× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হকার উচ্ছেদ: প্রয়োজন বিকল্প ব্যবস্থা

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৭ পিএম

ড. মিহির কুমার রায়, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ড. মিহির কুমার রায়, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কয়েক দিন ধরে ফুটপাত থেকে হকারসহ বেআইনি দখল উচ্ছেদ চলছে। জনপরিসরে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে বলা হচ্ছে, নতুন প্রশাসন এলেই ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা হকার উচ্ছেদ করা হয়। ফুটপাত খালি করা হয়। ছবি তোলা হয়। সংবাদ শিরোনাম হয়। কিন্তু কিছুদিন পর একই জায়গায় আবার হকার বসে। প্রশ্ন হলোÑ আমরা কি সত্যিই নগরীর ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা হকার সমস্যার সমাধান খুঁজি, নাকি শুধু সমস্যার দৃশ্যমান অংশ অপসারণ করি?

বলা বাহুল্য, হকার কারা এবং তাদের সংখ্যা কত, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য যা পাওয়া যায় তা কেবল ঢাকা শহরকেন্দ্রিক; যেখানে সারা দেশের চিত্র প্রতিফলিত হয় না। স্থানীয় বিভিন্ন ফেডারেশনের তথ্য বলছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় হকারের সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার, যারা সারা ঢাকা শহর জোরে বিস্তৃত। এখন প্রশ্ন আসে এসব হকার কত কিলোমিটারব্যাপী ফুটপাত দখল করে রয়েছেন। তথ্য বলছে, ঢাকা শহরে ৩৮৮ থেকে ৪০০ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে, যার ১৫৫ কিলোমিটার হকারদের দখলে রয়েছে। এখন দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলোÑ এসব হকারের পরিচয় কী ও কোথায় তাদের বসবাস। হকাররা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প পুঁজি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। এই হকারদের একটি বড় অংশ সমাজের অবহেলিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের অনেকেরই বিকল্প আয়ের উৎস নেই।

হকার উচ্ছেদে সমাজের প্রতিক্রিয়া

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হচ্ছে এবং যানজট নিরসনের লক্ষ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। নগরবাসীর স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। জনপরিসরে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে বলা হচ্ছে, নতুন প্রশাসন এলেই ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা হকার উচ্ছেদ করা হয়। ফুটপাত খালি করা হয়। ছবি তোলা হয়। সংবাদ শিরোনাম হয়। কিন্তু কিছুদিন পর একই জায়গায় আবার হকার বসে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই নগরীর ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা হকার সমস্যার সমাধান খুঁজি, নাকি শুধু সমস্যার দৃশ্যমান অংশ অপসারণ করি? মনে আছে, ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় ঢাকাসহ সারা দেশে ফুটপাত ও সড়ক থেকে অবৈধ স্থাপনাসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার উচ্ছেদে ব্যাপকতম অভিযান চালানো হয়েছিল। সেবার অনেকে ভেবেছিলেন, স্থায়ী সমাধান হবে। কিন্তু হয়নি। এরপর গত দুই দশকে একই দৃশ্য বারবার ফিরে এসেছে। এতে বোঝা যায়, আমরা একটি কাঠামোগত সমস্যার প্রশাসনিক সমাধান খুঁজছি।

হকারের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতি

হকারদের অবস্থান ঢাকা শহরের বিশেষত গুলশান, নিউমার্কেট, মিরপুর, ফার্মগেট, উত্তরাসহ অন্যান্য জনবহুল এলাকাগুলোতে এবং স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-নেত্রীরা প্রতিদিন এসব এলাকার ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে ব্যবসার আকারভেদে চাঁদা আদায় করে থাকে, যার সঙ্গে কর্তব্যরত স্থানীয় থানা পুলিশের একটা বোঝ পড়া থাকে। এটি অনেকটা সবারই জানা যে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য। এটা্‌ বাংলাদেশের হকার-ফুটপাত ভিত্তিক চাঁদা বাণিজ্যের একটি বাস্তব রূপ। ফুটপাতে ব্যবসা ঘিরে দীর্ঘকাল ধরে অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা, প্রভাব ও চাঁদার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যার সঙ্গে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার অসাধু লোকজন জড়িয়ে গেছে। এই কাঠামো অক্ষত রেখে শুধু উচ্ছেদ করে কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

তাহলে দেশের পাঁচ দশকে কী পরিবর্তন হলো

সমাজের পরিবর্তন হয়েছে, তবে তা স্বলাপ আয়ের মধ্যবিত্তের জন্য নয়। ধনী হওয়ার গতিতে বিশ্বের চ্যাম্পিয়ন, বৈষম্য দৃশ্যমান, কোটিপতি অগণিত বিধায় এই ধরনের একটি পরিস্তিতিতে হকার উচ্ছেদ অভিযান পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলবে। প্রথম সমস্যা তথ্যের ঘাটতি। বাংলাদেশে হকার বা ফুটপাত ভিত্তিক বাণিজ্য নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপগুলোতে এসব মানুষ ‘হকার’ নামে নয়; অনানুষ্ঠানিক খাত বা স্বনিযুক্ত শ্রমিক হিসেবে চিহ্নিত। ফলে আমরা জানি না কত মানুষ ফুটপাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত ও তাদের অর্থনৈতিক অবদান কত। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হকারদের নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে সত্যি, কিন্তু তার ভিত্তিতে কোনো সফল প্রায়োগিক গবেষণা হয়নি; যার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হতে পারে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ঢাকা শহরেই এক লাখের বেশি হকার রয়েছে। সারা দেশে এই সংখ্যা কয়েক লাখ। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে, ঢাকায় ফুটপাত ভিত্তিক বাণিজ্যের বার্ষিক আকার কয়েক হাজার কোটি টাকা। সারা দেশে তৈরি হওয়া এই বিশাল অর্থনীতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিহীন। লাখ লাখ মানুষের জীবিকা এবং বিপুল লেনদেনের একটি খাতকে ‘অবৈধ’ বলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ হকাররা শুধু বিক্রেতা নন, নগর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা সস্তায় পণ্য সরবরাহ করার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাজার তৈরি করে। এমনকি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও ধরে রাখার কাজ করে। তবে এদের কেন পরিবর্তন হবে নাÑ এই প্রশ্ন এখন নতুন সরকারের কাছে।

বিকল্প পথ কী?

১. উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি হকারদের জন্য টেকসই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি, 

২. সরকার নির্দিষ্ট স্থান, খালি সরকারি জমি দিয়ে বা মার্কেট করে দিয়ে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। এতে করে একদিকে শহরে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, অন্যদিকে এই শ্রমজীবী মানুষরাও সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন,

৩. গ্রাম থেকে শহরে আসা অনেক মানুষের জন্য হকারি দ্রুত আয়ের একটি পথ। এটি পছন্দের নয়, প্রয়োজনের পেশা। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই হকার উচ্ছেদ মানে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ করা, 

৪. আমাদের শহর বা নগর পরিকল্পনায় বড় বড় অবকাঠামো তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির জন্য পরিকল্পিত জায়গা রাখা হয় না। এ খাতে যুক্ত লাখ লাখ মানুষের জন্য জায়গা নির্ধারিত না রেখে কীভাবে আশা করা যায়, তারা ফুটপাত দখল করবে না? 

৫. পুরো বিষয়কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা দরকার। হকার ও তার ক্রেতারাও এ দেশের জনগণ। তাই সমাধান হতে হবে জনগণের কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে। শুধু শহর পরিষ্কারের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান তৈরি করা। সেই কাজটা বর্তমান সরকারই শুরু করতে পারে। তারা এমন একটি পরিকল্পিত কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা উচ্ছেদ হওয়ার ভয় বা অস্থিরতায় নয়; বরং পরিকল্পিত জীবিকা নিয়ে বাঁচতে পারবে,

৬. অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, নাগরিক অধিকার ও শাসন ব্যবস্থার বিষয় হিসেবে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযানের আগে জাতীয় সংসদে আলোচনা হবে। সংসদের অধীনে গঠিত একটি স্থায়ী কমিটি ফুটপাত অর্থনীতি ও অনানুষ্ঠানিক খাত নিয়ে কাজ করবে। তারা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে নীতিগত সুপারিশ দেবে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে বাস্তবসম্মত সমাধানমুখী কমিটি গঠন করে সেখানে নগর পরিকল্পনাবিদ, অর্থনীতিবিদ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ মানুষ, হকার প্রতিনিধির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। 

তাই, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উচ্ছেদকৃত হকারদের দ্রুত পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার অনুরোধ রইল। কারণ ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার অধিকার সুরক্ষার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বাস্তবায়নে সরকারকে এমন নীতি, আইনি কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে- যা ব্যক্তি বা সরকারের পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করবে।


ড. মিহির কুমার রায়

গবেষক ও অর্থনীতিবিদ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা