× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জ্বালানি সংকট: জনদুর্ভোগ আর কত

নয়ন বিশ্বাস রকি

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৩৬ পিএম

জ্বালানি সংকট: জনদুর্ভোগ আর কত

বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প ও জনজীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি খাত। বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেলÑ এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট এমন এক গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে, যা শুধু অর্থনীতিকেই নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠছে এই সংকট কি শুধুই বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে, নাকি এর পেছনে রয়েছে সরকারের পরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ব্যর্থতা?

জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন, মানুষের ক্লান্ত মুখ আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাসÑ এ যেন এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। ভোরের আলো ফুটতেই পেট্রোল পাম্পে ভিড়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও অনিশ্চয়তাÑ তেল মিলবে তো? কর্মজীবী মানুষ দেরিতে কাজে পৌঁছাচ্ছে, পরিবহন খাত বিপর্যস্ত, আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে। এই সংকট শুধু জ্বালানির চেয়ে বেশি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পরিকল্পনার অভাবের প্রতিচ্ছবি। মানুষ চায় স্বস্তি, চায় নিশ্চয়তা। কিন্তু বাস্তবতা এখনও হাহাকারের। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হয়ে জনজীবনে অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে।

এ কথা সত্য যে, জ্বালানি আমদানি, মার্কিন অনুমতি ও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ : সংকটের বহুমাত্রিক বাস্তবতা রয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে জ্বালানি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রেও পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতি এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপরও। বিশেষ করে বাংলাদেশ রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ‘অনুমতি’ নেওয়ার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি গভীর সংকটে ফেলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের শেষ সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির নামে যে সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে তার খেসারত বর্তমান সরকারের কাঁধে।

এটা মানতেই হবে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নীতি যেকোনো দেশের জন্য বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ইরান বা নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত দেশ থেকে তেল-গ্যাস কিনতে গেলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, ডলার লেনদেন ও বাণিজ্যিক ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে বাংলাদেশকে পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হয়। এই নির্ভরতা জ্বালানি বাজারে বিকল্প উৎস বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত করে এবং অনেক সময় বেশি দামে জ্বালানি কিনতে বাধ্য করে। এই নিষেধাজ্ঞা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির অংশ- যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। 

বাংলাদেশে গ্যাস সংকট এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শিল্প-কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এতে যেমন কর্মসংস্থান কমছে, তেমনি রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গ্যাসের ঘাটতির কারণে লোডশেডিং বেড়েছে। গ্রাম থেকে শহরÑ সব জায়গায় মানুষ বিদ্যুৎহীনতায় ভুগছে। গরমের দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দেশে এতগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও কেন এই সংকট? বাস্তবতা হলো, অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রই বসে আছে জ্বালানির অভাবে। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, অন্যদিকে জনগণ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। এটি পরিকল্পনার বড় ধরনের ব্যর্থতার উদাহরণ।

জ্বালানি খাতে দুর্নীতির অভিযোগও নতুন নয়। বিভিন্ন প্রকল্পে অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় চুক্তিÑ এসব নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি এখন স্পষ্ট। জনগণের টাকায় এসব প্রকল্প চালু রাখা হলেও এর সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। বরং বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষ। তাদের আয় বাড়ছে না, কিন্তু ব্যয় বেড়েই চলেছে। ফলে জীবনযাত্রার মান ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে। জ্বালানি সংকট তাই শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়, এটি পুরো অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়, যা সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তারা জানতে চায়, কেন এত বছর ধরে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করার পরও এমন দুরবস্থা? কেন আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি? কেন দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করা যাচ্ছে না? এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর এখনও মেলেনি।

সমাধানের পথ অবশ্যই আছে, যদি সরকার আন্তরিক হয়। প্রথমত, জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গুরুত্ব বাড়াতে হবে, যাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, দুর্নীতি ও অপচয় রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

জ্বালানি সংকট শুধু একটি সাময়িক সমস্যা নয়; এটি দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। সরকারের উচিত এই সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ জনগণের ধৈর্যেরও একটি সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম করলে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও ভয়াবহ হতে পারে। এখন সময় এসেছে দায় এড়ানোর নয়, বরং দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার, নয়তো জনদুর্ভোগের এই চক্র থেকে মুক্তি মিলবে না। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদাÑ এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করাই এখন সময়ের দাবি।


নয়ন বিশ্বাস রকি

কলাম লেখক ও সমাজসেবক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা