সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৩ পিএম
বাংলাদেশ সবসময় শান্তিতে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করে, যুদ্ধ কখনও শান্তি বয়ে আনে না।
জ্বালানি তেলের বিদ্যমান সংকট অচিরেই কেটে যাওয়ার আভাস স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে জ্বালানি চাহিদার ১৫ দিনের মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন যেসব জ্বালানিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করছে, তাতে দ্রুতই দেশে অন্তত দুই মাসের জ্বালানি মজুদ তৈরি হবে। ইতোমধ্যে এক লাখ টনেরও অধিক জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছে চারটি জাহাজ। ভারত থেকে দুই দফায় পাইপলাইনের মাধ্যমে এসেছে ১৩ হাজার টন। খবর অনুযায়ী গত এক সপ্তাহে জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে মোট নয়টি জাহাজ। এর মধ্যে চারটিতে এসেছে এক লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল। আজ আরও ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আরেকটি জাহাজের চট্টগ্রাম বন্দরে আসার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, এ জ্বালানি দিয়ে আগামী ১৫ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ধারাবাহিকভাবে জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে আসার ফলে পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তিনি বলেছেন, আগামী দুই মাস দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট তৈরি হবে না।
আমেরিকা-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। বিশেষত ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার পরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহন একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা বেড়েও যায়। তবে বাংলাদেশে সংকট দেখা দিলেও দাম বাড়ায়নি বিপিসি তথা সরকার। তাছাড়া জ্বালানি সরবরাহ চলমান রাখতেও সরকার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র জ্বালানি পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। ফলে গাড়ি ব্যবহারকারীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে। তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে ১০-১২ ঘণ্টা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার খবর গণমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও তেল-প্রত্যাশী মানুষেরা তেলের পাম্পের কর্মচারী কিংবা নিজেদের মধ্যে লিপ্ত হয়েছে হাতাহাতিতে।
এরই মধ্যে যে খবরটি দেশবাসীর হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছে, তা হলো দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়া। ফলে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানি করে জ্বালানি চাহিদা পূরণের উপায় আর থাকল না। কবে নাগাদ এই প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু হবে, কিংবা আদৌ আর চালু হবে কি না তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারি কোনো ভাষ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী আমাদের দশের একশ্রেণির মানুষ অন্য দশটি নিত্যপণ্যের মতো জ্বালানির অবৈধ মজুদ গড়ে তুলে কালোবাজারিও শুরু করেছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কয়েক হাজার টন পেট্রোল-ডিজেল উদ্ধারের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, ডিজেল-পেট্রোল দাহ্য পদার্থ এবং যত্রতত্র এর মজুদ যেকোনো সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে, তা জানা সত্ত্বেও বিবেকপ্রতিবন্ধী কতিপয় লোক এ অপরিণামদর্শী তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে।
এদিকে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত শুক্রবার সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘চলমান যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে।’ ইরানের এ ঘোষণায় সারা বিশ্বে স্বস্তি নেমে এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও স্বাগত জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রথম দফা বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে খুব শিগগিরই পাকিস্তানে পুনরায় বৈঠক হতে যাচ্ছে বলে বার্তা সংস্থগুলো জানিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানে যেতে পারেন এমন একটি খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ সবসময় শান্তিতে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করে, যুদ্ধ কখনও শান্তি বয়ে আনে না। বরং নানা রকম দুর্যোগ-দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। ইরানের ওপর আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলার ফলে যে যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তা থেকে বিশ্বের কোনো দেশই মুক্ত থকেতে পারেনি। এর প্রধান কারণ ছিল ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া। কারণ এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের এক বৃহৎ অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। ফলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও বেড়ে গেছে। গ্রীষ্মের এই তীব্র দাবদাহের সময়ে বিদ্যুতের এই লুকোচুরি মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। সরকার অবশ্য বলছে, এই সংকট সাময়িক। দেশবাসীর ন্যায় আমরাও চাই সংকট সাময়িক হোক। তবে সেজন্য নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধের বিরতি উদ্ভূত বিশ্ব সংকট নিরসনের যে দ্বার উন্মোচন করেছে, তা স্থায়ী হোক। শুধু জ্বালানি নয়, সব সংকটের অবসান হোক, আমাদের প্রত্যাশা সেটাই।