× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মহাসাগরীয় রাজনীতি: মালাক্কা থেকে বঙ্গোপসাগর

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:২৯ পিএম

মালাক্কা প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, এটি এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যের মূল চাবিকাঠি। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

মালাক্কা প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, এটি এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যের মূল চাবিকাঠি। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

একবিংশ শতাব্দীতে এসে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। বিশেষ করে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘকালীন দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল হিমালয়ের বরফাবৃত গালওয়ান উপত্যকা কিংবা দুর্গম গিরিপথের স্থলযুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই। এই দ্বন্দ্বের এক নতুন ও অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার ‘মালাক্কা প্রণালী’। চীনের জন্য এই জলপথটি যেমন ‘লাইফলাইন’, ভারতের জন্য এটি তেমনি বেইজিংকে নিয়ন্ত্রণে রাখার এক মোক্ষম ‘তুরুপের তাস’। এই দ্বৈরথে যে ‘মালাক্কা উভয়সংকট’ বা ‘Malacca Dilemma’ তৈরি হয়েছে, তাতে যুক্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’। এই বহুমুখী সমীকরণ এখন কেবল বেইজিং বা দিল্লিতে নয়, বরং বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের উদীয়মান সমুদ্র-অর্থনীতি (Blue Economy) এবং আমাদের কৌশলগত বন্দর অবকাঠামোর ওপর এক বিশাল প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

মালাক্কা প্রণালি হলো মালয় উপদ্বীপ এবং ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী এক সংকীর্ণ নৌপথ, যা ভারত মহাসাগরকে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। চীনের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই প্রণালীর কোনো বিকল্প নেই। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চীনের মোট আমদানিকৃত খনিজ তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং দেশটির সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই অতি-নির্ভরশীলতা চীনের জন্য একটি চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি। ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে অবস্থিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশপথের একেবারে মুখে অবস্থিত হওয়ায় ভারত এখান থেকে খুব সহজেই যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চীনের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

ভারত মহাসাগরের এই সমীকরণে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (IPS) মূলত চীনকে সমুদ্রে ঘিরে ফেলার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ওয়াশিংটন ভারতকে এই অঞ্চলের ‘নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার’ বা প্রধান নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর এবং ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটির সামরিক উপস্থিতি ভারতের জন্য এক বিশাল ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করে।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে গঠিত ‘কোয়াড’ (QUAD) জোট মালাক্কা প্রণালি এবং দক্ষিণ চীন সাগরে নজরদারি বাড়িয়েছে। আমেরিকার উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য ভারতকে চীনের সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজের গতিবিধি নির্ণয়ে সহায়তা করছে। ফলে মালাক্কা প্রণালিতে ভারতের যেকোনো পদক্ষেপ এখন আর কেবল একক কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক জোটের সম্মিলিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ। এই মার্কিন প্রভাব চীনকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর মাধ্যমে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করছে, যা পরোক্ষভাবে বঙ্গোপসাগরের রাজনীতিকে উত্তপ্ত করছে।

ভারত-চীন দ্বৈরথ এবং মার্কিন প্রভাবের এই ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাঝখানে বাংলাদেশের ‘ব্লু-ইকোনমি’ বা সমুদ্র-অর্থনীতি এক নতুন মোড় নিয়েছে। ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের পর বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মালিকানা পেয়েছে। এই বিশাল জলরাশি বাংলাদেশের জন্য এক অর্থনৈতিক খনি।

মার্কিন ও জাপানি বিনিয়োগে মাতারবাড়ীতে যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হচ্ছে, তা মূলত মালাক্কা প্রণালির ওপর ভূ-রাজনৈতিক চাপ কমানোর একটি কৌশল। এটি দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যের এক নতুন ‘হাব’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) জন্য লাইফলাইন হয়ে উঠবে। এই বন্দরের কৌশলগত অবস্থান চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রÑ উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা বিশাল তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আহরণে মার্কিন ও চীনা কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি এই সম্পদ সঠিকভাবে উত্তোলন করতে পারে, তবে দেশের জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা কমবে। কিন্তু ভারত ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনা যদি মালাক্কা বা বঙ্গোপসাগরে সামরিক মহড়ায় রূপ নেয়, তবে বিদেশি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।

সমুদ্র-অর্থনীতির বড় একটি অংশজুড়ে আছে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ এবং পর্যটন। বঙ্গোপসাগরে শান্তি বজায় না থাকলে এই খাতগুলো বিকশিত হতে পারবে না। বিশেষ করে, ব্লু-ইকোনমি বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা এবং পায়রাবন্দর এখন বিশ্বশক্তির নজরদারিতে। বিশেষ করে, মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর এবং আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল সরাসরি সামুদ্রিক বাণিজ্যের সাথে যুক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে পশ্চিমা বিনিয়োগ বাড়াতে, যাতে চীনের একক প্রভাব কমানো যায়। আবার চীন চায় তাদের বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তাদের সরবরাহ চেইনের একটি শক্তিশালী অংশ বানাতে। মালাক্কা প্রণালীতে কোনো অবরোধের পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশের এই বন্দরগুলো এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোই হতে পারে বিকল্প বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র।

বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে যোগ না দিয়ে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’Ñ নীতির ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া। একদিকে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং মার্কিন প্রভাব, অন্যদিকে চীনের বিশাল অবকাঠামোগত বিনিয়োগ। এই তিন শক্তির টানাপড়েনের মাঝে নিজের সমুদ্র-অর্থনীতিকে রক্ষা করা এবং বন্দরগুলোর নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষা।

মালাক্কা প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, এটি এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যের মূল চাবিকাঠি। হিমালয়ের বরফ গলা জল যেমন নদী-তীরবর্তী দেশগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ করে, তেমনি ভারত মহাসাগরের এই নীল জলরাশিই নির্ধারণ করবে আগামীর পরাশক্তি কে হবে। বাংলাদেশের জন্য সমুদ্র-অর্থনীতি কেবল একটি শব্দ নয়, এটি সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত।

মার্কিন প্রভাব এবং ভারত-চীন দ্বৈরথের এই উত্তাল সময়ে বাংলাদেশ যদি বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শী কূটনীতির পরিচয় দিতে পারে, তবে বঙ্গোপসাগরই হতে পারে বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। মাতারবাড়ী থেকে মিরসরাই পর্যন্ত যে অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর। মালাক্কা প্রণালির সংকটের ছায়া যাতে আমাদের সমুদ্র-অর্থনীতিকে গ্রাস করতে না পারে, সেজন্য এখনই একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক নীতিমালা গ্রহণ করা জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য।


শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

কলাম লেখক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা