সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪৭ পিএম
প্রতারণার ফাঁদে ফেলে জীবকান্বেষী মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার এ অপতৎপরতা বন্ধ করা কঠিনÑ সন্দেহ নেই। তবে সরকার কঠোর হওয়ার পাশাপাশি জনসাধারণ যদি সচেতন ও সজাগ হতে হবে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জীবিকার তাগিদেই মানুষকে ঘর ছেড়ে বেরোতে হয়। কেউ তার নিজের এলাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়, কেউবা ঘর ছেড়ে দূরবর্তী শহর-বন্দর-গঞ্জ কিংবা লোকালয়ে ছুটে যায় কাজের সন্ধানে। এই ছুটে যাওয়া নিজের ও পরিবারের অপরাপর সদস্যদের জীবনধারণের নিমিত্তে প্রায়েজনীয় অর্থসংস্থানই মূল উদ্দেশ্য। এর বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান না হওয়া বা উন্নত জীবন গড়ার আশায় প্রতিবছর দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। আর এ ক্ষেত্রে অনেকেই প্রতারিত হয়ে কখনও সর্বস্বান্ত হয়, কখনও-বা মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করে।
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে অভিবাসন রুটে বছরে প্রায় ৮ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আইওএম) সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অভিবাসন-প্রত্যাশীদের মধ্যে মৃত বা নিখোঁজের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৯০৪। যদিও এ সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য কম। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ১,৫০০ সন্দেহজনক ঘটনার তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। না হলে এ সংখ্যা হয়তো আরও বেড়ে যেত। এসব নিখোঁজ ও মৃতের মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছে। তবে আইওএম তাদের সঠিক সংখ্যা জানায়নি। সংস্থাটির গবেষণায় জানা যায়, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত অভিবাসন-প্রত্যাশী প্রায় ৮২ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে বা মৃত্যুবরণ করেছে। আর সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার পরিবার। আইওএমের মতে এসব নিখোঁজ ও প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটেছে ইউরোপগামী সমুদ্রপথে। খবরটিতে যদিও নতুনত্ব নেই। তবে এ চিত্র যে অত্যন্ত বেদনাদায়ক, সে কথা অস্বীকার করা যাবে না।
মানুষ দেশে যখন কাজ খুঁজে না পায়, তখন বিদেশে কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবন গড়ার আশায় পাড়ি জমানোর চেষ্টা করে। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত আমাদের দেশে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত কর্মের অভাবে জনসংখ্যার এক বড় অংশ বেকার থাকছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ ৩০ হাজার, যা কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাতে প্রায় ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ১৭ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার এবং নারী ২ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার। বেকারদের মধ্যে ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী রয়েছে প্রায় ১১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এদের মধ্যে শিক্ষিত যুবকদের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার। তবে বিবিএস-এর এ পরিসংখ্যানের সঙ্গে অনেকেই একমত নন। তাদের মতে, দেশে বেকারের সংখ্যা কোটির কাছাকাছি। কেননা, প্রতিবছর নতুন করে ২০ থেকে ২২ লাখ কর্মক্ষম নারী-পুরুষ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের অনেকে কাজ পান, বেশিরভাগ মনমতো কাজ পান না। দেশে কাজ না পাওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষই জীবিকার অন্বেষণে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করে। কেউ সফল হয়, কেউ বিফল মনোরথ হয়ে অনিশ্চিত জীবনের পথে এগিয়ে যায়।
সহজ পথে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে আসায় ভিন্ন পথে অভিবাসন-প্রত্যাশীদের প্রেরণে একটি দালাল চক্র সক্রিয়। এরা বিদেশ গমনেচ্ছু মানুষদের কখনও নৌকাযোগে সমুদ্রপথে, কখনও শ্বাপদ-সংকুল গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। এর ফলে কখনও উত্তাল সমুদ্রে নৌকাডুবি, কিংবা খাদের অভাবে অনেকে মৃত্যুবরণ করছে। আবার গভীর জঙ্গলে হিংস্র পশুর করুণ শিকারে পরিণত হচ্ছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে নৌপথে এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বনজঙ্গলের মধ্য দিয়ে চাকরির অন্বেষণে ব্যাকুল মানুষদের পাঠিয়ে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যু উপত্যকায়। এর মধ্যে আবার রয়েছে চাঁদাবাজি। বিদেশ গমনেচ্ছুদের ভিনদেশে আটকে রেখে স্বদেশে তাদের স্বজন-পরিজনদের হুমকি দিয়ে আদায় করা হয় অর্থ। মাঝেমধ্যে এসব দুষ্টচক্রের দুই-চারজন ধরা পড়ার খবর পাওয়া যায় বটে। তবে অপরাধীদের বৃহদাংশ থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রতারণার ফাঁদে ফেলে জীবকান্বেষী মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার এ অপতৎপরতা বন্ধ করা কঠিনÑ সন্দেহ নেই। তবে সরকার কঠোর হওয়ার পাশাপাশি জনসাধারণ যদি সচেতন ও সজাগ হয়, তাহলে দুষ্কৃতকারীরা তাদের অপতৎপরতা বিস্তৃত করার সুযোগ পাবে না। কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিদেশে পাড়ি জমাতে ইচ্ছুক মানুষের ভাগ্য ও জীবন-জীবিকা আদম ব্যাপারী কিংবা দালাল ও অসাধু চক্রের হাতে জিম্মি হতে দেওয়া যায় না। তবে সবকিছুর উপরে বড় কথা হচ্ছে, আগে দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সৃযোগ সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করা জরুরি। বলা নিষ্প্রয়োজন, স্বদেশে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ অবারিত হলে কেউ আর বিপুল অর্থ ব্যয় করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ-বিভূঁইয়ে জীবিকার সন্ধানে যেতে উৎসাহিত হবে না। আর বেঘোরে প্রাণও হারাবে না।