ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:১২ পিএম
অর্থনৈতিক বোদ্ধাদের মতে বর্তমান সরকারকে অনাকাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হবে। বিগত সরকার দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই জটিল অবস্থায় রেখে গেছে যে, তা থেকে সহজেই উত্তরণ ঘটানো অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশের আর্থিক খাত বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা এই খাতকে বেশ নাজুক করে তুলেছে।
২০২৫ সালে ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা ও দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে, যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাবসহ সংস্কারের প্রচেষ্টা চলছে। বর্তমানে ১৮টির বেশি ব্যাংকের অবস্থা নাজুক এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যাংক খাতে জরাজীর্ণ পরিস্থিতি এবং ‘ওপেন সিক্রেট’ দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসছে।
নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ বাজার নিয়ন্ত্রণসহ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা। এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৫% প্রবৃদ্ধির পর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.০% হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ১১৩.৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি, যা আগের বছরের জুন মাসের তুলনায় বেশি এবং দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। এই ঋণের প্রায় ৮২ শতাংশ (৯৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার) সরকারি খাতের এবং ১৮ শতাংশ (২০.০৫ বিলিয়ন ডলার) বেসরকারি খাতের।
মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫৫ ডলারে, যা কোভিডের পর সর্বোচ্চ।
অপরদিকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে
১০ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১২.২% বেশি। এর মধ্যে ব্যাংক
খাত থেকে নেওয়া হয়েছে ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা এবং ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস (সঞ্চয়পত্র,
ট্রেজারি বন্ড) থেকে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণই
সবচেয়ে বেশি।
বিগত আওয়ামী সরকার মেগা প্রজেক্ট আর বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কারণে সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ কমাতে নতুন ঋণ নেওয়ার প্রবণতা থাকলেও আগের ঋণের সুদ-আসল পরিশোধের চাপ বেড়েছে।
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বর্তমানে মূলত ব্যাংকনির্ভর, যা চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি এবং উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে এই ঋণ নিচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে মোট দেশি-বিদেশি ঋণের ৫৬% ই অভ্যন্তরীণ, যা ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া।
এই
উচ্চ ঋণনির্ভরতা বেসরকারি খাতে ঋণের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের বর্তমান
চিত্রটা হলো (২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রেক্ষিতে) চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের
ব্যাংকঋণ ৫৩ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার ফলে ট্রেজারি
বিল ও বন্ডের সুদের হার বাড়ছে, যা সরকারের সুদ ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে।
এদিকে রাজস্ব খাতে বড় ধরনের ঘাটতি চলছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭১,৪৭২ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে। আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর কোনো খাতেই কাঙ্ক্ষিত আদায় না হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে, যার ফলে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটানোর পরিকল্পনা করছে।
মোট ঘাটতি : জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে (প্রায় ৩৩,৩৭৩ কোটি টাকা)। আমদানি শুল্ক খাতে ১৭,১৬৬ কোটি টাকা এবং ভ্যাট খাতে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। কারণ আমদানি হ্রাস, মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকি এবং অর্থনৈতিক টানাপড়েন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আসন্ন বসন্তকালীন বৈঠকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো এবং মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধির আগাম সতর্কতা জানাতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এমন ইঙ্গিত মিলছে। খবর রয়টার্সের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা আজ থেকে ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে বসছেন।
কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাতকে বৈশ্বিক অর্থনীতির তৃতীয় বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার কারণে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানোর আশা করা হয়েছিল। তবে সংঘাত শুরুর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে, যা আগে ৪ শতাংশ ধরা হয়।
বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে ৬ শতাংশের বেশি। সুতরাং নিঃসন্দেহে অতীতের দিনগুলোতে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এ প্রবৃদ্ধির গুণগত দিকের যদি তাকাই, তাহলে দেখতে পাব যে, এ প্রবৃদ্ধি সমাজে অসমতা বাড়িয়েছে, এ প্রবৃদ্ধি কর্মনিয়োজন শূন্য ছিল, এ প্রবৃদ্ধিতে সাধারণ জনগণের চাওয়া-পাওয়া প্রতিফলিত হয়নি, এ প্রবৃদ্ধির নানান আঙ্গিক অংশগ্রহণমূলক ছিল না, এ প্রবৃদ্ধি পরিবেশবান্ধব ছিল না। সুতরাং অর্জিত অগ্রগতি সত্যিকার উন্নয়নে রূপান্তরিত হতে পারেনি।
এ অগ্রগতির সুফল দেশের বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী ভোগ করেছে, কিন্তু তা দেশের আপামর জনগণ সমভাবে ভোগ করতে পারেনি। সুতরাং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য যে প্রবৃদ্ধি কৌশল গ্রহণ করা হবে, তা যেন শুধু পরিমাণগত অগ্রগতির ওপর সীমিত না থাকে, সেটা যেন গুণগত পরিবর্তনের দিকে জোর দেয়, যাতে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নও নিশ্চিত হয়।
দ্বিতীয়ত, ‘শুদ্ধ অর্থনীতি’ ও ‘রাজনৈতিক অর্থনীতির’ মধ্যে একটি ভেদরেখা টানা দরকার। উন্নয়ন ব্যাপারটি শুদ্ধ অর্থনীতির ব্যাপার নয়, নয় শুষ্ক প্রায়োগিক ব্যাপারও। উন্নয়ন বিষয়টির একটি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও আছে। চূড়ান্ত বিচারে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ আছে।
উন্নয়নের গুণগত দিকগুলো নিশ্চিত করা হবে কি না, উন্নয়নের কোন কোন গুণগত দিকের ওপর জোর দেওয়া হবে, কোনদিকে নীতিমালার প্রবণতা থাকবে, তা একটি দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রকৃতি এবং গতিময়তা দিয়ে নির্ণীত হয়। যেমনÑ বাংলাদেশের নানান অসমতা দূর করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গেলে দেশের ধনিক ও ক্ষমতাবান গোষ্ঠীগুলোর মনোভাব, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, তাদের কর্মকাণ্ড, তাদের স্বার্থ, রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রভাবিত করার ব্যাপারে তাদের ক্ষমতা এসবই প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়।
সংকটের বলয়ে ‘আপাত সমস্যা’ বনাম ‘মৌলিক সমস্যার’ মধ্যে পার্থক্য করা প্রয়োজন। আমরা অনেক সময়ে আপাত সমস্যাগুলোকে প্রধান সমস্যা বলে মনে করি, ওইসব সমস্যাকেই অগ্রাধিকার দিই এবং এ প্রক্রিয়ায় মৌলিক সমস্যাগুলোর দিকে নজর দিতে ভুলে যাই। এটা অনেকটা উপসর্গ আর কারণের মধ্যকার ফারাকের মতো।
মানুষের যখন জ্বর হয়, সেটা একটা উপসর্গ, মূল কারণ নয়, মূল কারণ হয়তো কোনো প্রদাহের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। সুতরাং জ্বরকে মূল কারণ ভেবে চিকিৎসা করলে মূল অসুস্থতা সারবে না। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বৈদেশিক মুদ্রার হ্রাস, কিংবা রপ্তানি-আমদানির ঘাটতি আপাত সমস্যা, যার মৌলিক সমস্যা স্থিত অন্যত্র। কিন্তু বিগত শাসনামালে অর্থনীতিতে কতগুলো মৌলিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, তখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, নিয়মকানুন এবং বিধিনিষেধ ভঙ্গ করা হয়েছে, দৃশ্যমানতা ও জবাবদিহিতার কাঠামো বিনষ্ট করা হয়েছে, সব রকমের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো বস্তুনিষ্ঠ নির্ণায়কের পরিবর্তে এক ধরনের হঠকারী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আইনের শাসন নষ্ট করে দিয়ে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ বা গোষ্ঠীকে অন্যায্যভাবে বা পক্ষপাতমূলক সুবিধা দিয়ে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণির সৃষ্টি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আজকের সংকটের মূল এসব কারণের মধ্যেই নিহিত। সুতরাং বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে এসব মৌলিক সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া খুবই জরুরি। অর্থনৈতিক সংকট পরিপ্রেক্ষিতে শুধু সমস্যার আলোচনাই যথেষ্ট নয়, সে সংকট উত্তরণের জন্য সম্ভাবনাগুলোও আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের সম্ভাবনার দুটো মৌলিক মাত্রিকতার দিকে তাকানো যেতে পারে। এক, জাতি হিসেবে আমাদের দীর্ঘ পথযাত্রায় আমরা বিভিন্ন সময়ে নানান সংকটের মধ্যে পড়েছি। কিন্তু আমাদের দৃঢ়চেতনা, অঙ্গীকারের মাধ্যমে আমরা সব প্রতিকূলতা জয় করেছি।
দুই, উদ্ভাবনী শক্তি, সৃজনশীলতা এবং কর্মকুশলতার দ্বারা নয়া পথ উদ্ভাবন। বহু ক্ষেত্রে জাতির এ অর্জনের সঙ্গে রাষ্ট্রের নীতিমালা বা গৃহীত ব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক ছিল না।
এ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র স্বল্পশিক্ষিত মানুষ ভাগ্য বদলানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দিয়েছিল। আজ তাদের প্রেরিত অর্থ বাংলাদেশের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। সেসব সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে সংকট-উত্তরণের জন্য গৃহীত ব্যবস্থাদির কতগুলো সার্বিক বিধি মেনে চলা উচিত। যেমন এক, গৃহীত সব ব্যবস্থারই মানবাধিকার এবং সাম্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। দুই, সব নীতিমালাতেই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। তিন, এমন সব কৌশল গ্রহণ করা উচিত যেগুলোর বহুমাত্রিক প্রভাব বিশেষত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি করে পড়ে। চার, গৃহীত নীতিমালাগুলোকে সমন্বিত হতে হবে। অন্যথায় সমস্যা নিয়ে আলোচনাই সার হবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না।
ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম
সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন