মো. আব্দুর রাজ্জাক
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:২৯ পিএম
বর্তমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধানকে নিয়ে অনেকে বিষোদগার, বিরূপ মন্তব্য করেন। পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া সর্বত্রই তাকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছিল। তিনি সবই সহ্য করে মুখ বন্ধ করে সংযত আচরণের মাধ্যমে তার উত্তর দিয়েছেন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। অতীতে দেশের ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভরসার জায়গা হিসেবে সমাদৃত।
বর্তমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধানকে নিয়ে অনেকে বিষোদগার, বিরূপ মন্তব্য করেন। পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া সর্বত্রই তাকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছিল। তিনি সবই সহ্য করে মুখ বন্ধ করে সংযত আচরণের মাধ্যমে তার উত্তর দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিশৃঙ্খল সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অত্যন্ত সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় তিনি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ইচ্ছা করলে তার অনুগত অফিসার ও সৈনিকদের নিয়ে ভিন্ন কিছু করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। পেশাদার সৈনিক হিসেবে সংবিধানের প্রতি তার এ আনুগত্য অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। কঠিন সময়ে সবকিছুকে সামাল দিয়ে তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বহু নেতা-মন্ত্রীর জীবন রক্ষা করেছেন, আশ্রয় দিয়েছেন। এটা নিয়ে কেউ কেউ বাঁকা মন্তব্য করে থাকেন। অথচ একটু চিন্তা করলেই অনুভব করা যায়, এর মাধ্যমে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজ করেছেন। সে সময়ে তিনি যদি ওইসব নেতা-মন্ত্রীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করতেন, তাহলে দেশে রক্তগঙ্গা বয়ে যাওয়া বিচিত্র ছিল না। নির্যাতিত জনগণের রোষানলে পড়ে লীগ নেতা-নেত্রী ও মন্ত্রী-এমপিদের অনেকের করুণ পরিণতি হতে পারত। বাংলাদেশের অবস্থাও হতে পারত শ্রীলঙ্কার মতো। তবে যারা আশ্রয় নিয়ে পালিয়ে গেছে এই সমাজে তারা ঘৃণিত ও অপরাধী হয়ে বেঁচে থাকবে আজীবন।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত, আমেরিকা, চীন, রাশিয়া অনেক ছোট ছোট দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। পাকিস্তানে তো সামরিক বাহিনী দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের দেশও একাধিকবার সেনাশাসন কবলিত হয়েছে। এবারও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেকের মনেই শঙ্কা জন্মেছিল, দেশ পুনরায় সেনাশাসন কবলিত হয়ে পড়ে কি না। কিন্তু সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের পেশাদারত্ব ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য সে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে জাতিকে পড়তে দেয়নি।
সবারই নিশ্চয়ই স্মরণ আছে ১/১১-এর বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা। যখন কোনো এক অজানা আক্রোশে সেনাবাহিনীর কতিপয় পদস্থ কর্মকর্তা বিএনপি ও জিয়া পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে নেমেছিল। মিথ্যা অভিযোগে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তার দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানতক ধরে নিয়ে বর্বরোচিত নির্যাতন চালিয়েছিল। সে নির্যতনের ফলে আরাফাত রহমান আহত ও অসুস্থ হয়ে পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অপরদিকে অমানুষিক নির্যাতনে তারেক রহমান প্রায় পঙ্গু অবস্থায় উপনীত হন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার বিচার অত্যন্ত কঠিন। তিনি ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। তারেক রহমান আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী। আর সেদিন যারা তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল, তারা আজ অপরাধী হয়ে বিচারের কাঠগড়ায়। একজন নাগরিক হিসেবে আমার দাবি, ১/১১-এর সব কুচক্রীকে খুঁজে বের করে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। এজন্য ১/১১-এর প্রধান কুশীলব তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদকে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা উচিত।
আমাদের মনে রাখতে হবে সব ক্ষমতা গ্রহণ মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না, বরং অবৈধ ক্ষমতা গ্রহণ মানুষের মনে ঘৃণার উদ্রেক তৈরি করে। তারা মানুষের নিকট ধিক্কৃত হন । যে কাজটা বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান ইচ্ছা করলেই করতে পারতেন তা তিনি না করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি অমর হয়ে থাকবেন। জুলাই-পরবর্তী ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সময়ে মানুষের জীবন-মান রক্ষা করে তিনি সব কূল রক্ষা করেছেন।
সম্প্রতি বর্তমান সেনাপ্রধান সরকারিভাবে আমেরিকা সফর করছেন। একজন সেনাপ্রধানের বিভিন্ন সময়ে সরকারি সফর থাকে। এমনিতেই শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক অবদান রয়েছে । তার অংশ হিসেবে তিনি সফরে গেছেন। তার এই সফর যদি ভারতে হতো, তাহলে আমাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত অজানা আশঙ্কায়। না জানি সামনে আবার কোনো বিভীষিকাময় পরিস্থিতি আমাদের অবলোকন করতে হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্তমান সরকারকে সবদিক থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এটা অবশ্য তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং শপথের অংশ। আর তা যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ইতিবাচক মনোভাবের জন্যই সম্ভব হচ্ছে, সে কথা বলার অপেক্ষো রাখে না।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর দেশবাসীর আস্থা-বিশ্বাস অব্যাহত থাকুক। এ দেশে আমরা রক্তপাত চাই না, সামরিক শাসন চাই না, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই। ন্যায়বিচার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, জনগণের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সর্বোপরি গণতান্ত্রিক সরকারকে সব ধরনের বৈধ সহযোগিতা প্রদানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বদাই সম্মুখভাগে থেকে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করুক সেই প্রত্যাশা প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের।
মো. আব্দুর রাজ্জাক
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজকর্ম বিভাগ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা