঞ্চ ভাড়া বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। লঞ্চের ভাড়া দূরত্বভেদে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন লঞ্চ মালিকরা।
অর্থনীতিতে মন্দার কারণে দীর্ঘদিন দেশের শিল্প খাতে শ্লথগতি চলছে। নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না বললেই চলে। উদ্যোক্তারা চরম হতাশ। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান যেমন হচ্ছে না, তেমনই বিদ্যমান কর্মীও ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আয় কমার পাশাপাশি বেকারত্বও বাড়ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও নিম্নমুখী ও কঠিন করে তুলছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি তাদের আরও বিপাকে ফেলেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে শিল্প উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি জ্বালানির প্রয়োজন হয় গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিকসহ সবরকম কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিজেল লাগে। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে এর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিদেশে রপ্তানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দেশের নির্মাণ খাতের মধ্যে রড-সিমেন্ট, ইটভাটা ও নির্মাণ যন্ত্রপাতি অন্যতম। এ সবকিছুই জ্বালানি-নির্ভর। জ্বালানি সংকটে রড-সিমেন্ট, টাইলস, ইট উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে পণ্য উৎপাদন খরচ বাড়বে। এ ছাড়াও বাড়বে পরিবহন ব্যয়। এতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসবে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলোÑ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি জোরালো হবে।
সর্বশেষে বলা যায়, জ্বালানি তেল এখন বৈশ্বিক সমস্যা। অর্থনীতির চাপ সামাল দিতে সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়ে। যেটি সরকার করতে পারছে না। বিশেষ করে, শিল্প ও গণপরিবহন খাতে। তেলের অভাবে শিল্পের উৎপাদন এবং শিল্পসংশ্লিষ্ট ট্রাক ও লরি চলাচল ব্যাহত হলে অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে। তাই তেলের পাম্পে রেশনিং তুলে দিয়ে ২৪ ঘণ্টা তেল সরবরাহ করা উচিত। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে আত্মবিশ্বাস ফিরবে। আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনা কমবে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে দেশের কৃষি খাতে। বিশেষ করে, ডিজেলচালিত সেচ পাম্পসংশ্লিষ্ট কৃষি ব্লক বা প্রকল্প প্রয়োজনীয় সেচের অভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনই এখন দাম বাড়ায় কৃষকের মাথায় হাত পড়েছে। এ ছাড়াও জ্বালানির কারণে বিদ্যুতের মূল্য ও জেনারেটরের খরচ বেড়েছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্রমেই জ্বালানি তেলের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়বে।
ড. মিহির কুমার রায়
গবেষক ও অর্থনীতিবিদ