নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:০৯ পিএম
নিরঞ্জন রায়, সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমি বাংলাদেশে যে এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছি এবং বেড়ে উঠেছি, সেটি মূলত পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার তাঁতসমৃদ্ধ অঞ্চল বেলকুচি, চৌহালি এবং শাহজাদপুর। ছোটবেলায় ভোরে আমাদের ঘুম ভাঙত তাঁতের খটখট শব্দে। সে সময় আমাদের অত্র অঞ্চলের প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে তাঁতের কারখানা ছিল। তাঁত মূলত কুটিরশিল্প, তাই কারখানা বলতে যা বোঝায় তেমন ছিল না। প্রায় বাড়িতেই একটি টিনের ঘর থাকত এবং সেই ঘরেই তাঁতের মেশিন স্থাপন করে সেখানে কাপড় বোনা বা তৈরি করা হতো এবং এখনও হয়। এসব বাড়িতে অবস্থাভেদে দুটো তাঁতের মেশিন থেকে শুরু করে পঞ্চাশ বা তারও বেশি তাঁতের মেশিন থাকত। কারও বাড়িতে শতাধিক তাঁতের মেশিনও ছিল। যারা এই মেশিনে কাপড় তৈরি করে, তাদেরকে আঞ্চলিক ভাষায় তাঁতি বলা হয়। আমাদের সময় তাঁতশিল্পের কারণে এলাকায় রমরমা অবস্থা বিরাজ করেছে।
তাঁতশিল্পে বাংলাদেশের মানুষের নিত্য ব্যবহৃত কাপড়চোপড় তৈরি হয়। প্রধানত মহিলাদের জন্য শাড়ি এবং পুরুষদের জন্য লুঙ্গি, ধুতি এবং গামছা উৎপন্ন হয়। এর বাইরে কিছু থান কাপড়ও উৎপন্ন হতে দেখেছি। তাঁতশিল্পে উৎপাদিত কাপড় যেমন আরামদায়ক, তেমনি টেকসই। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে এসব কাপড়ের রকমারি ডিজাইন। তাঁতের যারা কারিগর তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে হরেকরকমের ডিজাইনের কাপড় তৈরি করতে পারে। এককথায় তাঁতের কারিগর যেভাবে মনে করবে সেভাবেই কাপড়ের ডিজাইন তৈরি করতে পারবে। আকর্ষণীয় রঙ এবং ডিজাইনের কারণেই তাঁতের শাড়ি এবং লুঙ্গি যারপরনাই জনপ্রিয়। আমার এক বন্ধুর তাঁতের কারখানা আছে। এটিকে অবশ্য কারখানা না বলে ইন্ডাস্ট্রি বলাই শ্রেয়। কেননা তাদের বাড়িতে বিশাল আকৃতির একাধিক ফ্যাক্টরি ঘর, যেখানে আছে কয়েকশ তাঁতের মেশিন। সেখানে এত উন্নতমানের শাড়ি ও লুঙ্গি তৈরি হয়, যা ব্যবহার না করলে লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। আমার সেই বন্ধু আমাকে কয়কটি লুঙ্গি দিয়েছিল ব্যবহার করার জন্য। আমি মসলিন কাপড়ের গল্প শুনেছি এবং বইপুস্তকে পড়েছি, কিন্তু চোখে দেখিনি। তবে আমার বন্ধুর বাড়ির তাঁতে উৎপন্ন লুঙ্গি দেখার পর আমার মসলিন দেখার শখ মিটে গেছে। লুঙ্গিগুলো এতটাই মসৃণ এবং উন্নতমানের যে বিশাল সাইজের একটি লুঙ্গি সিগারেটের প্যাকেটের মতো ছোট্ট একটি প্যাকেটে রেখে বাজারজাত করা হয়। আজকে বিশ্বব্যাপী জামদানি শাড়ির যেমন জনপ্রিয়তা, তাঁতের শাড়িরও তেমনি জনপ্রিয়তা আছে। বরং জামদানি শাড়ির চাহিদা খুবই সীমিত, কিন্তু তাঁতের শাড়ির চাহিদা ব্যাপক এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত।
তাঁতশিল্প যে শুধু তাঁতের মালিক এবং তাঁতিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তেমন নয়। এই তাঁতশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আরও অনেক রকমের ব্যবসা। যেমন তাঁতের কাপড়ের অন্যতম উপাদান হচ্ছে রঙ ও সুতা। ফলে তাঁতপ্রধান অঞ্চলে গড়ে ওঠে রঙ, সুতার এক বিশাল ব্যবসা। তাঁতশিল্পে উৎপাদিত কাপড় বিক্রির জন্য গড়ে ওঠে স্থানীয় বাঁজার, যাকে আঞ্চলিক ভাষায় কাপড়ের হাট বলা হয়ে থাকে। আমাদের অঞ্চলে সে সময় দুটো কাপড়ের হাট বসত, যার একটি হচ্ছে সোহাগপুর হাট এবং অন্যটি এনায়েতপুর হাট। সোহাগপুর হাট ছিল সে সময় বৃহত্তম কাপড়ের হাট, যেখানে দুই দিনব্যাপী কাপড় ক্রয়-বিক্রয়ের কার্যক্রম চলেছে। মঙ্গলবার বিকালে শুরু হয়ে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাটের কার্যক্রম চলত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এই হাটে আসত এতদঞ্চলে উৎপাদিত তাঁতের কাপড় ক্রয় করার জন্য। আমাদের অঞ্চলের তাঁতিরা শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত যত কাপড় উৎপন্ন করত, সেগুলো সোহাগপুর হাটে বিক্রি করে সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে কাপড় তৈরির কাঁচামাল সুতা ও রঙ কিনে নিয়ে আসত পরবর্তী সপ্তাহের কাপড় তৈরির জন্য। আর মঙ্গল থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যত কাপড় উৎপন্ন হতো, সেগুল এনায়েতপুর হাটে বিক্রি করে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ এবং নিজেদের খরচ মেটানোর কাজ চলত। এটিই ছিল মূলত তাঁতিদের সাধারণ নিয়মের উৎপাদন চক্র বা প্রডাকশন সাইকেল। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও যথেষ্টই ছিল।
তাঁতশিল্প আপাতদৃষ্টিতে বোঝা না গেলেও এটি যথেষ্ট শ্রমঘন উৎপাদন ব্যবস্থা। একটি তাঁতের পিছনে বেশ কয়েকজনের শ্রম নিয়োজিত থাকে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে তাঁত এমন একটি উৎপাদন ব্যবস্থা যেখানে পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের শ্রম নিয়োজিত থাকে। তাঁতে যে কাপড় তৈরি হয় সেখানে পুরুষরাই কাজ করে। কিন্তু কাপড়ের রসদ জোগানোর যে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ আছে, বিশেষ করে সুতা কাপড় বুননের জন্য প্রস্তুত করে দেওয়ার কাজটা করে মহিলারা। তাঁতের কাজের পিছনে যে মহিলাদের ব্যাপক শ্রম ছিল, সেটা কিন্তু নীরবে-নিভৃতেই থেকেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সেসব মহিলা শ্রমিকের অধিকাংশই নিজ বাড়িতে বসে কাজগুলো সম্পন্ন করত এবং অর্থও উপার্জন করত। তারপরও তাদের অবদান আজকের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মতো মোটেই দৃশ্যমান এবং স্বীকৃত ছিল না।
মূলত তাঁতশিল্প এমন এক ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়া যেখানে সব শ্রেণির মানুষের শ্রমের প্রয়োজন। বাড়ির পুরুষ, মহিলা এবং এমনকি ছোট ছেলেমেদের কোনো না কোনো কাজে শ্রম দিতে হয় এবং সব শ্রমই আর্থিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। আমরা ছোটবেলায় লক্ষ করেছি যে, একটি বাড়িতে যতজন সদস্য, তাদের প্রত্যেকেই তাঁতের কাজের সাথে নিয়োজিত থাকত। এ কারণেই আমাদের এলাকায় সচ্ছলতা না থাকলেও দরিদ্রতা মোটেই ছিল না। সবাই দুবেলা ভালো খেতে এবং ভালো পরতে পারতেন। অবশ্য যারা তাঁতশিল্পের মালিক, তারা যথেষ্ট সচ্ছল ছিলেন। প্রত্যেকের বাড়িতে বিশাল আকৃতির ঘরবাড়ি এবং সাধারণ বাহন হিসেবে মোটরসাইকেল অনেকের বাড়িতেই ছিল। এমনকি এলাকার স্থানীয় জনগণের মাধ্যমে তাঁতশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিকের চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল না। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক এসে এখানে তাঁতের কাপড় উৎপাদনের কাজ করত।
আমি ওপরে এতক্ষণ তাঁতশিল্পের যে আকর্ষণীয় বর্ণনা দিলাম, সেটি আমার ছোটবেলায় দেখা তাঁতশিল্পের অবস্থা, যা আজ ইতিহাসে পরিণত হতে বসেছে। কয়েক বছর আগে যখন বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম, তখন নিজ গ্রাম এনায়েতপুরেও গিয়েছিলাম। নিজ গ্রামে অভাবনীয় উন্নতি দেখে মুগ্ধ হলেও হতাশ হয়েছি উন্নতির আড়ালে আমাদের এলাকার গৌরব, তাঁতশিল্প হারিয়ে যেতে দেখা। হস্তচালিত তাঁত বা হ্যান্ডলুম তো বিলীন হয়ে গেছে অনেক আগেই। সেই স্থান এখন দখল করেছে বিদ্যুচ্চালিত তাঁত বা পাওয়ারলুম। আগে যেখানে প্রত্যেকের বাড়িতেই তাঁত দেখা যেত, এখন সেখানে অধিকাংশের বাড়িতে কোনো তাঁত নেই। এখন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের বাড়িতে প্রচুর বিদ্যুচ্চালিত তাঁত আছে এবং সেগুলো সংখ্যায় এত বেশি যে এখন এটি ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি একসময়ের জমজমাট কাপড়ের পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত সোহাগপুর এবং এনায়েতপুর হাট মৃতপ্রায়।
সম্ভাবনাময় এই খাত কেন যে হারিয়ে গেল তা ভাবতে অবাক লাগে। তাঁতশিল্পে যে ধরনের কাপড় উৎপন্ন হয়, তার ব্যাপক চাহিদা দেশে আছে। এমনকি দেশের বাইরেও সীমিত পরিমাণে রপ্তানির সুযোগ আছে। শুধু তাই নয়, এই শিল্পে উৎপাদিত কাপড় মানুষের নিত্যদিনের ব্যবহার উপযোগী। ফলে এর চাহিদা সর্বদা ঊর্ধ্বমুখী। আমার কাছে সঠিক তথ্য নেই। তবে জনসংখ্যার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে দেশে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি শাড়ি এবং ১২ থেকে ১৪ কোটি লুঙ্গি ও ধুতির চাহিদা থাকার কথা। এ ছাড়াও আছে থান কাপড় এবং অন্যান্য কাপড়ের চাহিদা। বছরে এই পরিমাণ তাঁতের কাপড় উৎপন্ন করতে হলে দেশে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ লাখ তাঁতের মেশিন চালু থাকতে হবে। দেশে এখন কী পরিমাণ তাঁতের মেশিন চালু আছে, তার সঠিক তথ্য আমার জানা নেই। তবে তাঁতসমৃদ্ধ অঞ্চল সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ও এনায়েতপুরে তাঁতের যে অবস্থা দেখেছি, তাতে মনে হয় না যে এর অর্ধেক সংখ্যক তাঁতও চালু আছে।
একসময়ের জনপ্রিয় এই তাঁতশিল্পের এমন বেহাল অবস্থার পিছনে অনেক কারণ আছে, যার মধ্যে মিলের সস্তা কাপড় এবং বিদেশ থেকে আসা কাপড়ে বাজার সয়লাব হয়ে যাওয়া অন্যতম। কিন্তু আমি তাঁতসমৃদ্ধ অঞ্চলে বেড়ে ওঠার সুবাদে যে কারণগুলো কাছে থেকে দেখছি, সেগুলোও তাঁতশিল্পের হারিয়ে যাওয়ার পিছনে কম দায়ী নয়।
প্রথমত, যারা এই তাঁতশিল্প নিয়ে কাজ করেছে তাদের সেরকম ব্যবসায়িক জ্ঞান ছিল না। নিজেরা যা বুঝেছে, সেটাই করেছে। ফলে এই ব্যবসা বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারেনি।
দ্বিতীয়ত, মূলধন ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে চলতি মূলধন ব্যবস্থাপনা তাঁত ব্যবসায়ীরা একেবারেই জানে না। অথচ তাঁতশিল্প এমন এক ধরনের ব্যবসা, যেখানে স্থায়ী মূলধনের চেয়ে চলতি মূলধনের গুরুত্ব অনেক বেশি।
তৃতীয়ত, তাঁতের কাপড়ের চাহিদার উত্থান-পতন অনেক বেশি। বিশেষ করে, বছরের কিছু সময় চরম মন্দা বিরাজ করে। এই মন্দার সময় কীভাবে উৎপাদন চালু রেখে তুলনামূলক কম খরচে বেশি কাপড় উৎপন্ন করে ভবিষ্যতে ব্যাপক চাহিদার সময় বাজারে বেশি মূল্যে বিক্রি করে ব্যবসায় টিকে থাকা এবং লাভ ঘরে তোলার যে কৌশল, তা অধিকাংশ তাঁত ব্যবসায়ী জানে না।
চতুর্থত, ভালো গুদামজাত এবং বাজারজাত করার আধুনিক সুযোগও সেভাবে নেই।
পঞ্চমত, এই তাঁত ব্যবসায় বাকিতে ক্রয়-বিক্রয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। অথচ এই বাকিতে ক্রয়-বিক্রয়ের যে ঝুঁকি, তা সঠিকভাবে ম্যানেজ করতে না পারার কারণে অনেক তাঁত ব্যবসায়ী এই ব্যবসা থেকে হারিয়ে গেছে।
অথচ এসব সমস্যার সন্তোষজনক সমাধানের মাধ্যমে এই তাঁতশিল্পকে শুধু টিকিয়ে রাখা নয়, এই শিল্পকে দেশের সম্ভাবনাময় এক খাতে রূপান্তর করা সম্ভব। এসব পদক্ষেপ সঠিকভাবে তুলে ধরতে গেলে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, যার সুযোগ এখানে নেই। তাই অন্য কোনো পরিসরে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা