সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০০ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রে জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন বাংলাদেশের দুই মেধাবী পিএইচডি শিক্ষার্থীর নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু দুটি পরিবারে নয়, পুরো দেশবাসীর হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। প্রতীকী ছবি
যুক্তরাষ্ট্রে জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন বাংলাদেশের দুই মেধাবী পিএইচডি শিক্ষার্থীর নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু দুটি পরিবারে নয়, পুরো দেশবাসীর হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। বিদেশের মাটিতে স্বপ্ন বুনতে যাওয়া এই দুই তরুণ-তরুণী ছিলেন সম্ভাবনার প্রতীক। তাদের চোখে ছিল উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর সেই স্বপ্নের আলোয় আলোকিত হওয়ার প্রত্যাশা ছিল একটি দেশেরও। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেই স্বপ্ন আজ রক্তে রঞ্জিত। আমরা মনে করি, এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি মানবিকতার ওপর এক নির্মম আঘাত। প্রশ্ন জাগে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কোথায়? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের যে সমাজকে আমরা নিরাপদ ও সভ্যতার প্রতীক হিসেবে দেখি; সেখানে এমন নির্মমতা কীভাবে ঘটে?
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন বাংলাদেশের দুই কৃতী শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল আহমেদ লিমন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুবাদে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল প্রেমের সম্পর্ক। শিগগিরই তাদের বিয়ে করার কথা ছিল। প্রেমের পরিণতি বিয়েতে রূপ নেওয়ার আগেই তারা ঘাতকের হাতে প্রাণ দিলেন। যে শরীর রাঙানোর কথা ছিল মেহেদির রঙে, সেই শরীর রাঙাল লাল রক্তে। বসা হলো না বিয়ের পিঁড়িতে। ঘাতক কেড়ে নিল দুটি প্রাণÑ এই বাক্যটি যেন আমাদের অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। যে তরুণরা গবেষণাগারে দিন-রাত পরিশ্রম করে মানবজাতির জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করার প্রয়াসে নিয়োজিত ছিলেন; তাদের জীবন এভাবে থেমে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। নৃশংস এই হত্যার ঘটনায় হিশাম আবুঘারবিয়েহ নামে এক সন্দেহভাজন খুনিকে অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে লিমন ও বৃষ্টিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার দুটি অভিযোগ এনেছে ফ্লোরিডা পুলিশ। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে শিউরে উঠেছে খোদ ফ্লোরিডার প্রশাসন। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ভয়ানক ও পরিকল্পিত হামলা বলে উল্লেখ করেছেন তারা। নির্মম এই হত্যার ঘটনায় স্বজনের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। সহপাঠী ও শিক্ষকরাও শোকে ভারাক্তান্ত।
সমাজে প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো সহিংস ঘটনা ঘটছে। উন্নত ও সভ্য দেশগুলোও এই আঁচরের বাইরে নয়। এখন মাত্রাগত ও প্রকৃতিগত দিক থেকে মানুষের নৃশংসতা এবং সামাজিক সহিংসতার রূপ যেন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠছে। প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা, পুড়িয়ে মারা, ঘুমের মধ্যে শিশুহত্যা, সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন কিংবা পিতা-মাতার হাতে সন্তান খুনÑ কোনো কিছুই আর অবিশ্বাস্য মনে হয় না এখন। এমন নির্মম বাস্তবতা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলোর শিরোনামÑ ছবি দেখলেই বোঝা যায়। ঘটনাপ্রবাহে একসময় হয়তো এসব হত্যাকাণ্ডের কারণ প্রকাশ হয়, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑ মানুষ কেন এতটা সহিংস হয়ে উঠছে, নৃশংস হয়ে উঠছে, তার উত্তর কি আমরা আদৌ অনুসন্ধান করেছি? ফ্লোরিডার এই নৃশংস ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের আরেকটি বাস্তবতা উপলব্ধি করা উচিতÑ বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মানসিক, সামাজিক এবং নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের জন্য একটি শক্তিশালী সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ প্রতি বছর হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠায়। তারা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে নয়, বরং দেশের জন্য জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান। এই দুই তরুণও সেই স্বপ্নযাত্রার অংশ ছিলেন। কিন্তু তাদের এই অকালমৃত্যু আমাদের শুধু শোকাহত করেনি, বরং গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। আজ এই দুই শিক্ষার্থী নেই, কিন্তু তাদের স্বপ্ন, তাদের পরিশ্রম, তাদের ত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñ একটি জাতির ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতে গড়ে ওঠে। সেই জীবন যখন এভাবে ঝরে যায়, তখন তা শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি জাতির ক্ষতি।
সরকারের দায়িত্ব শোক প্রকাশেই শেষ হোকÑ আমরা তা চাই না। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর ভূমিকা আরও সক্রিয় হতে হবে। এটা নিশ্চিত যে, নৃশংসতা ও সহিংসতার এই ব্যাধি থেকে মুক্তির সহজ কোনো পথ নেই। সমাজকে এই অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে হলে সার্বিক সামাজিক অগ্রগতি ও মানবিকতার পথ খুঁজতে হবে। শোকের এই মুহূর্তে আমরা শুধু প্রার্থনা করতে পারিÑ যেন তাদের আত্মা শান্তিতে থাকে। একই সঙ্গে দাবি করছিÑ এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত হোক, দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক, যেন আর কোনো মেধাবীর প্রাণ এভাবে ঝরে না যায়।