সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:১৯ পিএম
দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্পকে রপ্তানি খাতে পরিণত করার সম্ভাবনা ব্যক্ত করা হয়েছে সাম্প্রতিক একটি মতবিনিময় সভায়। গত পরশু রাজধানীর একটি হোটেলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেছেন, সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পোল্ট্রিকে রপ্তানি খাতে পরিণত করা সম্ভব।
সভাটির আয়োজক ছিল বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি সেন্ট্রাল কাউন্সিল। সভায় পোল্ট্রি শিল্পের উদ্যোক্তারা জানান, বর্তমানে পোল্ট্রির বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মাত্র দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পোল্ট্রি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারবে।
পোল্ট্রি খাদ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। পোল্ট্রি শিল্প একদিকে জনসাধারণের দৈনন্দিন আমিষের চাহিদা পূরণে অবদান রাখছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে বেকারত্ব মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে, যা জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। যদিও তা একেবারেই সীমিত।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ লাখ মানুষের। তবে উল্লিখিত মতবিনিময় সভায় উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে পোল্ট্রি খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা প্রতিটি মুরগির ডিমে লোকসান দিচ্ছে। এ শিল্পের উন্নয়নের জন্য সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ পোল্ট্রি শিল্পের অনুকূলÑ এ তথ্য এ খাতের বিশেষজ্ঞদের। জনগণের ক্রমবর্ধমান দৈনন্দিন আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বহু আগে থেকেই উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি পালনের কার্যক্রম শুরু হয়। পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, সীতাকুণ্ড, বরিশাল, যশোর, খুলনা, রাজশাহী এবং বগুড়ার জামালগঞ্জে (বর্তমানে জয়পুরহাট জেলায়) সরকারি ব্যবস্থাপনায় হাঁস-মুরগির খামার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় তদারকি ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সেসব প্রকল্পের কোনোটি মুখ থুবড়ে পড়েছে, কোনোটি মৃত্যুবরণ করেছে।
স্বাধীনতার পর সত্তর দশকের মধ্যভাগে এসে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন আন্দোলনের অংশ হিসেবে মানুষের পুষ্টি-চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে কৃষিভিত্তিক এ খাতটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা দেশে প্রায় অর্ধশত সরকারি হাঁস-মুরগির খামার রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ৮টি বাচ্চা উৎপাদন করে। এ ছাড়া বেসরকারি নিবন্ধিত খামার রয়েছে ৬৪ হাজার ৭৫৯টি এবং অনিবন্ধিত খামার রয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজারের ওপরে। এসব খামার থেকে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ৩০ লাখ ডিম এবং এক হাজার ৫৩০ টন মাংস উৎপন্ন হয়, যা দেশের মোট মাংস উৎপাদনের ৩৭ শতাংশ। এই সময়ের মধ্যে এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশের কৃষি-নির্ভর অর্থনীতিতে পোল্ট্রি শিল্পের ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও এ খাতটি এখনও পর্যন্ত আশানুরূপ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। একক খাত হিসেবে পোল্ট্রি শিল্প দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত। কিন্তু সরকারি নীতিগত অস্পষ্টতা, সমন্বয়হীনতার কারণে খাতটি এখনও অবহেলিত। বাচ্চা, ফিড ও রোগ প্রতিরোধক প্রতিষেধকের উচ্চমূল্যের কারণে প্রান্তিক খামারিরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকে।
উৎপাদন খরচ প্রতিনিয়ত বাড়লেও উৎপাদিত ডিম ও মাংসের ন্যায্য বিক্রয়মূল্য
নিশ্চিত না হওয়া তাদের লোকসানের মুখোমুখি করে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, পোল্ট্রি খাতের
এ সমস্যা নিরসনের জন্য দেশে একটি সমন্বিত পোল্ট্রি নীতিমালা প্রণয়ন অতীব জরুরি। যে
নীতিমালায় উৎপাদন, বিপণন, বাজার মনিটরিং অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক খামারিদের
সুবিধার্থে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণ এবং দুর্যোগকালীন সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে
হবে।
উক্ত মতবিনিময় সভায় পোল্ট্রিকে রপ্তানি খাতে পরিণত করার যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, তা অমূলক বা উচ্চাভিলাষী নয় বলে আমরা মনে করি। বরং সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা বাস্তবায়িত হতে পারে সহজেই। তবে সেজন্য সরকারি সুসমন্বিত নীতিমালা অত্যাবশ্যক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সত্তর দশকের মধ্যভাগে যে পোশাক শিল্প ছিল শিশুবৃক্ষ, আজ ব্যক্তি উদ্যোগ ও সরকরি পৃষ্ঠপোষকতায় তা মহিরুহে পরিণত হয়েছে। তেমনি পোল্ট্রি শিল্পকে যদি বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে হয়, তাহলে দরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে ডিম কিংবা মাংসের আন্তর্জাতিক মান (কোয়ালিটি) রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পণ্যের গুণগত মান বজায় না রাখতে পারলে তা বিশ্ববাজারে গ্রহণীয় হয় না। তাই সেদিকে অবশ্যই
গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে পোল্ট্রিকে রপ্তানি খাতে পরিণত করতে হলে ব্যাংকঋণ, শুল্ক
ছাড়, রপ্তানি সহজীকরণ ইত্যাদি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে সরকারকে।
অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে হাঁস-মুরগির মাংস-ডিম বিদেশে রপ্তানি করা গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরেকটি পথ উন্মুক্ত হবে, যা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সহায়ক হতে পারে। মনে রাখা দরকার, কৃষিভিত্তিক এই খাতকে সবল করে তুলতে পারলে তা জাতীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হবে।