ডা. মুশতাক হোসেন
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৯ এএম
বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে গোটা দেশের স্বাস্থ্যসেবা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে; দেশজুড়ে টিকাদান ঘাটতি, হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এবং শিশুদের মধ্যে উচ্চ সংক্রমণই মূল কারণ। অবিলম্বে ভ্যাকসিনের আওতা, ত্বরিত রোগ নজরদারি ব্যবস্থা (সার্ভেইল্যান্স) ও আঞ্চলিক সমন্বয় জরুরি।
১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল ২০২৬ সময়ে ২৯,৫৪৯ হামের লক্ষণযুক্ত রোগী এবং ৪,২৩১ ল্যাব-নিশ্চিত রোগীর তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। একই সময়ে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া ৪২ জন এবং ১৯৮ জন হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। দেশের সব কয়টি বিভাগে এবং ৫৮টি জেলায় সংক্রমণ দেখা গেছেÑ ঢাকায় সবচেয়ে বেশি রোগী।
২০২৪-২৫ সালে হাম-রুবেলা ভ্যাকসিনের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়া, রুটিন টিকাদানে লক্ষ্য পূরণ না হওয়া এবং ২০২০ সালের পর থেকে জাতীয় পর্যায়ে সম্পূরক গণটিকা অভিযানের অনুপস্থিতিÑ এসবই প্রতিকূলতা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঝুঁকি বিশ্লেষণ অনুযায়ী উচ্চ সংক্রমণ সম্ভাবনার স্থানগুলো হচ্ছেÑ বড় শহর, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বন্দরগুলো এবং সীমান্ত পারাপারের কারণে হামের দ্রুত বিস্তার ও আন্তর্জাতিক সংক্রমণের ঝুঁকি আছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ বাসস্থান ও টিকাহীন শিশুদের মধ্যে হামজনিত মারাত্মক জটিলতা বেশি।
সরকারকে দ্রুতই ভ্যাকসিন সরবরাহ পুনঃস্থাপন করতে হবে। জাতীয়ভাবে ঘাটতি পূরণ এবং জরুরি ভিত্তিতে টিকা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম আমদানি করতে হবে। শিশুদের বিশেষ করে ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সম্পূরক গণটিকা অভিযান সফল করতে হবে। এক থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে, ঘনবসতি এলাকায় বিশেষ জোর দিতে হবে। সক্রিয় রোগ নজরদারি (সার্ভেইল্যান্স) ও দ্রুত রেসপন্স টিমের দ্বারা রোগী শনাক্ত করে তাদের চিকিৎসা ও আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। বাকি সুস্থ শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। জেলা স্তরে র্যাপিড রেসপন্স ইউনিট, রোগ নির্ণয় দ্রুততা বাড়াতে হবে। প্রান্তিক পরিবারসমূহকে সামাজিক সহায়তা দিতে হবে যেন তারা শিশুদের চিকিৎসার ব্যাপারে অক্ষমতার শিকার না হয়।
বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে গোটা দেশের স্বাস্থ্যসেবা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে হাসপাতালে বেড, অক্সিজেন ও শিশু চিকিৎসা শক্তিশালী করতে হবে; চিকিৎসক ও নার্সদের অব্যাহত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। সীমান্ত ও আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ কেন্দ্রগুলোতে রোগ নজরদারি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, টিকা দানের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সীমান্ত স্বাস্থ্য চেকপোস্ট ও ভ্রমণকারীদের বিশেষ করে শিশুদের টিকাদান হয়েছে কি না তা যাচাই বাড়াতে হবে।
জনগণকে সম্পৃক্ত করে প্রচারাভিযান চালাতে হবে। ভ্যাকসিন নিরাপত্তা ও টিকাদানের গুরুত্ব নিয়ে দ্রুত তথ্য প্রচার ও অপতথ্য মোকাবিলা করতে হবে। স্থানীয় নেতা, স্থানীয় সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ছাত্র-শিক্ষক, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সম্পৃক্ত করে এ প্রচারাভিযান চলবে।
মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের মধ্যে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পুনরুদ্ধার ও মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কষ্ট ও বঞ্চনা দূর করতে হবে। টিকাদান সরবরাহ শৃঙ্খল পুনরুদ্ধার করা এবং ভবিষ্যৎ ঘাটতি (স্টক-আউট) প্রতিরোধ করতে হবে।
মুশতাক হোসেন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা