মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৭ পিএম
মহিউদ্দিন খান মোহন; সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ইংরেজিতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদÑ ‘এ এর ইজ হিউম্যান’। এর বাংলা তরজমা হলো ‘মানুষ মাত্রই ভুল করে’ বা ‘ভুল করা মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক’। এই বাক্যটি ইংরেজ কবি আলেকজান্ডার পোপের একটি কবিতার অংশ। পূর্ণাঙ্গ পঙ্ক্তিটি হলো ‘টু এর ইজ হিউম্যান, টু ফরগিভ ডিভাইন’। পোপের কবিতার ওই পঙ্ক্তিটির অর্থ, মানুষ ভুল করবে, ঈশ্বর ক্ষমা করবেন। তাই কথা বা বলতে কাজ করতে গিয়ে একজন মানুষের ভুল হলে তা নিয়ে হৈচৈ বাধিয়ে দেওয়া বা ঘোট পাকানো অনুচিত; যদি তা রাষ্ট্র বা সমাজের মারাত্মক কোনো ক্ষতিসাধন না করে। তবে সে ভুল নিয়ে সমাজে রসাত্মক আলোচনা হতে পারে, ভুল করা ব্যক্তি নানা রকম কটাক্ষের শিকার হতে পারেন। তখন সে ব্যক্তির সামনে দুটি পথ থাকেÑ এক. অকপটে নিজের ভুল স্বীকার করা, দুই. চোখ-কান বন্ধ করে সমালোচনা, কটাক্ষ, কটূক্তি হজম করা।
সাধারণ মানুষের মতো রাজনীতিকরাও ভুল করতে পারেন। একজন রাজনীতিক একই সঙ্গে মানুষও। তাই কবি আলেকজান্ডার পোপের কবিতাংশের সূত্র অনুযায়ী তারও ভুল করার স্বাভাবিক। তবে সে ভুল যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষতির কারণ না হয়, তবে তা নিয়ে হৈচৈ না করাই বরং ভালো। কখনও তা ‘স্লিপ অব টাং’ কখনও তা অবচেতন মনে বলে ফেলা ভুল তথ্য বা বাক্য হিসেবে মেনে নেওয়াই উত্তম। তবে এমন যদি হয় যে, রাজনীতিকের উক্তি, বক্তব্য বা মন্তব্য দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডত্ব কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, তখন তাকে অবশ্যই জাবাবদিহি করতে হবে। আর তা করতে হবে জনগণ তথা জাতির কাছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ভুল বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ হৈচৈ হচ্ছে। তীব্র সমালোচনা, কটাক্ষ ও কটূক্তির শিকার হচ্ছেন তিনি। ঘটনাটি এখন এতটাই প্রচারিত যে, তার বিস্তারিত এখানে উল্লেখ বাহুল্য মনে হওয়া স্বাভাবিক। তারপরও নিবন্ধের প্রাসঙ্গিকতার স্বার্থে তার কিয়ৎ উল্লেখ করা প্রয়োজন। গত ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) বাংলা নববর্ষের দিন টাঙ্গাইলের একটি জনসভায় তিনি বলেছেন, ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মওলানা ভাসানী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে ধানের শীষ মার্কাটি তুলে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ গতিতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। কেননা, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ইন্দেকালি করেছেন ১৯৭৬ সালে। ফলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধবাদীরা তো বটেই, তার শুভ্যার্থীরাও প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে তিনি এমন একটি ভুল তথ্য তার বক্তৃতায় উল্লেখ করলেন? পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেছেন যে, ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানী যখন অসুস্থ হয়ে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন জিয়াউর রহমান তাকে দেখতে যান। সেখানে মওলানা ভাসানী জিয়াকে নতুন দল গঠন ও সে দলের প্রতীক হিসেবে ধানের শীষ ব্যবহারের অনুমতি দেন। কেউ আবার ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করেছেন টাঙ্গাইলের সন্তোষে মজলুম জননেতার বাড়িকে। বাস্তবিক এর কোনোটাই সঠিক নয়।
মওলানা ভাসানী তথা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ কীভাবে বিএনপির হলো এ কথা এই প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। আমি স্বয়ং অনেক ছাত্রদল-যুবদল কর্মীকে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, তারা এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। কথা প্রসঙ্গে একদিন এক রাজনৈতিক আড্ডায় যখন বললাম, ১৯৭৩ সালে টিভি ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী পাবনার একটি আসন থেকে ধানের শীষ মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তখন এক যুবনেতা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, তখন ধানের শীষ কোথা থেকে আসবে? ধানের শীষ তো আনলেন জিয়াউর রহমান! সে যুবনেতার ভুল ভাঙাতে আমাকে ন্যাপের মার্কা ধানের শীষ বিএনপির মার্কায় পরিণত হওয়ার ইতিহাস বর্ণনা করে শোনাতে হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে সাবেক ন্যাপ নেতা মজলুম জননেতার ঘনিষ্ঠ সহচর মরহুম শামসুল হক (মানিকগঞ্জ) এক অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছিলেন, ১৯৭৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ‘হুজুর ভাসানী’ অসুস্থ হয়ে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় জেনারেল জিয়াউর রহমান তাকে দেখতে যান। কথা প্রসঙ্গে তিনি মওলানা ভাসানীকে বলেন, ‘হুজুর, আমরা আগামী বছর দেশে নির্বাচন দিতে চাই।’ মওলানা ভাসানী তখন তাকে বলেন, ‘এই ভুলটা করো না। এ সময়ে নির্বাচন দিলে ক্ষমতায় আসবে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন দেবে দুই বছর পরে। এর মধ্যে তুমি একটি নতুন দল গঠন করো। আমি যাদুকে (মশিউর রহমান যাদু মিয়া) বলে দেবো, ওরা তোমার সঙ্গে থাকবে।’ জিয়াউর রহমান তখন বলেন, ‘কিন্তু হুজুর আমরা তো নির্বাচন দেওয়ার কথা ঘোষণা করে দিয়েছি।’ মওলানা ভাসানী তখন বলেন, ‘ওটা আমার ওপর ছেড়ে দাও।’ এরপর মজলুম জননেতাকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাঠানো হয়। মাসাধিককাল চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার দিন বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ এখনই কোনো নির্বাচন চায় না। তারা চায় আগে শান্তি প্রতিষ্ঠা।’ এই বক্তব্যের কারণে সে সময় মওলানা ভাসানী কয়েকটি পত্রিকার তুমুল সমালোচনা শিকার হন। তারা প্রশ্ন তোলে, লন্ডনের হাসপাতালে শুয়ে তিনি কীভাবে দেশের মানুষ কী চায় তা জানলেন? যাহোক, মওলানার এ বক্তব্য জেনারেল জিয়াকে রাজনীতি ও নির্বাচনের পথনির্দেশ দেয়। ওই বছর ১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানী ইন্তেকাল করেন।
১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বঙ্গভবনে দেশের প্রায় সব দলের শীর্ষ নেতাদের একটি বৈঠক ডাকেন। সেখানে তৎকালীন ন্যাপ চেয়ারম্যান মশিউর রহমান যাদু মিয়া দীর্ঘ বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারের করণীয় সম্পর্কে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। সে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ডেমোক্রেটিক লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক (পরে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা) শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি তার বই ‘বলেছি বলছি বলব’তে সেদিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে যাদু মিয়ার বক্তৃতার ভূয়সী প্রশংসা করে তাকে ‘ম্যান অব দ্য ডে’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মূলত ওই সভার পরেই জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যাদু মিয়ার যোগাযোগ শুরু হয়, যা নতুন রাজনৈতিক দলের গোড়াপত্তন বলে ধরে নেওয়া যায়।
তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে আহ্বায়ক করে নিজে নেপথ্যে থেকে জিয়াউর রহমান গঠন করেন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল, যা সংক্ষেপে ‘জাগদল’ নামে পরিচিত। এরপর জনগণের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয় ওই বছর ৩ জুন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে রাজনৈতিক পোলারাইজেশন ঘটে। ন্যাপ, জাগদল, ইউপিপি, মুসলিম লীগ, লেবার পার্টি ও তফসিলি জাতি ফেডারেশন সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ, জাতীয় জনতা পার্টি, ন্যাপ (মোজাফ্ফর), একতা পার্টি ইত্যাদি মিলে গঠিত হয় ‘গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট’। জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী মনোনীত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের প্রার্থী হন জেনারেল এমএজি ওসমানী (অব.)। জিয়াউর রহমানের নির্বাচনী প্রতীক ছিল ধানের শীষ। আর ওসমানীর নৌকা।
উল্লেখ প্রয়োজন, ওই সময় আমি ভাসানী ন্যাপের ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রদলের শ্রীনগর থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। বড় ভাই কেন্দ্রীয় ন্যাপনেতা গিয়াসউদ্দিন খান বাদলের সুবাদে যাদু ভাইয়ের স্নেহভাজন ছিলাম। তার কাছ থেকে জেনেছি কীভাবে ধানের শীষ জিয়াউর রহমানের নির্বাচনী প্রতীক হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমান মনোনীত হওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে মার্কা কী হবে? এ নিয়ে এক বৈঠকে শাহ আজিজুর রহমান প্রস্তাব করেছিলেন হারিকেনকে জিয়াউর রহমানের নির্বাচনী প্রতীক করা হোক। সে বৈঠকে জিয়াউর রহমান যাদু মিয়ার কাছে মতামত চান। যাদু ভাই বলেছিলেন, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, হুজুরের (মওলানা ভাসানী) নির্দেশে আমরা আপনার রাজনৈতিক উদ্যোগে শামিল হয়েছি। আপনি নিজেও হুজুরের দোয়া নিয়েই রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন। তাই আমি মনে করি, হুজুরের প্রিয় মার্কা ‘ধানের শীষ’কে আপনার মার্কা হিসেবে নিতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে জিয়াউর রহমান তাতে সায় দেন। এভাবেই মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ধানের শীষ জিয়াউর রহমানের হাতে আসে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট বিলুপ্ত করে সে বছর ১ সেপ্টেম্বর জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হলে ধানের শীষকে দলের নির্বাচনি প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সংক্ষেপে এই হলো ভাসানীর মার্কা ধানের শীষ জিয়া তথা বিএনপির মার্কায় পরিণত হওয়ার ইতিহাস।
ইতিহাসের আলোকে তাই এটা বলা অসমীচীন নয় যে, সেদিন টাঙ্গাইলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সম্পর্কিত তথ্য উপস্থাপন করতে গিয়ে সময়টা সঠিক বলেননি। কেন তিনি সেদিন ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছেন, সেটা তিনিই বলতে পারবেন। সেটা কি ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক অবগত না থাকার কারণে, নাকি তাকে ভুল তথ্য সরবরাহ করা হয়েছিল সেজন্য? তবে যেহেতু বিষয়টির সঙ্গে ইতিহাসের দুজন প্রখ্যাত নেতার প্রসঙ্গ জড়িত, তাই এ সম্পর্কে অধিকতর সতর্কতা জরুরি ছিল।
এটা ঠিক, প্রধানমন্ত্রীর এ ভুল তথ্য উপস্থাপন দেশের কোনো ক্ষতি করবে না। তবে তার সম্পর্কে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। তাই উচিত ছিল ঘটনার পরপরই তার প্রেস উইং বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভুল স্বীকার করে জনগণকে অবহিত করা। তাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি পেত। কারণ অনিচ্ছাকৃত ভুলের কথা অকপটে স্বীকার করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঔদার্যই প্রকাশ পায়।
মহিউদ্দিন খান মোহন
সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ