× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সাফল্যের পূর্বশর্ত

এ.কে.এম আহসান হাবিব নাফি

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪০ পিএম

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সাফল্যের পূর্বশর্ত

দীর্ঘ সতেরো বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ যখন ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, তখন সেটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি নাগরিক আস্থার পুনর্গঠনের সূচনা।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি যে রাষ্ট্রচিন্তা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন, সেটিকে সামনে রেখেই জনগণ আস্থা রাখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ওপর। সেই আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠনের মাধ্যমে। 

তবে ইতিহাস সাক্ষীÑ ক্ষমতায় আসা যতটা সহজ, ক্ষমতার প্রত্যাশা পূরণ করা ততটাই কঠিন। বিরোধী দলের রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা এক নয়। আন্দোলনের ময়দানে যে রাজনৈতিক ভাষা কার্যকর, প্রশাসনের বাস্তবতায় সেই ভাষাকে রূপ দিতে হয় নীতি, আইন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ফলে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।

ক্ষমতায় আসার পর মাত্র ২৮ দিনের মধ্যেই ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা সরকারকে একটি কর্মমুখী প্রশাসনের ইঙ্গিত দেয়। এই পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে কয়েকটি মৌলিক স্তম্ভে সামাজিক সুরক্ষা, গ্রামীণ অর্থনীতি, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান, ধর্মীয় সেবকদের সম্মানী চালু করা এবং ঈদের সময় প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো উদ্যোগ রাষ্ট্রের একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে। এই উদ্যোগগুলোকে ‘Targeted Social Protection’ মডেলের একটি প্রাথমিক রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্র সরাসরি নাগরিকের কল্যাণে হস্তক্ষেপ করে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থার পরিকল্পনা সামাজিক ন্যায্যতা এবং সম্পদের পুনর্বণ্টনের একটি বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয়।

গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগও নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ এবং দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচি একটি সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়ন কৌশলের অংশ। বিশেষ করে, প্রায় ২০,০০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। 

প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও কিছু প্রতীকী কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ দেখা গেছে। সরকারপ্রধানের সরল জীবনযাপন, ভিভিআইপি প্রটোকল হ্রাস এবং সংসদ সদস্যদের কিছু বিশেষ সুবিধা বাতিল এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন বার্তা দেয়। এই বার্তার মূল কথা হলো ক্ষমতা মানে বিশেষাধিকার নয়; বরং দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা। তবে এই উদ্যোগগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় তার ওপর। কারণ প্রতীকী পরিবর্তন রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা। রমজান ও ঈদের সময় বাজার নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণের উদ্যোগ অর্থনীতিকে স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে। শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব বোনাস নিশ্চিত করা এবং রুগ্‌ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনাও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে জোরদার করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই ক্ষেত্রগুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করা কঠিন হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের কিছু উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। শিক্ষার্থীদের পুনর্ভর্তি ফি বাতিল, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য সহায়তা এবং ধর্মীয় ও ক্রীড়া শিক্ষার সমন্বয় একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষানীতির ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি ই-হেলথ কার্ড চালু, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও জনগণমুখী করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নারীর নিরাপত্তা ও চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করতে পিংক বাস চালুর মতো উদ্যোগও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি ইতিবাচক উদাহরণ।

রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে সংযম, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, শহীদ সেনা দিবস ঘোষণা এবং বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে। প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গড়ে তুলতে ফ্রি ইন্টারনেট সুবিধা চালুর উদ্যোগও ডিজিটাল রাষ্ট্র গঠনের পথে একটি অগ্রগতি। এই সমস্ত পদক্ষেপ যদি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা হয়, তবে এটি একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’-এর সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে যেখানে রাষ্ট্র এবং নাগরিকের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। রাষ্ট্র নাগরিকের জন্য উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে; আর নাগরিক প্রত্যাশা করছে জবাবদিহিতামূলক এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।

বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার যে লক্ষ্য সামনে এসেছে, তা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি একটি মানবিক উন্নয়নভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণাকে সামনে আনে। এখানে শক্তির মানদণ্ড হবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শিক্ষার মান, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের জীবনমান।

জনগণের ম্যান্ডেটে সরকার গঠন করলে যে তা জনবান্ধব হয় তার প্রকৃত উদাহরণ বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক দেশ বাধ্য হয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশে সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি না করে পূর্বের মূল্যেই তা সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং জনবান্ধব পদক্ষেপ। 

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এর মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, সরকার সংকট প্রতিরোধে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। অতএব, রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপির এই নতুন যাত্রা একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকার যদি তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃঢ় থাকতে পারে, তবে এটি সত্যিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।


এ, কে, এম আহসান হাবিব নাফি

চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা