শিমলা পাল
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১৪ পিএম
বর্তমান বিশ্ব আজ অদ্ভুত এক বিভাজনের নেশায় মত্ত। ধর্মের দোহাই কিংবা ভূখণ্ডের লোভ মানুষকে মানুষের প্রতিপক্ষ করে তুলছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আকাশজুড়ে এখন মেঘের চেয়ে বারুদের ধোঁয়ায় বেশি। প্রতিদিনের সূর্যোদয় এখন আর কেবল নতুন দিনের বার্তা নিয়ে আসে না, বরং সাথে নিয়ে আসে ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপের খবর, গাজার কোনো এক শিশুর আর্তনাদ কিংবা শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মারণাস্ত্রের মহড়া। পৃথিবীটা আজ যেন এক বিশাল দাবার বোর্ড, যেখানে মানবতা কেবলই দাবার গুটি। এই তপ্ত ও রক্তাত ভূ-রাজনীতির আগ্নেয়গিরিতে যখন বিশ্ব পুড়ছে, ঠিক তখনই বাঙালির হৃদয়ে চৈত্রসংক্রান্তির তপ্ত দাহ পেরিয়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতো নামে পহেলা বৈশাখ। আমাদের এই উৎসব আজ আর কেবল লোকজ রীতিনীতি নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে এক পশলা প্রশান্তির সঞ্জীবনী সুধা।
বর্তমান বিশ্ব আজ অদ্ভুত এক বিভাজনের নেশায় মত্ত। ধর্মের দোহাই কিংবা ভূখণ্ডের লোভ মানুষকে মানুষের প্রতিপক্ষ করে তুলছে। অদ্ভুত এক উগ্রতা আর অসহিষ্ণুতা গ্রাস করছে আমাদের চেনা পৃথিবীটাকে। এই ঘোর অমানিশার বিপরীতে বাঙালির বৈশাখ এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা। কারণ বৈশাখ কোনো কাঁটাতারের সীমানা চেনে না, চেনে না কোনো জাত-পাত। আমাদের মঙ্গলশোভাযাত্রার যে রঙিন মুখোশ, তার আড়ালে কোনো ষড়যন্ত্র নেই, বরং আছে অশুভ শক্তির বিনাশের শপথ। যখন হাজারো মানুষ হাতে হাত রেখে রাজপথে নামে, তখন সেই দৃশ্যটি বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে হয়ে ওঠে এক অনন্য সাংস্কৃতিক শক্তি যা প্রমাণ করে কামানের গোলার চেয়েও মাটির একতারার সুর অনেক বেশি শক্তিশালী।
বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণ যখন আমাদের অর্থনীতি আর স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে, তখন বাঙালির ‘হালখাতা’ আমাদের শেখায় বিশ্বাসের রাজনীতি। পুঁজিবাদের এই যুগে যেখানে সবকিছুর পরিমাপ হয় ডলারে, সেখানে বৈশাখী মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিকড়ের কথা। মাটির গন্ধ মাখা ওই পুতুল কিংবা বাউল গানের সেই নিগূঢ় দর্শনেই লুকিয়ে আছে শান্তির আদি সূত্র। আমরা যখন পান্তা-ইলিশের উৎসবে মাতি, তখন আমাদের সেই আনন্দ আসলে বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা যান্ত্রিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে এক নীরব দ্রোহ। আমরা বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেই যে, প্রাচুর্য নয়, বরং সৌহার্দ্যই পারে মানুষকে সুখী করতে।আজকের এই জটিল ভূ-রাজনীতি যখন মানুষকে কাঁটাতারের বেষ্টনীতে বন্দি করছে, তখন আমাদের মঙ্গলশোভাযাত্রা শেখায় শিকল ভাঙার গান। বৈশাখী মেলার সেই মাটির পুতুল, সোলার পাখি কিংবা বাঁশের বাঁশির সুরে কোনো মারণাস্ত্রের গর্জন নেই; আছে সৃজনের আনন্দ। বিশ্ব রাজনীতির টেবিলে যেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি শেষ কথা বলে, সেখানে বাঙালির এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ। এটি বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার মারণাস্ত্রের ক্ষমতায় নয়, বরং তার সংস্কৃতির গভীরতায়।আজ যখন বৈশ্বিক রাজনীতির তাপে আমাদের চারপাশের পরিবেশ রুক্ষ হয়ে উঠেছে, তখন বৈশাখী হাওয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের লড়াকু ইতিহাসের কথা। বাঙালি কখনো মাথা নত করেনি কোনো স্বৈরাচারের কাছে বা কোনো অপসংস্কৃতির কাছে। ঠিক তেমনিভাবে, আজকের এই অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেও বাঙালির এই মানবিক চেতনা এক ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের উৎসবের প্রতিটি আল্পনা আসলে যুদ্ধের বিরুদ্ধে আঁকা এক একটি প্রতিবাদের ভাষা।
ভূ-রাজনীতির এই ভয়াবহ দাবদাহে বৈশাখী হাওয়া আমাদের এক পশলা শান্তি আর আশার কথা শোনায়। এই হাওয়া যেন আমাদের কানে কানে বলে যায় অস্ত্রের দামামা একদিন স্তব্ধ হবেই, কিন্তু সংস্কৃতির এই ফল্গুধারা কোনোদিন শুকাবে না। বৈশাখের নতুন সূর্য যেন কেবল বাংলাদেশের আকাশে নয়, বরং সারা বিশ্বের রক্তাক্ত প্রান্তরে শান্তির এক নতুন ইশতেহার হিসেবে উদিত হয়। ঘৃণার বদলে মানুষ শিখুক ভালোবাসতে, আর যুদ্ধের বদলে বিশ্বজুড়ে বাজুক বৈশাখী মেলার সেই রঙিন বাঁশির সুর। নতুন বছর হোক মানবতার জয়গানের বছর।
শিমলা পাল
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়