সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:০৮ পিএম
ইন্টারনেট আজ শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি সেবা এবং তথ্যপ্রবাহের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রযাত্রা যতই জোরালো বলা হোক না কেন বাস্তবতা এখনও আশানুরূপ নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে এই বিষয়ে এক হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জরিপ বলছে, দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখনও ডিজিটাল ডিভাইডে ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে সামনে রেখে এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে নতুন করে চিন্তার তাগিদ দেয়।
জরিপের তথ্য বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও বাকি ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ এই সেবার বাইরে। অধিকাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও নিজস্ব মোবাইল রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের। পুরুষদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ ও নারীদের মধ্যে মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশ নারী ইন্টারনেট ব্যবহার করে। জরিপে ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যের কারণে ব্যবহারে অনাগ্রহের কথা জানিয়েছে ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। ১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘আইসিটি প্রয়োগ ও ব্যবহারিক’ শীর্ষক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে।
জরিপে জনসংখ্যার এই বড় অংশটি ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে থাকার কারণ হিসাবে বলা হয়েছে ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান না থাকা। জরিপে ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন, উচ্চ খরচের কারণে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে অনাগ্রহী। ইন্টারনেট ব্যবহারে শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। শহর এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে দুই অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশে, যা দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ইন্টারনেট ব্যবহারে ঢাকা জেলা এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে শেরপুর। ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি মোবাইল ফোন ব্যবহারে ব্যাপক বিস্তার লক্ষ করা গেলেও ব্যক্তিগত মালিকানায় এখনও ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের মোট ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও নিজস্ব মোবাইল রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশের। অন্যদিকে কম্পিউটার ব্যবহারের হার এখনও সীমিত পর্যায়ে, যা মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।
আসলে ইন্টারনেট আজ শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি সেবা এবং তথ্যপ্রবাহের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। পরিসংখ্যান মতে, দেশের একটি বড় অংশ এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকায় উন্নয়ন সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্র প্রকট। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার কম হওয়ায় ডিজিটাল বৈষম্য সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তবে এই বৈষম্যের পেছনে রয়েছে নানাবিধ কারণ। প্রথমত, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। অনেক গ্রামাঞ্চলে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নেই বা থাকলেও তা অত্যন্ত দুর্বল। দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ অনেকের নাগালের বাইরে। নিম্নআয়ের মানুষের কাছে স্মার্টফোন বা ডাটা প্যাকেজ এখনও বিলাসিতা হিসেবেই বিবেচিত হয়। তৃতীয়ত, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। অনেকেই জানেন না কীভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয় বা এর সুফল কী।
আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান বিশ্বে যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা কর্মসংস্থানের অন্যতম শর্তÑ সেখানে অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল জগতের বাইরে রেখে এই খাতের সাফল্য প্রত্যাশা কঠিন বৈকি। আমরা বলতে চাই, এই বৈষম্য কমাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে, যা প্রশংসনীয়। তবে শুধু অবকাঠামো উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বিস্তার। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল শিক্ষা আরও জোরদার করা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সহজ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট সেবার খরচ কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা জরুরি। এ ছাড়া বেসরকারি খাতকেও এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোর উচিত সুলভ মূল্যে উন্নতমানের সেবা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ এলাকায় বিনিয়োগ বাড়ানো। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল সেবা কেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করে তোলা জরুরি।
আমরা বলতে চাই, ইন্টারনেট সুবিধা থেকে জনগণের একটি বড় অংশকে বঞ্চিত রেখে ‘ডিজিটাল অগ্রযাত্রা’য় পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব নয়। তাই সময়ের দাবি, ইন্টারনেট অন্তর্ভুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা। অন্যথায় উন্নয়নের এই যাত্রায় আমরা পিছিয়ে পড়া একটি বড় জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিতে ব্যর্থ হব, যা ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।