ড. মো. শহিদুল ইসলাম
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৯ পিএম
বাংলাদেশের কৃষি খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ জীবিকা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, নিবিড় ও একফসলি চাষাবাদ, মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতার ধারাবাহিক অবনতি এবং সারের অসম ও অদক্ষ ব্যবহার কৃষি উৎপাদনশীলতাকে ক্রমেই সীমাবদ্ধ ও ব্যাহত করছে। এর ফলে ফসলের ফলন স্থিতিশীল রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বৃদ্ধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশÑ বিশেষত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মধুপুর গড়, বরেন্দ্র ভূমি, পাহাড়ি এলাকা এবং উপকূলীয় কিছু অঞ্চলে অম্ল মাটির (Acid Sulphate Soil) বিস্তৃতি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। এসব মাটির pH সাধারণত ৫.৫-এর নিচে অবস্থান করে, যা মাটির রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটায়। এই অম্লতা পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতা, সারের রাসায়নিক বিক্রিয়া, পুষ্টি উপাদানের স্থিতিশীলতা এবং উদ্ভিদের কার্যকর পুষ্টি গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সরাসরি ও বহুমাত্রিকভাবে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশে প্রধানত
ইউরিয়া, টিএসপি/ডিএপি এবং এমওপি সার ব্যবহৃত হয়। ইউরিয়া (CO(NH₂)₂) মাটিতে প্রয়োগের
পর দ্রুত হাইড্রোলাইসিস হয়ে অ্যামোনিয়া (NH₃) উৎপন্ন করে, যা সাময়িকভাবে মাটির pH বৃদ্ধি
করে। পরবর্তীতে নাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় NH₄⁺ থেকে NO₃⁻-এ রূপান্তরের সময় H⁺ আয়ন উৎপন্ন
হয়ে মাটির অম্লতা বাড়ায়। টিএসপি মাটিতে H₂PO₄⁻ সরবরাহ করে, কিন্তু অম্ল মাটিতে এটি
লৌহ (Fe³⁺) ও অ্যালুমিনিয়াম (Al³⁺)-এর সাথে বিক্রিয়া করে অদ্রবণীয় যৌগে পরিণত হয়, ফলে
ফসফরাস স্থিরীকরণ (fixation) বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ডিএপি প্রয়োগের পর প্রাথমিকভাবে
ক্ষুদ্র পরিসরে pH বৃদ্ধি করে, যা কিছু ক্ষেত্রে ফসফরাসের প্রাপ্যতা বাড়াতে সহায়ক হতে
পারে। এমওপি (KCl) সহজেই দ্রবীভূত হয়ে K⁺ সরবরাহ করে, তবে হালকা মাটিতে এটি লিচিংয়ের
মাধ্যমে ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।
মাটির pH পুষ্টি
প্রাপ্যতার একটি ‘নিয়ামক ভেরিয়েবল’ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণভাবে
pH ৬.০–৭.০-এর মধ্যে থাকলে অধিকাংশ অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান সর্বোচ্চ প্রাপ্যতা ও ভারসাম্যপূর্ণ
অবস্থায় থাকে, যা উদ্ভিদের জন্য আদর্শ। কিন্তু pH ৫.৫-এর নিচে নেমে গেলে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম
ও ম্যাগনেসিয়ামের প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়; অপরদিকে লৌহ, ম্যাঙ্গানিজ ও
অ্যালুমিনিয়ামের দ্রবণীয়তা বেড়ে গিয়ে উদ্ভিদের জন্য বিষাক্ততার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এর
ফলে একই পরিমাণ সার প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফলন ও উৎপাদন দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব হয়
না, বরং সারের ব্যবহার দক্ষতা কমে যায়।
অম্ল মাটির কার্যকর,
টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় লাইমিং একটি বহুল পরীক্ষিত, বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত
এবং অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ক্যালসিয়াম কার্বোনেট
(CaCO₃) অথবা ডলোমাইট প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির অম্লতা ধীরে ধীরে নিরপেক্ষ অবস্থার দিকে
নিয়ে আসা সম্ভব, যা নিম্নোক্ত বিক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়:
CaCO₃ + 2H⁺ → Ca²⁺ + CO₂ + H₂O
এই প্রক্রিয়ার
ফলে মাটির pH উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, অ্যালুমিনিয়ামজনিত বিষাক্ততা কার্যকরভাবে
হ্রাস পায় এবং ফসফরাসসহ অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতা দৃশ্যমানভাবে
বৃদ্ধি পায়। একই সাথে মাটিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হয়, যা উদ্ভিদের
সুস্থ বৃদ্ধি, শক্তিশালী শিকড়ের বিকাশ এবং সামগ্রিকভাবে অধিক ফলন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ
অবদান রাখে। পাশাপাশি লাইমিং মাটির অনুজীবীয় কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে এবং পুষ্টিচক্রকে
সক্রিয় করে তোলে, যা ফসলের পুষ্টি গ্রহণ দক্ষতা উন্নত করতে সহায়ক। এ ছাড়াও লাইমিং মাটির
ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাগুণ উন্নত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ ও
স্থিতিশীল উৎপাদন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উদ্ভিদ পুষ্টি
গ্রহণ নির্দিষ্ট আয়নিক রূপে সম্পন্ন হয় এবং এই রূপগুলোই উদ্ভিদের জন্য সরাসরি গ্রহণযোগ্য।
নাইট্রোজেন প্রধানত NH₄⁺ ও NO₃⁻ আকারে, ফসফরাস H₂PO₄⁻ আকারে এবং পটাশিয়াম K⁺ আকারে
শোষিত হয়। এ ছাড়া ক্যালসিয়াম (Ca²⁺), ম্যাগনেসিয়াম (Mg²⁺), সালফার (SO₄²⁻) এর মতো মাধ্যমিক
পুষ্টি এবং জিংক (Zn²⁺), বোরন (H₃BO₃) প্রভৃতি অনুপুষ্টি উপাদানও উদ্ভিদের জন্য অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে মাটির pH, আর্দ্রতা, শিকড়ের বিস্তার, বিনিময় প্রক্রিয়া
(cation exchange) ক্ষমতা এবং অনুজীবের সক্রিয় কার্যকলাপ এসব পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতা
ও গ্রহণক্ষমতাকে সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যা শেষ পর্যন্ত ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতাকে
প্রভাবিত করে।
অম্ল মাটিতে পুষ্টি
ক্ষয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং কৃষি উৎপাদনশীলতার ওপর এর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে
প্রতিফলিত হয়। নাইট্রোজেন লিচিং, অ্যামোনিয়া বাষ্পীভবন এবং ডিনাইট্রিফিকেশনের মাধ্যমে
ব্যাপকভাবে এর ক্ষতি সাধিত হয়, ফলে প্রয়োগকৃত নাইট্রোজেনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উদ্ভিদের
জন্য অপ্রাপ্য হয়ে পড়ে। ফসফরাসের ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষয় তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর অধিকাংশই
Fe ও Al-এর সাথে দৃঢ়ভাবে স্থিরীকৃত হয়ে অপ্রাপ্য রূপে রূপান্তরিত হয়। অন্যদিকে পটাশিয়াম
বিশেষ করে হালকা ও বেলে মাটিতে লিচিংয়ের মাধ্যমে সহজেই হারিয়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে
মাটির মোট মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, যা ভবিষ্যৎ ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব
ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে
সারের ব্যবহার দক্ষতা (Fertilizer Use Efficiency) বাড়ানোর জন্য সমন্বিত কৌশল গ্রহণ
জরুরি। প্রথমত, মাটি পরীক্ষাভিত্তিক সুষম সার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে N, P,
K-এর পাশাপাশি S, Zn ও B-এর ঘাটতিও পূরণ হয়। দ্বিতীয়ত, ইউরিয়া ২-৩ কিস্তিতে প্রয়োগ
এবং গভীরে স্থাপন (UDP/গুটি ইউরিয়া) করলে নাইট্রোজেনের ক্ষতি ২০-৩০% পর্যন্ত কমানো
সম্ভব। তৃতীয়ত, অম্ল মাটিতে নিয়মিত লাইম প্রয়োগ করে pH ৬.০Ñ৬.৫-এর মধ্যে রাখা উচিত।
চতুর্থত, জৈব সার (গোবর, কম্পোস্ট, মুরগির সার, সবুজ সার) ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির
জৈব পদার্থ বৃদ্ধি, ক্যাটায়ন বিনিময় (Cation exchange) ক্ষমতা উন্নয়ন এবং পুষ্টি ধারণক্ষমতা
বাড়ানো সম্ভব।
নির্দিষ্ট সারের
উপযোগিতার ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ইউরিয়া বাংলাদেশের প্রধান নাইট্রোজেন
উৎস হলেও এর সঠিক প্রয়োগ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিএসপির পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে
ডিএপি অম্ল মাটিতে তুলনামূলক বেশি কার্যকর হতে পারে, কারণ এটি প্রাথমিকভাবে ক্ষুদ্র
পরিসরে pH বৃদ্ধি করে ফসফরাসের প্রাপ্যতা উন্নত করে। এমওপি অধিকাংশ ফসলের জন্য উপযোগী,
তবে হালকা মাটিতে বিভক্ত প্রয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি জিপসাম (Ca ও S), ম্যাগনেসিয়াম সালফেট,
জিংক সালফেট এবং বোরন ব্যবহারের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও অনুপুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে হবে।
নীতিনির্ধারণ
পর্যায়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। মাটি পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ,
এসআরডিআইর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল মাটি উর্বরতা মানচিত্র উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
অম্ল অঞ্চলে লাইমের সহজলভ্যতা ও ভর্তুকি নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
(INM) ও সাইট-নির্দিষ্ট পুষ্টি ব্যবস্থাপনা (SSNM) প্রযুক্তির সম্প্রসারণে কৃষি সম্প্রসারণ
অধিদপ্তরের ভূমিকা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি জৈব সার ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ব্যবহারে
সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা
প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে বাংলাদেশের অম্ল মাটিতে সারের দক্ষ, ফলপ্রসূ ও অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে মাটির রসায়ন, পুষ্টি উপাদানের আচরণ এবং উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা কৌশল সম্পর্কে সুস্পষ্ট, বাস্তবভিত্তিক ও ক্ষেত্র-উপযোগী ধারণা থাকা অপরিহার্য। লাইমিং, সুষম সার প্রয়োগ, আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে সারের ব্যবহার দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা, পুষ্টি অপচয় ও পরিবেশগত ক্ষতি হ্রাস করা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও স্থিতিশীল কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব। পাশাপাশি মাটি পরীক্ষাভিত্তিক সুপারিশ, জৈব পদার্থের সংযোজন এবং ফসলভিত্তিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনার সমন্বয় এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ড. মো. শহিদুল ইসলাম
মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)