× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিল্পী-সাহিত্যিকদের দলীয় রাজনীতি

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০৩ পিএম

 শিল্পী-সাহিত্যিকদের দলীয় রাজনীতি

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি প্রবণতা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছেÑ সংগীতশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনের বহু পরিচিত মুখ সরাসরি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করছেন।

এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে অস্বাভাবিক নয়; কারণ যেকোনো নাগরিকের মতো শিল্পীরও রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়Ñ তাদের এই সম্পৃক্ততা কি সত্যিই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে, নাকি তা তাদের ব্যক্তিগত ইমেজ এবং জনমানসে তাদের অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?

শিল্পী মানে শুধু একজন পেশাজীবী নন; তারা সমাজের আবেগ, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের ধারক ও বাহক। একজন গায়ক যখন গান করেন বা একজন অভিনেতা যখন অভিনয় করেন, তখন তিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।

এই অবস্থানটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং শক্তিশালীÑ এটি দলমতনির্বিশেষে মানুষের ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু যখন সেই শিল্পী সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তার এই সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ভেঙে পড়ে।


রাজনীতির স্বভাবই হচ্ছে বিভাজন সৃষ্টি করা। একটি দল মানে একটি মতাদর্শ এবং সেই মতাদর্শের বিরোধিতাও থাকে। ফলে একজন শিল্পী যখন একটি নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ করেন, তখন তিনি অজান্তেই একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য থাকলেও অন্য অংশের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন। এতে তার শিল্পীসত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ তার গান বা অভিনয়কে আর নিরপেক্ষভাবে গ্রহণ করতে পারে না; বরং তার রাজনৈতিক অবস্থান সেই শিল্পকে ছাপিয়ে যায়।


এই প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯৯১ সালে কলকাতায় ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার একটি সেমিনারে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেখানে ভারতের স্বনামধন্য রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বলিউডের জনপ্রিয় তারকা অমিতাভ বচ্চন।

তিনি তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আসামে কংগ্রেসের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে গেলে তার ভক্তরা বিক্ষোভ করে তাকে ফিরে যেতে বলেন। তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিলÑ ‘আমরা তোমার ফ্যান, কিন্তু কংগ্রেসের সমর্থক নই, তুমি ফিরে যাও।’ এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি শিল্পী এবং রাজনীতির মধ্যকার জটিল সম্পর্কের একটি শক্তিশালী উদাহরণ।


এই ঘটনাটি আমাদের একটি মৌলিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়Ñ মানুষ শিল্পীকে ভালোবাসে তার শিল্পের জন্য, তার রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য নয়। একজন শিল্পী যখন রাজনৈতিক পরিচয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েন, তখন তিনি তার সেই নিরপেক্ষ অবস্থান হারান, যা তাকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। ফলস্বরূপ, তার ভক্তদের একটি অংশ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। আমাদের সমাজ এখনও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত মেরুকৃত। এখানে একটি দলের সমর্থক হওয়া মানেই প্রায়শই অন্য দলের বিরোধিতা করা। এই বাস্তবতায় একজন শিল্পী যখন কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তিনি নিজেকে একটি সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। তার শিল্প তখন আর সবার জন্য থাকে না; বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।


এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনীতি একটি কঠিন এবং জটিল ক্ষেত্র। এটি শুধু জনপ্রিয়তা বা পরিচিতির ওপর নির্ভর করে না; বরং এখানে প্রয়োজন গভীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং কৌশল। অনেক সময় দেখা যায়, শিল্পীরা তাদের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা হিমশিম খেয়ে যান। এতে শুধু তাদের ব্যক্তিগত ইমেজ নয়, বরং জনগণের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


তাহলে কি শিল্পীদের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর একেবারে সরল নয়। একজন নাগরিক হিসেবে তাদের রাজনীতি করার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। তবে প্রশ্ন হলোÑ তারা কীভাবে সেই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবেন। সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া এবং সক্রিয় ক্ষমতার অংশ হওয়ার পরিবর্তে তারা চাইলে নীতিগত বা সামাজিক ইস্যুতে অবস্থান নিতে পারেন, যা তাদের শিল্পীসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


বিশ্বের অনেক দেশেই দেখা যায়, শিল্পীরা সামাজিক আন্দোলন, মানবাধিকার, পরিবেশ রক্ষা বা শিক্ষার মতো বিষয়গুলোতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, কিন্তু তারা সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে জড়ান না। এতে তারা তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেন এবং একই সঙ্গে সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখতে পারেন।

বাংলাদেশেও এই ধরনের একটি ভারসাম্য প্রয়োজন।


আমাদের শিল্পীরা যদি তাদের জনপ্রিয়তা এবং প্রভাবকে সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করেন, তাহলে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি সেই প্রভাব কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্য এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

সবশেষে বলা যায়, শিল্পী এবং রাজনীতির সম্পর্ক একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের বিষয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়, কিন্তু তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পীদের উচিত তাদের সেই অবস্থানটি ধরে রাখা, যা তাদেরকে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছে। কারণ, একজন সত্যিকারের শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনপ্রিয়তা নয়, বরং তার প্রতি মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসা।


হাবিব বাবুল

জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা