মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০৯ পিএম
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দারিদ্র্যের হার কমেছে, শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, অর্থনীতি ধীরে ধীরে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো সমাজের একটি বড় অংশ এখনও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। গ্রাম থেকে শহর অসংখ্য পরিবার এখনও নিত্যদিনের মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
উন্নয়নের এই বৈপরীত্য আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেÑ কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরও ন্যায়সঙ্গতভাবে সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছানো যায়। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইসলামের একটি মৌলিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক বিধান, জাকাত নতুন গুরুত্ব নিয়ে সামনে আসে।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে জাকাত প্রদান করেন। কিন্তু বাস্তবে এই বিপুল অর্থের বড় অংশই ব্যক্তিগতভাবে, বিচ্ছিন্নভাবে এবং পরিকল্পনাহীনভাবে বিতরণ হয়। ফলে জাকাতের সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না।
অনেক সময় জাকাতের অর্থ সাময়িক সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু তা দরিদ্র মানুষের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে না। অথচ সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে এই অর্থ দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে একটি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলামে জাকাত কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি একটি সুসংগঠিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতি। এর মূল দর্শন হলো সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা।
ধনী মানুষের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার মাধ্যমে সমাজে সম্পদের প্রবাহ সচল রাখা এবং বঞ্চিত মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দেওয়াÑ এই ধারণাটিই জাকাতের কেন্দ্রবিন্দু। ইসলামী অর্থনীতির এই দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দারিদ্র্যকে কেবল সাময়িক দানের মাধ্যমে লাঘব করা নয়, বরং মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা। অর্থাৎ জাকাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন করে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে।
বাংলাদেশে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি কেন্দ্রীয় জাকাত বোর্ড থাকলেও বাস্তবে জাকাত ব্যবস্থাপনা এখনও পুরোপুরি সংগঠিত কাঠামোর মধ্যে আসেনি। অধিকাংশ মানুষ নিজেরাই জাকাত হিসাব করে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা স্থানীয় দরিদ্রদের মধ্যে তা বিতরণ করেন। এতে মানবিকতা ও সহমর্মিতার প্রকাশ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচনের মতো কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটানো কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেওয়া সহায়তা অনেক সময় সাময়িক প্রয়োজন মেটায়, কিন্তু তা অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথ তৈরি করতে পারে না।
একজন দরিদ্র মানুষকে যদি জাকাত হিসেবে কিছু অর্থ বা খাদ্য দেওয়া হয়, তাহলে তার কয়েক দিনের সমস্যা হয়তো সমাধান হয়, কিন্তু যদি সেই অর্থ দিয়ে তাকে একটি ছোট ব্যবসা শুরু করতে সহায়তা করা যায়, অথবা তাকে কোনো কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে সে ভবিষ্যতে নিজেই আয় করতে পারবে। তখন সে আর সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না, বরং নিজেই সমাজে অবদান রাখতে পারবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই জাকাতকে কেবল দানের ধারণা থেকে বের করে একটি কার্যকর
উন্নয়ন কৌশলে রূপ দিতে পারে। যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাত ব্যবস্থাপনা সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত
হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে
পারে।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা অনুযায়ী, দেশে সম্ভাব্য জাকাতের পরিমাণ প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এই বিপুল অর্থ যদি পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা যায়, তাহলে তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
বিশ্বের কিছু মুসলিম দেশে ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাত ব্যবস্থাপনার সফল উদাহরণ রয়েছে। সেখানে জাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্র মানুষের আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির মতো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাংলাদেশও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি আধুনিক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলা।
শক্তিশালী জাতীয় জাকাত কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে জাকাত সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা, দরিদ্র মানুষের একটি নির্ভুল ডেটাবেজ তৈরি এবং উৎপাদনমুখী সহায়তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিÑ এই ধরনের উদ্যোগ জাকাত ব্যবস্থাপনাকে একটি কার্যকর সামাজিক উন্নয়ন কাঠামোতে পরিণত করতে পারে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা গেলে জাকাতের অর্থ মানব সম্পদ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যেকোনো বড় সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যদি জাকাত-ভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচনকে একটি জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে তা বাস্তবায়ন অনেক সহজ হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি জাকাত-ভিত্তিক
অর্থনৈতিক সহায়তাকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে এটি দেশের
সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
জনগণ-কেন্দ্রিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির যে ধারণা একটি আধুনিক কল্যাণ-রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করে, জাকাত সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। অবশ্যই জাকাত ব্যবস্থাপনায় মানুষের আস্থা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা, অনলাইন রিপোর্টিং, নাগরিক পর্যবেক্ষণ এবং সংসদীয় তদারকি নিশ্চিত করা গেলে জাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
তখন মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাষ্ট্রীয় তহবিলে জাকাত দিতে আগ্রহী হবেন। জাকাত কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; এটি সামাজিক সংহতিরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সমাজের ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, জাকাত সেই ব্যবধান কমাতে সাহায্য করে। একটি কার্যকর জাকাত ব্যবস্থা সমাজে সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে।
এতে শুধু দারিদ্র্য কমবে না, বরং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ আরও শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাকাতভিত্তিক একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা চালু করা গেলে তা দেশের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিকে নতুন শক্তি দিতে পারে।
রাষ্ট্রের নীতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ এই চারটি উপাদান একত্রে কাজ করলে জাকাত বাংলাদেশের কল্যাণ-রাষ্ট্র গঠনের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং কার্যকর নীতির মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া গেলে জাকাত কেবল একটি ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা হয়ে উঠবে দারিদ্র্যমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক বাংলাদেশ গঠনের এক শক্তিশালী সামাজিক শক্তি।
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান
পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়