ইমেইল থেকে
মো. শামীম মিয়া
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০৮ পিএম
বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা আজ দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে চললেও এই অগ্রগতির আলো দেশের সব প্রান্তে সমানভাবে পৌঁছেনিÑ এ সত্যটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় চরাঞ্চলের বাস্তবতায়। নদীবেষ্টিত এই ভৌগোলিক অঞ্চলগুলো যেন উন্নয়নের মূলধারার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব জনপদ, যেখানে গর্ভবতী মা, শিশু এবং শিক্ষাব্যবস্থা এক গভীর ও আন্তঃসম্পর্কিত সংকটের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে।
এখানে সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িত হয়ে দারিদ্র্য, অজ্ঞতা ও অনিশ্চয়তার একটি চক্র তৈরি করেছে, যা প্রজন্মান্তরে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। চরাঞ্চলের জীবন মূলত নদীর ভাঙাগড়া, স্থানান্তর এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে সংগ্রামের জীবন। স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে ওঠে না, স্বাস্থ্যসেবা নিয়মিত পৌঁছে না, শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন গর্ভবতী নারী ও নবজাতক শিশু। একজন গর্ভবতী নারী যখন প্রসবকালীন জটিলতার সময় নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছতে নৌকা বা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে বাধ্য হন, তখন তার জীবন হয়ে ওঠে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা একটি সভ্য রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
মাতৃস্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক ও অবকাঠামোগত প্রশ্ন। চরাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বল্পতা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব এবং জরুরি রেফারেল ব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সচেতনতার ঘাটতি, যা অনেক পরিবারকে গর্ভাবস্থার ঝুঁকি সম্পর্কে যথাযথ ধারণা থেকে বঞ্চিত রাখে। ফলে একটি সহজ ও প্রতিরোধযোগ্য পরিস্থিতিও প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে।
এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা,
প্রশিক্ষিত ধাত্রী এবং নিয়মিত ফলোআপ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
মাতৃস্বাস্থ্যের এই সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলে নবজাতক শিশুদের ওপর। চরাঞ্চলের শিশুরা জন্ম থেকেই অপুষ্টি, কম ওজন এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বড় হয়। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাব তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে স্থায়ী বাধা সৃষ্টি করে। মাছ, দুধ, ডিমের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য অনেক পরিবারের কাছে সহজলভ্য নয়, ফলে অপুষ্টি একটি সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। এর ফলাফল হিসেবে স্টান্টিং ও ওয়েস্টিংয়ের মতো সমস্যা ব্যাপকভাবে দেখা যায়, যা ভবিষ্যতের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য গুরুতর হুমকি। শিক্ষা খাত চরাঞ্চলের আরেকটি ভঙ্গুর স্তম্ভ।
অনেক এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষক সংকট, নিয়মিত উপস্থিতির অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নদীভাঙন ও স্থানান্তরের কারণে শিক্ষার্থীদের বারবার বিদ্যালয় পরিবর্তন করতে হয়। ফলে তাদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। বিশেষ করে, মেয়েশিশুরা সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক সময় প্রাথমিক শিক্ষার পরই ঝরে পড়ে। এর ফলে শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নের যে সম্ভাবনা ছিল, তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই তিনটি ক্ষেত্রÑ স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষাÑ চরাঞ্চলে আলাদা আলাদা সংকট নয়; বরং একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি চক্র।
একজন অপুষ্ট মা দুর্বল শিশুর জন্ম দেন, সেই শিশু শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ে, আর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশু ভবিষ্যতে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে যায়। এই আন্তঃসম্পর্কিত সংকট ভাঙতে না পারলে চরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। সরকারি উদ্যোগ অবশ্যই রয়েছেÑ কমিউনিটি ক্লিনিক, ভ্যাকসিন কর্মসূচি, প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এনেছে। কিন্তু চরাঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখনও অসম এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল। এখানে প্রয়োজন একটি আলাদা কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি, যা চরাঞ্চলের বিশেষ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে।
এই বাস্তবতায় করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে নদীপথে চলমান ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে যুক্ত করা গেলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব। তৃতীয়ত, নিরাপদ প্রসব কেন্দ্র স্থাপন ও জরুরি রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি গর্ভবতী মা ও শিশুদের জন্য বিশেষ পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি চালু করতে হবে।
চরাঞ্চলের গর্ভবতী মা, শিশু
ও শিক্ষাব্যবস্থা কেবল একটি সামাজিক ইস্যু নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনের একটি মৌলিক
পরীক্ষা। যদি এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা না যায়, তবে
সামগ্রিক উন্নয়নের ধারণাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এখন সময় কেবল পরিকল্পনার নয়, বাস্তবায়নের।
কারণ চরাঞ্চলের প্রতিটি জীবনই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
মো. শামীম মিয়া
শিক্ষার্থী, ফুলছড়ি সরকারি
কলেজ, জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা