জাকির হোসেন
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৫ পিএম
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলে কোনো সংকট নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বজুড়ে সংকট চলছে জ্বালানি তেলের। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলে কোনো সংকট নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বর্তমানে দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি সরকার বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, দেশে এপ্রিল ও মে মাসের জন্য পূর্ণ জ্বালানি মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি জুন মাসের চাহিদা মেটাতে জ্বালানি মজুদ নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অন্য রকম। পেট্রোল পাম্পগুলোতে গত দেড় মাস ধরে যানবহনের দীর্ঘ সারি, কোথাও পেট্রোল পাম্প বন্ধ। প্ল্যাকার্ড ঝুলছে তেল নেই। আবার চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। পেট্রোল পাম্প মালিকরাও বলছে ভিন্ন ভিন্ন কথা। কেউ বলছে চাহিদা অনুসারে তাদের তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। কেউ অভিযোগ করছেন, গ্রাহকরা অতিরিক্ত তেল নিচ্ছে। এতে সংকট তৈরি হচ্ছে। এদিকে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও সরবরাহে অনিয়ম প্রতিরোধে সারা দেশে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলমান এসব অভিযানে সর্বাধিক ৩ লাখ ৬৬ হাজার ১ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৯ হাজার ৭৭৬ লিটার অকটেন এবং ৮৭ হাজার ৯৫৯ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামে পৃথক অভিযানে ৪৮ হাজার ৫০০ লিটার ফার্নেস অয়েল জব্দ করা হয়েছে। অভিযানে মোট ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৩৬ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে গত দেড় মাসে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ চিত্র বলছে দেশে জ্বালানির কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি চক্র। যেটা সংকট মুহূর্তে আমাদের দেশে হয়ে থাকে। এ পরিস্থিতিতে দেশে তেলের ঘাটতি আদৌ আছে কি না তা নিয়ে ধূম্র্রজাল তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোÑ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত, কাতার ও ওমান থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। এছাড়া সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পরিশোধিত ডিজেল আনা হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারিভাবে এসব দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। বর্তমানে রাশিয়া থেকেও তেল আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ছাড় রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে নতুন করে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই ছাড়ের মেয়াদ আগামী ৯ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। দেশে বছরে ৬৫-৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার ৮০ শতাংশ পরিশোধিত। এপ্রিল-মে মাসের চাহিদার ভিত্তিতে এপ্রিলে ১৪টি জাহাজ ও পাইপলাইনে ৩ লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে সরকার। এ ছাড়া মার্চ-জুন মেয়াদে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে ২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে বলে সরকারি সূত্রে জানা যায়। এ থেকে ধারণা করা যায় শিগগিরই বাংলাদেশ জ্বালানি সংকটে পড়বে না।
বাংলাদেশে মূলত বোরো সেচ মৌসুম (জানুয়ারি-এপ্রিল) এবং তীব্র গরমের সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ডিজেল ও ফার্নেস তেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বাড়ে। এ ছাড়া ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময় যাতায়াত বাড়ায় পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদাও বাড়ে। এ কারণে জ্বালানি তেলে চাহিদা বেড়েছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংকট তৈরি না হলেও বিশ্ববাজারের ঘাটতির কারণে সংকটের বিষয়টি মাথায় রাখতেই হচ্ছে। তবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ মাসে অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদা বেড়েছে। গ্রাহকদের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কিনে মজুদ করার প্রবণতা দেখা গেছে, যা চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে দেখানো হয়েছে কয়েটি ফিলিং স্টেশনে যানবহন দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে একটি ফিলিং স্টেশনেই তারা গণনা করেছে ১ হাজার ১১টি যানের। আসলে দেশের পাম্পগুলোর চিত্র এমনই। তাবুও খটকা লাগে সঠিক তথ্য নিয়ে।
তাহলে কী দাঁড়ায়, সংকট কি আদৌ আছে, নাকি আমরা হুজুগে বাঙালি বলে এ পরিস্থিতি। অনেক দিন আগের একটি ঘটনা মনে পড়ে। একবার হঠাৎ সুর ওঠে লবণের সংকট দেখা দিয়েছে। তখন এক কেজি লবণের দাম ছিল ১০ টাকা। কেউ একজন হয়তো বলেছেন লবণের সংকট দেখা দেবে। সঙ্গে সঙ্গে লবণের দাম বাড়তে থাকে। বিকালের মধ্যে ১০ টাকা কেজির লবণ ৭০ টাকায় ঠেকে। আমরাই চেনা এক ছেলে সংকট হবে শুনে লবণ কিনতে শুরু করে। ৩০ টাকা, ৫০ টাকা, ৭০ টাকা করে প্রায় ৭০ কেজি লবণ কিনে মজুদ করে ফেলে। সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ আদালত নামে। থানা পুলিশ তৎপর হয়। দোকানে দোকানে হানা দেয়। ফলে রাতের মধ্যে লবণের দাম ১০ টাকায় নেমে আসে। কিন্তু খারাপ লাগছে ওই ছেলেটির জন্য, যে বাড়তি দামে ৭০ কেজি লবণ কিনে মজুদ করেছিল। কারণ লবণ আমরা চাইলেও বেশি খেতে পারব না। ফলে পুরোটাই লোকসান।
বর্তমানে জ্বালানি সংকটের সময় অনেকে অতিরিক্ত তেল কিনে মজুদ গড়ছেন। তাদের আশা বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম বাড়বে। তারা সেই সুযোগটা নিতে চায়। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে সংকট অব্যাহত থাকলে দাম বাড়তে পারে। তবে আশার কথা হলো বিশ্ববাজারে দাম কমছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে তেলের বাজারে দামের গতি নিচের দিকে। যদি যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকে তবে আশা করা যায় আমরা জ্বালানি সংকটে পড়ব না। তখন দাম না বাড়ারই কথা। আর যদি না বাড়ে তবে যে আশায় যারা এখন তেল মজুদ গড়ছেন তাদের কী হবে?
সংকট একেবারেই নেই সেটাও বলা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের ৯৫ শতাংশ এবং এলএনজির একটি বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই সংকট আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। জ্বালানি তেলের সংকটের চেয়েও গ্যাসের স্বল্পতা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ইতোমধ্যেই বেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফার্নেস অয়েলের অভাবে ইতোমধ্যে খুলনা অঞ্চলের ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে অথবা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডব্লিউ) এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২২ দশমিক ১৭ শতাংশ আসে জ্বালানি তেল থেকে। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েল থেকে ১৯ দশমিক ৫১শতাংশ এবং ডিজেল থেকে ২দশমিক ৬৬ শতাংশ। পর্যাপ্ত তেল ও গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। এতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে চাহিদামাফিক তেল না পাওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আইপিপির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এই উৎপাদন সংকটের সরাসরি প্রভাবে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে লোডশেডিং সহনীয় থাকলেও গ্রামাঞ্চলে দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে জ্বালানি সংকট কেবল যানবাহনে নয়, বিদ্যুৎ এবং সেচ ব্যবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে লোডশেডিং দিয়েও সংকট সামাল দেওয়া যাবে না। এ কারণে সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বিকল্প জ্বালানি খোঁজ নিতে হবে এবং বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সংকটের বাহ্যিক চিত্র ও মজুদের সঠিক হিসেব সবার সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে। তা না হলে এ থেকে কেউ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সুযোগ খুঁজতে পারে।
জাকির হোসেন
সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক