ইমেইল থেকে
আবু বক্কার সিদ্দিক জনি
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:২৩ পিএম
বিশ্ব শ্রমিক দিবসে আমরা সবাই বিশ্বব্যাপী ছুটি পালন করি, যা আমাদের মাঝে ‘পহেলা মে’ নামে অভিহিত। কিন্তু এই ১ মে’র ইতিহাস বেশ বিস্তৃত ও রক্তক্ষয়ী। আমাদের বর্তমানের শ্রমিকরা যে ৮ ঘণ্টা কর্ম দিবস পালন করেন তা এমনিতেই আসেনি। এর জন্য ঝরাতে হয়েছে অনেক রক্ত। যেমন, আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের পেছনে রয়েছে রক্ত ঝরানোর সমৃদ্ধ ইতিহাস। ঠিক তেমনই ইতিহাস সমৃদ্ধ ১ মে’র ইতিহাস। আজকে আমি সেই পহেলা মে’র রক্তাক্ত ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানাব।
১৭০ বছর আগের কথা (১৮৫৬
সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত)। সেই যুগে শ্রমিকদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছিল না।
ছিল না কোনো শ্রম আইন। ছোট শিশু থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ সবাইকে সূর্যোদয় থেকে
সূর্যাস্ত পর্যন্ত কারখানায় বন্দি থাকতে হতো। সে সময় অফিস-কারখানাতে দৈনিক ১৪-১৬
ঘণ্টা কাজ করতে হতো, যা ছিল অমানবিক। তাই ১৮৫৬ সালের ২১ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার
শ্রমিকরা একযোগে সারা দেশে কর্মবিরতি পালন করে। তাদের দাবি ছিল প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা
কাজ। কারণ প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করলে একজন শ্রমিকের বিশ্রাম, বিনোদন কোনোটি
গ্রহণেরই পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে না। পারিবারিক, ব্যক্তিগত সময় বলে কিছু থাকে না!
অস্ট্রেলিয়ার সেই আন্দোলনই প্রথম বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছিল যে, শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হলে
অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
তারপরের ঘটনাগুলো আরও জটিল। তখন সময় ছিল ১৮৮৪
খ্রিস্টাব্দ। আমেরিকায় শুরু হয় নতুন ঘটনা। আমেরিকায় তখন ছিল তিনটি বড় শ্রমিক
সংগঠন। তারা সবাই সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে, ১৮৮৬ সালের ১ মে তারা সবাই
একযোগে ধর্মঘট পালন করবে। তাদের স্লোগান ছিল : ‘৮ ঘণ্টা শ্রম, ৮ ঘণ্টা ঘুম ও ৮
ঘণ্টার বিনোদন।’ এই দাবিতে শিকাগোতে শ্রমিকরা সমবেত হয়।
৩ মে ১৮৮৬। বিকালবেলা
শিকাগোর ম্যাককরমিক কারখানার কাছে ধর্মঘট পালন হয়। সেখানে বক্তব্য রাখেন বিখ্যাত
শ্রমিক নেতা অগাস্ট স্পাইস। তিনি বক্তৃতার মাধ্যমে সবাইকে শান্ত রাখার চেষ্টা
করেন। কিন্তু অসংখ্য লোকজনের মধ্যে হঠাৎ করেই বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যায়। এ সময় উভয়
পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি ছুড়লে ৬ জন
শ্রমিক নিহত ও আহত হয় অসংখ্য। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে আন্দোলন আরও জোরালো
হয়।
শ্রমিক হত্যার
প্রতিবাদে ৪ মে শিকাগোর হে-মার্কেট চত্বরের কাছে রেন্ডলফ সড়কে বিশাল বিক্ষোভ হয়।
এতে নেতৃত্ব দেন শ্রমিক নেতা অ্যাডলফ ফিশার ও অগাস্ট স্পাইস। ৪ মে সন্ধ্যাবেলা
তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই মুষলধারে বৃষ্টির মাঝেও চলে বক্তৃতা। রাত ১০টার দিকে
পুলিশ সুপার জন বোনফিল্ড তাদের সভা শেষ করতে বলেন। কিন্তু শ্রমিক নেতারা
শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম বন্ধ করতে রাজি হননি। দুষ্ট লোকেরা এক পর্যায়ে হঠাৎ বোমা
বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে পুলিশ অফিসার ম্যাথিয়াস জে. ডিগান মারা যান। ফলে পুলিশ
অন্ধকারে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে পুলিশ ও শ্রমিক উভয় পক্ষেই অনেক মানুষ হতাহত
হয়। এরপরের ঘটনা আরও করুণ। পুলিশ এই বোমা হামলার কোনো প্রকৃত কারণ খুঁজে না পেলেও
নিরপরাধ ৮ শ্রমিক নেতাকে আটক করে এবং বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
১৮৯৩ সালে ইলিনয়
অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জন পিটার অল্টগেল্ড স্বীকার করেছিলেন যে, দণ্ডপ্রাপ্ত শ্রমিকরা
আসলে নির্দোষ ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকা বাকি তিনজনকে মুক্তি দেন। (সূত্র : The
Haymarket Tragedy - Paul Avrich) এটি প্রমাণ করে যে, সেই সময় শ্রমিকদের কণ্ঠরোধ
করার জন্য কতটা অন্যায় বিচার করা হয়েছিল। এই সাহসী সিদ্ধান্তের কারণে গভর্নর
অল্টগেল্ডকে তখন অনেক সমালোচনা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল, কিন্তু সত্য
প্রকাশে তিনি পিছপা হননি। বর্তমানে তাকে একজন ন্যায়পরায়ন শাসক হিসেবে শ্রদ্ধা
জানানো হয়।
এই হলো আমাদের শ্রমিক
দিবসের কথা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৯ সালে প্যারিসে সমাজবাদীদের ‘দ্বিতীয়
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে’ সর্বোচ্চ কাজের সীমা ৮ ঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে ১৮৯০ সালের
১ মে বিক্ষোভের প্রস্তাব পাস করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র, চিলি, পেরুসহ বিশ্বের
বিভিন্ন দেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। আর তখন থেকেই পালিত হচ্ছে ১ মে বা বিশ্ব
শ্রমিক দিবস। আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে এর সুফল ভোগ করছে। আর ছুটির দিন
হিসেবে দিনটি স্মরণ হয়।
মে দিবস পালিত হলেও
আধুনিক যুগে এসেও অনেক শ্রমিক ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত।
বিশেষ করে নারী ও শিশু শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শ্রমিকের
গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করার যে মানবিক ও ইসলাম ধর্মীয় চেতনা, তা
বাস্তবায়ন করাই হোক আজকের অঙ্গীকার। কিন্তু এখনও কারখানায় ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ হয়।
কারখানাগুলোতে ওভার টাইমের নামে এখনও চলে দীর্ঘ কর্ম ঘণ্টার মাধ্যমে শ্রমিক
নির্যাতন। আমি নিজেও প্রতিদিন ১৩ থেকে ১৪/১৫ ঘণ্টা ডিউটি করি। আমাদের সত্যিকারের
শ্রমিক দিবস প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আবু বক্কার সিদ্দিক
জনি
সালনা, গাজীপুর।