× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভালো মানুষ চাই

জাহিদ ইকবাল

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪৯ পিএম

ভালো মানুষ চাই

মানুষের সভ্যতা আজ প্রযুক্তি, অর্থনীতি আর ক্ষমতার বিস্ময়কর উচ্চতায় পৌঁছেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে মহাকাশ গবেষণাÑ সবখানেই মানুষের সাফল্যের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু এই অগ্রগতির ভেতরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছেÑ আমরা কি সত্যিই ভালো মানুষ হতে পেরেছি? নাকি কেবল উন্নত যন্ত্র বানাতে শিখেছি, উন্নত মানুষ হতে পারিনি? সভ্যতার এই রথ যখন ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলেছে, তখন পেছনে তাকিয়ে দেখলে দেখা যায়, আমাদের নৈতিকতার দেয়ালগুলো ক্রমশ জীর্ণ হয়ে পড়ছে। বিশ্বজুড়ে আজ যে অস্থিরতা, যুদ্ধ, আর বৈষম্য, তার মূলে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেই, বরং রয়েছে মানুষের চারিত্রিক স্খলন। একটি দেশ বা জাতির উন্নতির প্রকৃত মাপকাঠি কেবল তার মাথাপিছু আয় বা অবকাঠামো দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ কোনো সমাজকে একা টেকসই উন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোÑ নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্কÑ বিশ্বের সবচেয়ে সুখী ও স্থিতিশীল সমাজ হিসেবে পরিচিত। এর পেছনে শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, বরং উচ্চমাত্রার সামাজিক আস্থা, সততা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার চর্চা বড় ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, বহু উন্নয়নশীল দেশে দেখা যায়, সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি, অনিয়ম, অসততা এবং ব্যক্তিস্বার্থের কারণে সমাজ কাঙ্ক্ষিত উন্নতি অর্জন করতে পারে না। অর্থাৎ, ভালো মানুষের অভাব শুধু নৈতিক সংকট নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেরও প্রধান অন্তরায়। আমাদের সমাজেও একই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়। আমরা প্রত্যেকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভালো মানুষ খুঁজিÑ একজন সৎ শিক্ষক, একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক, একজন দায়িত্বশীল পুলিশ, একজন বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী, একজন মানবিক ডাক্তার। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ আমরা নিজেরা কতটা সেই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারি? 

জাতি, ধর্ম এবং বর্ণনির্বিশেষে প্রতিটি ধর্মই নৈতিকতাকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে ঘোষণা করেছে। মানুষের ইতিহাসে দেখা গেছে, নৈতিকভাবে শক্তিশালী জাতিগুলোই দীর্ঘকাল টিকে ছিল। ইসলাম ধর্মে ভালো মানুষের গুরুত্ব অপরিসীম। বিদায় হজের ভাষণে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্ট করেছিলেন যে, আরবের ওপর অনারবের বা সাদার ওপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ‘তাকওয়া’ বা চারিত্রিক গুণাবলির ভিত্তিতে। একটি বিখ্যাত হাদিসে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।’ এই যে সর্বজনীন শিক্ষা, তা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্য নয়, বরং গোটা মানবজাতির জন্য। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা কেবল ডিগ্রিধারী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছি, হৃদয়বান মানুষ গড়ার দিকে নজর দিচ্ছি না। অথচ নৈতিকতাবিহীন শিক্ষা একজন মানুষকে কেবল একজন ‘চতুর অপরাধী’ হিসেবে গড়ে তোলে।

বর্তমানে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বাস করছি। আমাদের চারপাশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর রোবটিক্স দিয়ে ঘিরে যাচ্ছে। কিন্তু রোবট কখনও ভালো মানুষ হতে পারবে না, কারণ তার আবেগ নেই, ন্যায়-অন্যায়বোধ নেই। তাই এই যান্ত্রিক যুগে মানুষের ‘মানুষ’ থাকাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যদি সত্যিই একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক সমাজ গড়তে চাই, তাহলে প্রথমেই আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে নিজেদের দিকে। অন্যের মধ্যে ভালো মানুষ খোঁজার আগে নিজেকে সেই মানদণ্ডে গড়ে তুলতে হবে। কারণ, সমাজ কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়Ñ এটি আমাদের সবার সমষ্টি। আমি পরিবর্তন হলে পরিবার পরিবর্তন হবে, পরিবার পরিবর্তন হলে সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিবর্তিত হবে। আব্রাহাম লিংকন তার ছেলের শিক্ষকের কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে তিনি বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন যেন তার ছেলেকে শেখানো হয় যেÑ প্রতিটি শত্রুভাবাপন্ন মানুষের বিপরীতে একজন বন্ধুও থাকে এবং প্রতিটি ধূর্ত রাজনীতিকের বিপরীতে একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা থাকে। ভালো মানুষ হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ক্ষমা এবং ধৈর্য। নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবরণ করার পর যখন মুক্তি পান, তিনি প্রতিশোধের পথে না হেঁটে ক্ষমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। 

ভালো মানুষের অভাব একটি রাষ্ট্রের জন্য কত বড় ঝুঁকি হতে পারে তা মেধা পাচার বা ‘ব্রেইন ড্রেইন’ লক্ষ করলে বোঝা যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে হাজার হাজার মেধাবী তরুণ শুধু পরিবেশের কারণে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এতে দেশ তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারাচ্ছে। এ ক্ষতির মূল্য পুরো জাতিকে দীর্ঘকাল ধরে দিতে হয়। বিপরীতে, যেখানে ভালো মানুষের সংখ্যা বেশি, সেখানে উন্নয়ন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। কারণ সেখানে নিয়ম মানা হয় স্বেচ্ছায়, দায়িত্ব পালন করা হয় আন্তরিকভাবে এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করা হয় স্বভাবগতভাবে। আজ ডিজিটাল যুগে আমাদের নৈতিকতা আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো বা সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে অন্যের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে এক শ্রেণির দুষ্ট প্রকৃতির লোক। সমাজ ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের গহ্বরে পতিত হতে চলেছে। এ পরিণতি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র ভালো মানুষেরা। 

  সত্যিকারের ভালো মানুষ ভার্চুয়াল জগৎ আর বাস্তব জগৎÑ উভয় ক্ষেত্রেই পরিশীলিত রুচির পরিচয় দেন। আজকের বিশ্বে সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, বরং তা হলো নৈতিক সংকট। মুদ্রাস্ফীতির চেয়েও ভয়ানক হলো মঅণৈতিকতার স্ফীতি। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো পরিকল্পিতভাবে ভালো মানুষ তৈরি করা। পরিবার থেকে এর হাতেখড়ি হতে হবে। শিশুদের কেবল জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিলেই হবে না, তাদের শেখাতে হবে সততা কী, পরোপকার কী এবং কেন সত্য বলা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি চরিত্র গঠনের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। আমাদের এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে একজন সৎ ব্যক্তি অপমানিত হবেন না, বরং সবচেয়ে বেশি সম্মানিত হবেন। আজ আমরা পথে পথে ভালো মানুষ খুঁজি কিন্তু আড়ালে আমরা নিজেরাই সেই নীতি বিসর্জন দেই। অন্যের হক নষ্ট করাকে যখন আমরা নিজের বিজয় ভাবি, তখন মূলত আমরা আমাদের নৈতিক পরাজয়ের বীজ বপন করি।

একটি সমাজে সাম্য ও ন্যায়বিচার তখনই নিশ্চিত হয় যখন সেই সমাজের চালিকাশক্তিতে ভালো মানুষের অংশগ্রহণ থাকে। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধী বেঁচে গেলেও ভালো মানুষ তার বিবেকের তাড়নায় কখনও অন্যায় করতে পারে না। আমাদের চারপাশে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা পিছিয়ে আছি কেবল নিষ্ঠাবান মানুষের অভাবে। রাস্তাঘাট হবে, বড় বড় কলকারখানা হবে, কিন্তু যদি মানুষের মন অন্ধকার থাকে, তবে সেই আলোর ঝলকানি কোনো কাজে আসবে না। আমাদের সন্তানদের আমরা ভালো ইংরেজি বলা শেখাচ্ছি, রোবটিক্স শেখাচ্ছি, কিন্তু তাদের কি শেখাচ্ছি বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে? তাদের কি শেখাচ্ছি পশুপাখির প্রতি মায়া করতে? যদি না শেখাই, তবে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক শীতল ও যান্ত্রিক পৃথিবী রেখে যাব। একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি তার জিডিপি বা বিশাল বিশাল অট্টালিকা নয়, বরং তার নাগরিকদের চরিত্র। চরিত্রহীন জাতির উত্থান তাসের ঘরের মতো, যা যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। আমরা যদি সত্যিই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে চাই, তাহলে আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে ‘ভালো মানুষ’ তৈরিতে। কারণ, রাস্তা, সেতু, প্রযুক্তিÑ সবই গড়া যায়, কিন্তু একটি ভালো মানুষ তৈরি করতে লাগে সচেতনতা, ত্যাগ, শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং দীর্ঘ সাধনা। 

তাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি এবং সবচেয়ে বড় সংগ্রামÑ ভালো মানুষ চাই। কারণ একজন ভালো মানুষ কেবল একটি পরিবারের সম্পদ নয়, বরং সে গোটা মানব জাতির আলোকবর্তিকা। আসুন, আমরা সেই আলোকবর্তিকা হওয়ার চেষ্টা করি। তবেই সার্থক হবে আমাদের বিজ্ঞান, আমাদের প্রযুক্তি আর আমাদের এই দীর্ঘ লালিত সভ্যতা। ভালো মানুষ হতে পারাটাই হোক জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন এবং শ্রেষ্ঠ পরিচয়। সমাজ পরিবর্তন করতে হলে আগে নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ দিনশেষে আমাদের কর্মই আমাদের পরিচিতি।


জাহিদ ইকবাল

সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা