ইমেইল থেকে
মো. শামীম মিয়া
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৬ পিএম
নদীভাঙনের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট, যা অভ্যন্তরীণ অভিবাসনকে ত্বরান্বিত করে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের নদীভিত্তিক ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা দীর্ঘকাল ধরেই এক জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে নদীভাঙন। বিশেষত পদ্মা নদী অববাহিকার চরাঞ্চলগুলোতে এই সংকট কেবল ভৌগোলিক পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি এক গভীরতর রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিফলন, যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ক্ষমতার অসাম্য একত্রে কাজ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে একটি দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার চক্রে আবদ্ধ করে রাখে। নদীভাঙনকে সাধারণত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তবে এর প্রভাব ও বিস্তার বহুলাংশে মানবসৃষ্ট নীতিগত ব্যর্থতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, পলি জমার অসম বণ্টন এবং অপরিকল্পিত বাঁধ বা ড্রেজিং কার্যক্রমÑ এসবের সমন্বিত প্রভাব নদীভাঙনকে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু এই জটিল প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে চরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের জীবনে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রায় অনুপস্থিত।
চরাঞ্চলকে একটি ‘লিমিনাল স্পেস’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারেÑ যেখানে স্থায়িত্ব ও অস্থায়িত্বের দ্বৈধ সহাবস্থান করে। এখানে জমি যেমন সৃষ্টি হয়, তেমনি তা বিলীনও হয়ে যায়। ফলে জমির মালিকানা, বসতি স্থাপন, এবং সামাজিক নিরাপত্তাÑ সবকিছুই হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তা কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক পুঁজি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বÑ সবক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। চরবাসীরা কার্যত একটি ‘অদৃশ্য নাগরিকত্বে’ বসবাস করে, যেখানে তাদের অস্তিত্ব রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে আংশিক স্বীকৃত।
নদীভাঙনের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট, যা অভ্যন্তরীণ অভিবাসনকে ত্বরান্বিত করে। শহরমুখী এই অভিবাসন প্রক্রিয়া নগর বস্তির বিস্তার, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের প্রসার এবং সামাজিক বৈষম্যকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে নদীভাঙন একটি ‘লোকালাইজড’ সমস্যা না থেকে জাতীয় অর্থনীতির ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। তবে এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘মৌসুমি প্রশাসনিক অর্থনীতি’। বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করলে প্রশাসনের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়Ñ ত্রাণ বিতরণ, জরুরি সহায়তা এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা।
বিভিন্ন গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, ত্রাণ বিতরণ, পুনর্বাসন প্রকল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হলেও এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপচয়, দুর্নীতি কিংবা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হয়, আর একটি অসাধু চক্র এই দুর্যোগকে ‘মৌসুমি আয়ের উৎস’ হিসেবে ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়াকে ‘ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম’ ধারণার আলোকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, যেখানে দুর্যোগকে একটি অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করা হয়।
অন্যদিকে, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রায় অনুপস্থিত। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নদী শাসন, পরিকল্পিত বসতি স্থাপন এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টিÑ এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি স্পষ্ট। বরং দেখা যায়, অস্থায়ী সমাধানের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা সমস্যাকে স্থায়ীভাবে সমাধান করতে ব্যর্থ। এই প্রেক্ষাপটে নদীভাঙনকে একটি ‘গভর্নেন্স ইস্যু’ হিসেবে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। কেবল প্রকৌশলগত সমাধান নয়, বরং একটি সমন্বিত নীতি কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে পরিবেশগত টেকসই, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিÑ এই তিনটি উপাদান সমান গুরুত্ব পাবে।
অন্যথায় নদীভাঙন কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি পরিণত হবে একটি কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতীক হিসেবেÑ যেখানে গরিব মানুষ হারাবে সবকিছু, আর কিছু অসাধু শক্তি লাভ করবে মৌসুমি মুনাফা।
মো. শামীম মিয়া
শিক্ষার্থী, জুমারবাড়ী, সাঘাটা ও গাইবান্ধা