× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কর্মসংস্থানমুখী বাংলাদেশ গড়তে হবে

ড. মো. সহিদুজ্জামান

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৮ এএম

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১৮ পিএম

ড. মো. সহিদুজ্জামান; অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ড. মো. সহিদুজ্জামান; অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রতি বছর ১৩-১৪ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু অর্থনীতি সেই হারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ২৬.৭৬ মিলিয়ন তরুণ শ্রমশক্তির মধ্যে ১.৯ মিলিয়ন বা ৭.২ শতাংশই বেকার। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই (৭৮.৯ শতাংশ) এই বয়সভিত্তিক তরুণ সমাজ। ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট বেকার তরুণের মধ্যে ১.৩৪ মিলিয়ন বা ৬৯.১ শতাংশ গ্রামীণ অঞ্চলে এবং ০.৬০ মিলিয়ন বা ৩০.৯ শতাংশ শহরাঞ্চলে বসবাস করছেন। প্রতিবেদনটি আরও বলেছে, বেকারত্বের এই হার উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৩১.৫ শতাংশ; যেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করা তরুণদের ক্ষেত্রে এই হার যথাক্রমে ২১.৩ শতাংশ ও ১৪.৯ শতাংশ।

২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা বিপুলসংখ্যক তরুণের উল্লেখযোগ্য অংশ কর্মহীন থেকে যাওয়ার বাস্তবতা আমাদের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্যকেই নির্দেশ করে।

বর্তমান সরকারের প্রায় ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইসিটি খাতে প্রায় ৮ লাখ চাকরি এবং তরুণদের জন্য বিশেষ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে কেবল চাকরি সৃষ্টি নয় বরং উদ্যোক্তা তৈরি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি অপরিহার্য। এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

সমস্যার মূল কারণ শুধু কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা নয় বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও প্রধানত ডিগ্রিকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রদান করে, যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জিত হলেও তা দক্ষতা ও বাস্তব প্রয়োগে রূপান্তরের সুযোগ সীমিত। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী চাকরি খোঁজার জন্য প্রস্তুত হয়, কিন্তু চাকরি সৃষ্টির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষতা ও উদ্যোক্তাভিত্তিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়া এখন সময়ের দাবি।

তরুণ প্রজন্ম আমাদের একটি বিশাল সম্ভাবনার উৎস। সঠিক দিকনির্দেশনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেলে এই তরুণরাই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।  গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে তাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে। চীনের ‘Mass Entrepreneurship and Innovation’ উদ্যোগ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ নিজস্ব উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে এবং অর্থনীতি ধীরে ধীরে উদ্ভাবননির্ভর কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করা জরুরি। প্রথমত, পাঠ্যক্রমে উদ্যোক্তা শিক্ষা এবং আন্তঃবিষয়ক শেখার সুযোগ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, সমস্যা সমাধান, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইনকিউবেশন সেন্টার, স্টার্টআপ ল্যাব এবং মেকার স্পেস প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইনকিউবেশন সেন্টার প্রাথমিক ধারণাকে ব্যবসায়িক কাঠামোয় রূপ দিতে সহায়তা করবে; স্টার্টআপ ল্যাব উদ্ভাবনকে পণ্য বা সেবায় পরিণত করার প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে এবং মেকার স্পেস শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে সৃজনশীল চিন্তাকে বাস্তব রূপ দিতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্টার্টআপ উদ্যোগকে একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান, যেমন থিসিস বা প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ, উদ্যোক্তা হওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা হিসেবে কাজ করতে পারে।

তৃতীয়ত, শিক্ষকদের ভূমিকায় পরিবর্তন আনতে হবে। তারা শুধু জ্ঞানদাতা নয় বরং মেন্টর ও উদ্ভাবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত করা জরুরি, যাতে গবেষণালব্ধ জ্ঞান অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারে।

কারিগরি ও প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা ও টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নকালেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধীনে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারা আধুনিক গবেষণাগার, খামার ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা, ফুড প্রসেসিং ইউনিট, ডেইরি, পোল্ট্রি এবং অ্যাগ্রো-যন্ত্রপাতি ওয়ার্কশপে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করলে তাদের বাস্তব দক্ষতা বাড়বে এবং দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারে সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

একইভাবে অন্যান্য কারিগরি শিক্ষায়ও ‘learning by doing’ পদ্ধতির ওপর জোর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, তরুণদের শৃঙ্খলা, নেতৃত্বগুণ ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে জাতীয় সেবামূলক প্রশিক্ষণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সেই আলোকে বাংলাদেশে স্বেচ্ছাভিত্তিক বা আংশিক বাধ্যতামূলক একটি ‘ন্যাশনাল সার্ভিস’ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে, যেখানে তরুণরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেনাবাহিনী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করবে। এতে তাদের কর্মদক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বাড়ার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নেও সরাসরি অবদান রাখা সম্ভব হবে।

এছাড়া এই রূপান্তরকে কার্যকর করতে ক্রেডিটভিত্তিক ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, শিক্ষার্থীদের স্টার্টআপকে একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান এবং গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা ট্র্যাকিং চালু করার মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় সমস্যাভিত্তিক উদ্ভাবন, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যর্থতাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার নীতিও এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

এ সামগ্রিক রূপান্তর বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার ও শিল্প খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারকে উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি, সহজ অর্থায়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাসের মাধ্যমে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিল্প খাতকে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো, ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি এবং সফল উদ্যোগগুলোকে বাজারে সম্প্রসারণে সহায়তা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় এই দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবকাঠামো নয়, বরং মানসিকতার পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে চাকরিনির্ভর একটি মানসিকতা গড়ে উঠেছে, যেখানে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড একটি স্থায়ী চাকরি। এই ধ্যানধারণা থেকে বের হয়ে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে ভাবতে শেখানো সহজ নয়, কিন্তু এটি অপরিহার্য।

তরুণ প্রজন্ম আমাদের একটি বিশাল সম্ভাবনার উৎস। সঠিক দিকনির্দেশনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেলে এই তরুণরাই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে। এখন সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, আমরা কি ডিগ্রিধারী বেকার তৈরি করে যাব, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা তৈরি করে একটি আত্মনির্ভর বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলব?


ড. মো. সহিদুজ্জামান 

অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা