× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঢাকার ফুটপাত: জীবিকা ও ভোগান্তি

সাদেকুর রহমান

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:০১ পিএম

একটি শহরের প্রায় ২৫ শতাংশ ফুটপাত থাকতে হয়। কিন্তু ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। ঢাকা শহরে মাত্র ১৬ ভাগ ফুটপাত আছে। ছবি: বিবিসি বাংলা

একটি শহরের প্রায় ২৫ শতাংশ ফুটপাত থাকতে হয়। কিন্তু ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। ঢাকা শহরে মাত্র ১৬ ভাগ ফুটপাত আছে। ছবি: বিবিসি বাংলা

ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। ঢাকা শহরের আয়তন মাত্র ৩৬০ বর্গকিলোমিটার। আয়তনে এই শহর খুব বড় না হলেও বসবাসকারী জনসংখ্যা অনেক। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যা হলো ৩ কোটি ৬৬ লাখ। এটি বিশ্বের ২য় জনবহুল শহর। অতিরিক্ত মানুষের চাপে এই শহর অতিষ্ঠ। এর প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পড়ে। যেমনÑ রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, যানবাহন ইত্যাদি। এই শহরে নানা ধরনের মানুষ বসবাস করে। তাদের একেকজনের জীবনের গল্প একেকরকম। এই শহরে শুধু ধনীরা বাস করে এমন নয়। অনেক দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যাও অনেক। মানুষ যেখানেই বসবাস করুক না কেন? জীবন যাপনের জন্য অর্থনৈতিক কার্যাবলির সাথে যুক্ত হতে হয়। এই শ্রেণির অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য ফুটপাতে ব্যবসার জন্য দোকান খুলে বসেছে। এসব দোকানে ফলমূল, শাকসবজি, চা, সিগারেট, মোবাইলের চার্জার, গহনা, জামাকাপড় বিক্রি করা হয়ে থাকে। এগুলোই হলো ফুটপাতের অর্থনীতির প্রাণশক্তি।

প্রতিদিনই ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। গ্রাম থেকে প্রতিদিন অনেক মানুষ ঢাকা শহরে আসে। তাদের আশা যে, ঢাকা শহরে এলেই জীবনের মোড় ঘুরে যাবে। তারা ধারণা করে যে, ঢাকা শহরে গেলেই জীবন নির্বাহ করার জন্য আয়ের ব্যবস্থা হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তাদের বেশিরভাগই অল্প শিক্ষিত। অনেকেই দক্ষতার অভাবের কারণে কোনো রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারে না। এ কারণে অন্য কোনো উপায় না দেখে ফুটপাতের ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। অন্যান্য ব্যবসার চেয়ে ফুটপাতের ব্যবসাতে যুক্ত হওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। কারণ শপিং মল কিংবা অন্য কোথাও কোনো একটি ছোট দোকান ভাড়া নিতেও অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু গ্রাম থেকে আসা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের এই লোকজনের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এর ফলে ফুটপাতই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র ব্যবসার জায়গা।

একটি শহরের প্রায় ২৫ শতাংশ ফুটপাত থাকতে হয়। কিন্তু ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। ঢাকা শহরে মাত্র ১৬ ভাগ ফুটপাত আছে। এসটিপি ২০২৫-এর খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা শহরে মোট ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাত আছে। কিন্তু ১০৮ কিলোমিটার অংশ অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে। ঢাকা শহরের প্রায় ৮০% ফুটপাত এখন আর হাঁটার জন্য নেই। সেগুলো দোকান, গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, যেসব জায়গায় অফিস, মার্কেট বা বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেখানে তো ফুটপাতের কোনো অস্তিত্বই নেই।

ফুটপাত মূলত মানুষের হাঁটার জন্য ব্যবহার করার জন্য তৈরি করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের শহরগুলোতে জনসংখ্যার অনেক চাপের কারণে এগুলো অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না । সাধারণত হিসাব করা হয় যে, ফুটপাতের প্রশস্ততা ২ মিটার হলে মানুষ সহজেই চলাচল করতে পারে। কিন্তু ঢাকা শহরের ৬৮ ভাগের এই প্রশস্ততা নেই। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরের ফুটপাতগুলো প্রশস্ততায় এক মিটার, দেড় মিটার ও পাঁচ মিটারের কম যথাক্রমে ৩৯ দশমিক ৪, ১৭ দশমিক ৪ ও ১০ শতাংশ।

ঢাকা শহরের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, ফুটপাতগুলোতে হাঁটার জন্য যথেষ্ট জায়গা নেই। ফুটপাতগুলো দখল করে রেখেছে বিভিন্ন ধরনের দোকান। এগুলোর জন্য জীবনযাত্রার মানের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফুটপাতে বিভিন্ন ধরনের দোকান থাকায় মানুষ হাঁটার জন্য মূল রাস্তা ব্যবহার করছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, বর্তমানে ঢাকা শহরের ৩৮ শতাংশ মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যস্থলে যায়। ২০০৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ২০ শতাংশ। রাস্তায় মূলত যানবাহন চলাচল করার কথা। কিন্তু ৩৮% মানুষ চলাচলের জন্য মূল রাস্তা ব্যবহার করে থাকে। ফলে নানা ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। মানুষ ফুটপাত ব্যবহার না করার কারণে ২৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

বিভিন্ন ধরনের দোকান থাকার কারণে এখানে ক্রেতার সংখ্যাও বেশি হয়ে থাকে। মানুষ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করে থাকে। এর ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়। ফুটপাতের দোকানের কারণে পরিবেশেরও অনেক ক্ষতি হয়। ফুটপাতে প্রায়ই শাকসবজির বাজার বসে। শাকসবজির আর্বজনার ফলে নালা-নর্দমা বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে।

এমনিতেই ব্যবসায় ঝুঁকি বেশি থাকে। ফুটপাতের ব্যবসার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। এখানে ব্যবসায়ীরা অস্থায়ীভাবে ব্যবসা শুরু করে। এমনও হতে পারে, সকালে ব্যবসা করলেও সন্ধ্যাবেলায় সরকারের নির্দেশÑ এ জায়গা ছেড়ে দিতে হতে পারে। এর ফলে ফুটপাত কিছু দিনের জন্য ফাঁকা হয়ে যায়। কিন্তু কয়েক দিন পরই ফুটপাত আবারও আগের মতোই হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হলো এই বিশাল জনগোষ্ঠী শহর থেকে চলে যায় না। সাময়িকভাবে কিছুদিন ব্যবসা বন্ধ রাখে। শহরের মানুষের একটি বড় অংশ ফুটপাতের ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। অনেকের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে এর ওপর। আবার অনেকের কাছে এইসব দ্রব্যের চাহিদা রয়েছে। 

ফুটপাতের সমস্যার সমাধান করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। ফুটপাতের ব্যবসার জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। শহরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ছোট ছোট দোকান তৈরি করে দেওয়া যেতে পারে। এসব দোকানের ভাড়া অল্প হবে। অনেক দেশেই এরকম ব্যবস্থা আছে। যেমনÑ থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি। মোবাইল দোকানের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। 

সরকার শহরমুখী মানুষের সংখ্যা কমানোর ব্যবস্থা করতে পারে। সরকার বিভিন্ন ধরনের ঋণ প্রদান করতে পারে। আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে হতে হবে। ঢাকা শহরে জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে। ফুটপাতের চাপ বাড়বে আরও। ফুটপাতের অর্থনীতিকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটি নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফুটপাত শুধু হাঁটার রাস্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হাজারো মানুষের জীবিকার স্থান। তাই আইন ও সহানুভূতির সংমিশ্রণ হলেই ঢাকা সুন্দর শহর হবে।


সাদেকুর রহমান

গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা