× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এবারের বাজেটের চ্যালেঞ্জ এবং বিশেষত্ব

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪২ পিএম

এবারের বাজেটের চ্যালেঞ্জ এবং বিশেষত্ব

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট পেশ করবে। যেকোনো বাজেট তৈরির কাজ হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন এবং চ্যালেঞ্জেরÑ তা সে ব্যক্তিগত বাজেটই হোক, বা কোনো প্রতিষ্ঠানের বাজেট বা সরকারের বাজেটই হোক না কেন। বাজেটের মূল উদ্দেশ্যই থাকে সীমিত সম্পদ বা আয় দিয়ে সীমাহীন চাহিদা মেটানো। তা ছাড়া বাজেট কেন্দ্র করে মানুষের, বিশেষ করে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং অংশীজনদের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যায়। অথচ সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য যে পরিমাণ অর্থের সংস্থান প্রয়োজন, সেটি সংগ্রহ করা মোটেই সম্ভব হয় না। আর এর মধ্যেই নিহিত থাকে বাজেট প্রণয়নের মূল সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ এবং সমস্যার মাত্রা আবার ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাজেটের থেকে সরকারি বাজেটে অনেক বেশি থাকে। এ কারণেই বিশ্বের সব দেশের সরকারই জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে গিয়ে সবচেয়ে কঠিন সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে, তা সে আমেরিকা-কানাডার মতো উন্নত দেশই হোক বা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশই হোক। বরং বাংলাদেশের বাজেট তৈরির কাজ বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। কেননা বাংলাদেশই মনে হয় বিশ্বে একমাত্র দেশ, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না।

স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের অধিক সময়ের অগ্রযাত্রায় যখনই সরকার পরিবর্তন হয়েছে, তখনই আগের সরকারের গৃহীত সব পদক্ষেপ খারাপ হয়ে গেছে এবং সেগুলো ঝেড়ে ফেলা হয়েছে। আগের সরকারের যদি কিছু ভলো পদক্ষেপ থাকে, সেগুলোকে চালিয়ে নেওয়া এবং যেগুলোর দোষত্রুটি থাকে, তা সংশোধন করে পদক্ষেপগুলো অব্যাহত রেখে অর্থনীতির অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টি আমাদের দেশে কখনোই অনুসরণ করা হয় না। নতুন সরকার এসে আগের সরকারের গৃহীত সকল কর্মসূচি বাতিল করে বা সরিয়ে রেখে নিজেদের মতো করে সবকিছু শুরু করতে চায়। ফলে অর্থনীতি যতটুকু অগ্রসর হয়, তার চেয়ে বেশি পিছিয়ে আবার এগোতে শুরু করে। বিষয়টা সেই তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার মতো, যেখানে দিনে দুই হাত উঠে আবার রাতে তিন হাত নেমে পড়ে, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অর্থনীতি। 

অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র দেড় বছরের শাসনামলে দেশের জিডিপি ছয় শতাংশের ওপর থেক কমে তিন শতাংশের কাছে চলে এসেছে। অনেক মিলকারখানা, শিল্প এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হয় ধ্বংস করা হয়েছে, নতুবা বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন কর্মসংস্থান তো সৃষ্টি হয়নি, উল্টো বেকার হয়েছে কয়েক লাখ শ্রমিক। আইএমএফের একসময়ের কর্মকর্তা এবং মুদ্রাবাজার বিশেষজ্ঞ বলে খ্যাত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরের সময় আকস্মিক ঋণ পরিচালনা এবং ঋণ আদায়ে কড়াকড়ি আরোপ করে উন্নত বিশ্বের ব্যাংকের মতো ব্যবস্থা চালু করার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাফে দুই লাখ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ছয় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে মাত্র এক বছরের মধ্যে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কয়েকটি ব্যাংক আমানতকারীদের চাহিদা মোতাবেক অর্থ ফেরত দিতে পারেনি, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে এক নজিরবিহীন খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং ফলশ্রুতিতে দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে এই মাপের ভয়াবহ ক্ষতি সাধিত হয়েছে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে। এত অল্প সময়ের মধ্যে জিডিপির এত বড় ধরনের পতনসহ দেশের অর্থনীতির এরকম নজিরবিহীন ক্ষতি বিশ্বের আর কোনো দেশে কখনও হয়েছে কি না তা আমাদের জানার বাইরে। এসব কারণে এবারের বাজেট যে হবে অনেক বেশি কঠিন, সংকটের এবং চ্যালেঞ্জের- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

অবশ্য এর বিপরীত মতবাদও প্রচলিত আছে আমাদের দেশে, যেখানে বাজেট তৈরির কাজ বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক সহজ। কেননা এখানে বাজেটে বিশেষ কোনো অর্থনৈতিক ইস্যু বা পরিস্থিতি সামলানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। পরিবর্তিত অর্থব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য বাজেটে থাকে না কোনো চমক। বাজেট বিশ্লেষণ করলে মনে হয় যেন আগের বাজেট থেকে নির্দিষ্ট একটা পারসেন্টেজ বাড়িয়ে নতুন বাজেট তৈরি করা হয়েছে। সেই গতানুগতিক ধারার করারোপ, ঘাটতি বাজেট, ঘাটতি মেটানোর জন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রয়, ব্যাংকঋণ এবং কিছু বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য। এর সাথে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস এবং জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু বাজেটে থাকে না। এবারও নিশ্চয়ই এর ব্যতিক্রম হবে না। 

অনেকেই আমার এমন ধারণার সাথে একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এমনটাই ঘটে আসছে আমাদের দেশের বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে। যেমন, দেশের বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ এবং সেই সাথে বাজেট ঘাটতির পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্রাতিরিক্ত। এই বিশাল অঙ্কের ঘাটতির অর্থ যে শুধুমাত্র সঞ্চয়পত্র বিক্রি এবং ব্যাংকঋণের মাধ্যমে মেটানো অর্থনীতির জন্য ভালো ফলদায়ক হয় না, সেই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এই ধরনের বাজেটঘাটতি মেটাতে হয় সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে। কারণ এতে দুটো লাভ হয়। প্রথমত, সরকার তুলনামূলক অল্প সুদে এই অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। দ্বিতিয়ত, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সুবিধা সংকুচিত হয় না। অথচ সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংস্থান করার জন্য প্রয়োজন দেশে একটি সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট। কিন্তু সেই এক লাখ কোটি টাকার বাজেট থেকে আজ প্রায় সাত/আট লাখ কোটি টাকার বাজেটে পরিণত হলেও, দেশে স্থাপিত হয়নি বন্ড মার্কেট এবং সরকারও ব্যাংকঋণের পরিবর্তে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়নি। 

বৈদেশিক মুদ্রার সংকট নিরসনে এবং বাজেট বরাদ্দের জন্য বৈদেশিক ঋণের পরিবর্তে প্রবাসীদের মাঝে বিশেষায়িত ডলার বন্ড বিক্রির সুযোগ থাকলেও, সরকার সে দিকটি বিবেচনায় নেয় না। অনেকেই হয়তো বলবেন যে বর্তমান সরকার তো মাত্রই ক্ষমতায় এসেছে এবং এবারই তারা প্রথম বাজেট দিতে চলেছে। কথা সত্য। কিন্তু বাজেট তো সরকার তৈরি করে না। আমাদের দেশে আমলারাই বাজেট তৈরি করে এবং তারাই যুগের পর যুগ এই কাজ করে আসছে। আমলারাই আগের সরকারের আমলে বাজেট তৈরি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারাই বাজেট তৈরি করেছে এবং বর্তমান সরকারের আমলেও তারাই বাজেট তৈরির কাজ করছে। এসব সুপারিশ তো আমলাদের কাছ থেকেই আসতে হয়। বাজেটে যখন কোনোরকম নতুনত্ব বা ইস্যুভিত্তিক কোনো উদ্যোগ থাকে না, তখন সেই বাজেট হয়ে যায় গতানুগতিক ধারার, যা তৈরি করা সেরকম কঠিন বা চ্যালেঞ্জের হয় না। 

এবারের বাজেট এমন সময় তৈরি হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন এবং জালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। এই জ্বালানি সংকট এবং জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেকেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা করছেন। অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের মতে যদি এই যুদ্ধ খুব সহসা বন্ধ না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক মন্দা অবশ্যম্ভাবী। আর যদি তেমনটা হয় তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও চাপে পড়ে যাবে। যদি যুদ্ধ বন্ধ হয়ও, তাহলে খুব সহসাই যে সবকিছু স্বাভাবিক হবে, তেমনটা ভাবার কারণ নেই। যুদ্ধ বন্ধ হলে বিশ্বব্যাপী মন্দা হয়তো এড়ানো যাবে কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্য দিয়েই যাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটা বেশি জটিল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা অন্যান্য দেশের কিছুটা হলেও প্রস্তুতি আছে। আমাদের দেশের তো কোনোরকম প্রস্তুতি নেই, উল্টো অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সৃষ্ট ভয়াবহ সংকট বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে। 

এর বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে আমেরিকায় প্রাইভেট ক্রেডিটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল অবস্থা ২০০৮ সালের সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারির মতো এক আর্থিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পারলেও আমেরিকায় বিষয়টি নিয়ে বেশ জোরেশোরেই আলোচনা চলছে। যদি প্রাইভেট ক্রেডিটের সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান না হয়ে এবং যদি এই কারণে আমেরিকায় আর্থিক সংকট দেখা দেয় তাহলে এর প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পড়বে এবং বাদ যাবে না আমাদের দেশও। তাই বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে সংকট আছে বা আরও সংকট দেখা দিতে পারে, সেগুলোও বড় মাপের চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। 

সত্যি বলতে কি, এবারের বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে, চ্যালেঞ্জ, সমস্যা এবং সংকটের অন্ত নেই। তাই বাজেটে ফিসক্যাল পলিসি এমনভাবে গ্রহণ করতে হবে, যাতে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসে, আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পায়, সরকারি ও বেসরকারি, উভয় খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়। পক্ষান্তরে কর বাড়ানোর সুযোগ নেই বললেই চলে এবং থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর সম্ভাবনা খুবই কম। কেননা এতে জনগণের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হবে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এহেন পরিস্থিতিতে বর্তমান অর্থবছরকে একেবারেই ব্যতিক্রম ধরে নিয়ে কিছু বিকল্প পন্থায় বাজেটের অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এরকম কিছু বিকল্প ব্যবস্থার বিষয় আমি অন্যান্য লেখায় তুলে ধরেছি বিধায় এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এবারের বাজেট অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের এবং অনিশ্চয়তার, আর এই চ্যালেঞ্জ এবং অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করে বাজেট প্রণয়নের মধ্যেই আছে মুন্সিয়ানা। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই বাজেট প্রণয়নে সেই মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে সক্ষম হবে।


নিরঞ্জন রায়

সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা