আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪৬ পিএম
বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাÑ উচ্চ সেতু, বহুতল ভবন, প্রযুক্তির প্রসার; অন্যদিকে নীরব সংকটÑখাদ্যের নিরাপত্তাহীনতা, পরিবেশ দূষণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষার বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাÑ উচ্চ সেতু, বহুতল ভবন, প্রযুক্তির প্রসার; অন্যদিকে নীরব সংকটÑখাদ্যের নিরাপত্তাহীনতা, পরিবেশ দূষণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষার বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগেÑ আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি শুধু উন্নয়নের একটি বাহ্যিক প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় একটি মৌলিক ধারণার কাছে ‘কমিউনিটি’। কারণ, একটি দেশ গড়ে ওঠে তার মানুষের মাধ্যমে, আর মানুষ গড়ে ওঠে তার কমিউনিটির ভেতরে। তাই টেকসই বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে হলে আমাদের প্রথমেই টেকসই কমিউনিটি নির্মাণের পথে হাঁটতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা: মাঠ থেকে টেবিলের দূরত্ব কমানো
বাংলাদেশে একসময় কৃষিভিত্তিক সমাজ ছিল। ‘ধানের শিষে ভরা’ এই দেশ এখন ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে রাসায়নিকনির্ভর কৃষি ও আমদানিকৃত খাদ্যের ওপর। বাজারে যে সবজি আমরা কিনি, তা কতটা বিষমুক্তÑ এই প্রশ্ন আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে।
সমাধানটি খুব জটিল নয়, কিন্তু বাস্তবায়নে প্রয়োজন সচেতনতা ও সমন্বয়। শহরের ছাদে ছাদে বাগান, গ্রামের পতিত জমিতে সমবায়ী কৃষি, স্থানীয় বাজারে সরাসরি কৃষকের অংশগ্রহণÑ এসব উদ্যোগ আমাদের খাদ্য ব্যবস্থাকে নিরাপদ করতে পারে। শুধু খাদ্য উৎপাদন নয়, খাদ্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ, যে মানুষ নিজের খাদ্য উৎপাদনে অংশ নেয়, সে কখনোই খাদ্যের অপচয় করে না।
জ্বালানি সংকট: বিকল্প শক্তির পথে হাঁটা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত গত এক দশকে অনেক উন্নতি করেছে, কিন্তু এখনও গ্রিডনির্ভরতা ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। লোডশেডিং কমলেও বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, যা অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এখানে কমিউনিটি-ভিত্তিক সমাধান হতে পারে গেম চেঞ্জার। গ্রামে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, শহরে অ্যাপার্টমেন্টভিত্তিক সোলার প্যানেল, বায়োগ্যাস প্ল্যান্টÑ এসব উদ্যোগ শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক। একটি কমিউনিটি যদি নিজস্ব শক্তির চাহিদা নিজেই মেটাতে পারে, তবে সেটি সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়।
আবাসন: ইট-কংক্রিটের বাইরে টেকসই ভাবনা
ঢাকা শহরের দিকে তাকালেই বোঝা যায়Ñ আমরা কেমন এক কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করছি। বাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু বাসযোগ্যতা কমছে। বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খোলা জায়গার অভাবÑ সব মিলিয়ে জীবন হয়ে উঠছে ক্লান্তিকর। এই পরিস্থিতিতে টেকসই আবাসন একটি জরুরি বিষয়। গ্রামে পরিবেশবান্ধব ঘর, শহরে সবুজ স্থাপত্য, পুনর্ব্যবহৃত উপকরণের ব্যবহারÑ এসব ধারণা এখন সময়ের দাবি। আমাদের মনে রাখতে হবেÑ একটি ঘর শুধু থাকার জায়গা নয়, এটি একটি জীবন্ত পরিবেশ, যেখানে মানুষ তার মানসিক শান্তি খুঁজে পায়।
শিক্ষা: তথ্য নয়, জ্ঞান ও মূল্যবোধের চর্চা
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ একটি দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে সনদনির্ভরতা, অন্যদিকে দক্ষতার অভাব। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে অনেক সময় অক্ষম হয়ে পড়ে।
কমিউনিটি-ভিত্তিক শিক্ষা এখানে একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। স্কুলের বাইরে পাঠচক্র, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির চর্চাÑ এসব উদ্যোগ শিক্ষাকে জীবন্ত করে তুলতে পারে। শিক্ষা যদি জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত না হয়, তবে তা কেবলই তথ্যের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক বন্ধন: একাকিত্ব থেকে সহমর্মিতায়
আধুনিক শহুরে জীবনে মানুষ ক্রমেই একা হয়ে যাচ্ছে। পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটির নাম আমরা জানি না, কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত। এই বিচ্ছিন্নতা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কমিউনিটি এখানে হতে পারে আশ্রয়স্থল। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলাÑ এসব উদ্যোগ মানুষকে একত্রিত করে। একটি শক্তিশালী কমিউনিটি মানে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, মানসিক প্রশান্তিও।
অর্থনীতি: ভাগাভাগির সংস্কৃতি ও টেকসই উন্নয়ন
বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু বৈষম্যও বাড়ছে। ধনী-গরিবের ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে টেকসই অর্থনীতি একটি বিকল্প পথ দেখাতে পারে।
কমিউনিটি-ভিত্তিক অর্থনীতিÑ যেখানে মানুষ একে অন্যের সঙ্গে সম্পদ ভাগাভাগি করেÑ এটি শুধু সাশ্রয়ী নয়, মানবিকও। টুল লাইব্রেরি, কো-অপারেটিভ ব্যবসা, শেয়ারিং ইকোনমিÑ এসব ধারণা আমাদের সমাজে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ছোট উদ্যোগ, বড় পরিবর্তন
বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক, কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিÑ যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়, বরং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন।
কমিউনিটি-ভিত্তিক এই চিন্তাধারা আমাদের শেখায়Ñ ‘পরিবর্তন শুরু হয় ছোট পরিসর থেকে, কিন্তু তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র সমাজে।’ আজ যদি আমরা আমাদের পরিবার, পাড়া, স্কুল, কর্মক্ষেত্রÑ এই ছোট ছোট কমিউনিটিগুলোকে টেকসই করার উদ্যোগ নিই, তবে আগামীকাল একটি টেকসই বাংলাদেশ গড়া আর স্বপ্ন থাকবে না, বাস্তব হয়ে উঠবে।
আসলে টেকসই উন্নয়ন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন সময়ের দাবি। আর এই দাবির জবাব দিতে হলে আমাদের প্রত্যেককে নিজের জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার মানুষ এগিয়ে যেতে শেখেÑ একসঙ্গে, হাতে হাত রেখে।
আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল
শিক্ষক ও কবি