এম, এ বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪৫ পিএম
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে তৃণমূল পর্যায়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে তৃণমূল পর্যায়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তেমনি নাগরিক দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত থাকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। গ্রাম থেকে শহর-রাস্তা-ঘাট, ড্রেনেজ, বিশুদ্ধ পানি, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা কিংবা কৃষি ও ক্ষুদ্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন এসব সেবার বড় অংশই স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে স্থানীয় নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি গণতন্ত্র চর্চায় নাগরিক অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার একটি মৌলিক ভিত্তি। শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কাঠামোই মূলত গণতন্ত্রকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত করে এবং জনগণের ক্ষমতায়নের বাস্তব ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কয়েকটি স্তরে বিভক্তÑ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলার পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন। গ্রামীণ জনগণের সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রশাসনিক সংস্থা হলো ইউনিয়ন পরিষদ। এখানে একজন চেয়ারম্যান মাসিক প্রায় ৮,০০০ টাকা সম্মানী পান এবং সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্যরা প্রায় ৫,০০০ টাকা সম্মানী পান। অথচ ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের দায়িত্বের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। নাগরিক সনদ প্রদান, বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তদারকি, স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি সহায়তা বণ্টন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক বিরোধ মীমাংসার দায়িত্বও তাদের ওপর বর্তায়। দায়িত্বের তুলনায় সম্মানীর পরিমাণ যে খুবই সীমিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পৌরসভা পর্যায়ে দায়িত্ব ও প্রশাসনিক পরিধি কিছুটা বড় হওয়ায় সম্মানীর পরিমাণও তুলনামূলক বেশি। পৌরসভার শ্রেণিভেদে মেয়ররা সাধারণত প্রায় ২৪ হাজার থেকে ৩৮ হাজার টাকার মধ্যে মাসিক সম্মানী পান। অন্যদিকে পৌর কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলররা প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার টাকার মতো সম্মানী পেয়ে থাকেন। উপজেলা পরিষদের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত। সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান মাসিক প্রায় ৪০ হাজার টাকা এবং ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রায় ২৭ হাজার টাকার মতো সম্মানী পান। শহরাঞ্চলের সর্বোচ্চ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনে একজন মেয়র প্রায় ৮৫ হাজার টাকা এবং কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলররা প্রায় ৩৫ হাজার টাকার মতো সম্মানী পেয়ে থাকেন। এই সম্মানী কাঠামো পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের মধ্যে সম্মানীর উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে, যদিও দায়িত্বের ক্ষেত্র প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক।
কিন্তু বাস্তবতার আরেকটি দিক হলো নির্বাচনী ব্যয়ের প্রশ্ন। স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণা, কর্মী ব্যবস্থাপনা, পোস্টার-ব্যানার, যানবাহন, জনসংযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণাসহ নানা খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যয় সরকারি সম্মানীর তুলনায় বহুগুণ বেশি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নির্বাচনী ব্যয় ও সরকারি সম্মানীর মধ্যে একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। এই বৈপরীত্য কখনও কখনও নেতিবাচক প্রবণতার জন্ম দিতে পারেÑ যেখানে নির্বাচনের সময় ব্যয় করা অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা স্থানীয় প্রশাসনে অনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা সুশাসনের পথে বড় বাধা।
স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা। স্থানীয় সরকার মূলত একটি সেবামূলক ও প্রশাসনিক কাঠামো, যার প্রধান লক্ষ্য স্থানীয় উন্নয়ন ও নাগরিকসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সরাসরি দলীয় সমর্থন দেয়, তাহলে নির্বাচনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রভাব, সংগঠনিক শক্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে অন্য প্রার্থীদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এতে সাধারণ ভোটারদের স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং নির্বাচন প্রকৃত অর্থে সমান সুযোগের প্রতিযোগিতা থেকে সরে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় নির্বাচন অনেক সময় প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা বা জনসেবার মানসিকতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ নিরপেক্ষভাবে জনসেবা প্রদান থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের জন্য স্থানীয় নির্বাচন এমন হওয়া প্রয়োজন যেখানে সব প্রার্থী সমান সুযোগ পায় এবং ভোটাররা স্বাধীনভাবে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন। স্থানীয় সরকারকে দলীয় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে, বরং জনসেবার একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।
তাই স্থানীয় নির্বাচন অর্থ ও প্রভাবমুক্ত রাখা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, প্রার্থীদের আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি নির্বাচন অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাররা যদি প্রলোভন বা সাময়িক সুবিধার বাইরে গিয়ে সততা, দক্ষতা এবং জনকল্যাণের মানসিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, তাহলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ছাড়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কখনোই পরিপূর্ণতা পায় না। স্থানীয় নির্বাচন যদি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায়সঙ্গত হয়, তাহলে তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে, উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। অর্থ ও প্রভাবের অপব্যবহার থেকে মুক্ত একটি স্থানীয় নির্বাচনই পারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্র সংস্কৃতির শিকড়কে গভীরে প্রবেশ করিয়ে ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে।
এম, এ বাকী বিল্লাহ
রাজনীতি বিশ্লেষক