ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২০ পিএম
ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের জলাভূমি গত ৫০ বছরে ৭০ ভাগ কমে গেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বেশ কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় চট্টগ্রামের জলাধার বিলীন হওয়া নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পানি সংকটের একটি চিত্র তুলে ধরে। চিত্রটি এমনÑ সেখানকার একজন চাকরিজীবী বলছেন যে, তার মাসে চার হাজার টাকার মতো পানি কিনতে হয়। নলকূপে পানি উঠে না। উঠলেও লবণাক্ত। চারপাশে মানুষ পানি না পেয়ে হাহাকার করছে। কিন্তু সমাধানের কোনো পথ নেই। এই চিত্র কী ভবিষ্যতের কোনো বার্তা দিচ্ছে? এটা শুধু চট্টগ্রামের চিত্র নয়। শেরপুরের সীমান্তবর্তী আদিবাসী অঞ্চলেও অবস্থা ভয়াবহ। সেখানকার ৩০ হাজার মানুষ সুপেয় পানির জন্য হাহাকার করছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০০ থেকে ১২০ ফুট নিচে নেমে গেছে। অকেজো হয়ে পড়ছে অধিকাংশ টিউবওয়েল। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য মতে, শুষ্ক মৌসুমে সেখানকার সীমান্ত অঞ্চলের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়ে। মাইলের পর মাইল হেঁটেও পানি পাচ্ছেন না তারা।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের জলাভূমি গত ৫০ বছরে ৭০ ভাগ কমে গেছে। ১৯৭১ সালে জলাভূমির পরিমাণ ছিল ৯৩ লাখ হেক্টর। তা কমে এখন হয়েছে ২৮ লাখ হেক্টরে। অর্থাৎ ৬৫ লাখ হেক্টর জলাভূমি কমেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী প্রবাহমান নদীর সংখ্যা ৯৩১টি। ৩০৮টি নদী নাব্যতা হারিয়েছে। ৩০৮টি নদীর মধ্যে ঢাকা বিভাগে নাব্যতা হারানো নদীর সংখ্যা ৮৫টি, রংপুরে ৭১টি, রাজশাহীতে ১৮টি, চট্টগ্রামে ১১টি, সিলেটে ১০টি ও ময়মনসিংহে ২৬টি এবং খুলনা বিভাগে ৮৭টি। বাংলাদেশের নদীগুলোর ৪৮টি সীমান্ত নদী, ১৫৭টি বারোমাসি নদী, ২৪৮টি মৌসুমি নদী। উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। আর দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোর লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে নদীগুলো স্রোতহীন হয়ে পড়েছে। পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মধ্যে।
বেসরকারি সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের তথ্য মতে, ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ঢাকায় ৬০ শতাংশ জলাধার বিলুপ্ত হয়েছে। ২০২২ সালে আরডিআরসির দেওয়া তথ্য মতে, বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ লিটারপ্রতি ২ মিলিগ্রামের নিচে। পানিতে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী বাঁচার জন্য দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ থাকতে হয় লিটারপ্রতি ৪ মিলিগ্রাম। বুড়িগঙ্গা নদীর জলজ প্রাণীর অবস্থা বুঝতে বোধকরি আর কোনো তথ্যের প্রয়োজন নেই। তারা মোট ৫৬টি নদী নিয়ে গবেষণা করেছিল। ৫৬টি নদীর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ১৯টি নদীর অবস্থা খুবই ভয়াবহ দেখা গেছে। ঢাকা বিভাগের ১৯টি নদীই মারাত্মক দূষণের সম্মুখীন। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলনের (পরিজা) ও তথ্য মতে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি প্রায় অক্সিজেনশূন্য। লিটারে তারা অক্সিজেনের মাত্রা পেয়েছে মাত্র ০.৬ মিলিগ্রাম।
মৎস্য বিভাগেরও ঢাকার পুকুর নিয়ে একটি জরিপ আছে। জরিপ অনুযায়ী ঢাকায় ১২০টি সরকারি পুকুর, ৩২টি বেসরকারি পুকুর এবং ৩১টি লেক আছে। অথচ ১৯৮৫ সালে এই পুকুরের সংখ্যা ছিল ২ হাজার। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী পুরান ঢাকায় ১৯২৪ সালে ১২০টি পুকুর ছিল। এখন আছে মাত্র ২৪টি অর্থাৎ ৯৬টি পুকুরই ভরাট করা হয়েছে । তাদের মতে ঢাকায় ২৪১টি পুকুর কোনো রকম টিকে আছে। পুরান ঢাকায় টিকে আছে ২৪টি। ২৪১টি পুকুর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আওতায় আছে। যার ফলে সেসব কেউ দখল করতে পারেনি। বাকি ৮৬টি পুকুরের ৭টি দখল করেছে সরকারি সংস্থা আর ৭৯টি দখল করেছে বেসরকারি সংস্থা। তাদের মতে একটি শহর ৫ শতাংশ জলাশয় থাকার প্রয়োজন থাকলেও আছে মাত্র ২.৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স বা সংক্ষেপে বিআইপি জলাধারগুলো নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল। তাদের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে ঢাকা শহরে সবুজ এলাকা ও ফাঁকা জায়গা ছিল ৫৩.১১ বর্গ কিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে হয়েছে ২৯.৮৫ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় জলাভূমি ও জলাধার ছিল ৩০.২৪ বর্গ কিলোমিটার। জলাভূমি ভরাট হতে হতে এখন তা হয়েছে মাত্র ৪.২৮ বর্গ কিলোমিটার। জলাধার শুধু কমে যাওয়া নয় এখানকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে দিন দিন। ২০১৯ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩ হাজার ১৬২ একর জলাশয়ের মধ্যে ভরাট করা হয়েছে ২৭ শতাংশ। যার ফলে তাপমাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকায় ১৯৮৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার হেক্টরের বেশি জলাভূমি নাই হয়ে গেছে। তাদের মতে এভাবে চলতে থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে জলাভূমির পরিমাণ ১০ ভাগেরও নিচে নেমে আসবে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী সেখানে খালের সংখ্যা ৪৭টি। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের হিসাব মতে ঢাকায় ৫৬টি খাল থাকার কথা থাকলেও সবগুলোই প্রায় মৃত। যদিও ২৬টি খাল উদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। বিশেষজ্ঞদের মতে যদিও একটি শহরে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ জলাধার থাকা দরকার, কিন্তু বাস্তবে এখন তা ৪-৫ শতাংশেরও কম। ২০১৮ সালে ঢাকায় ১০০টি পুকুর থাকলেও এটি এখন কমতে কমতে দাঁড়িয়েছে ২৯টিতে। ৫ বছরে পুকুর কমেছে ৭১টি। চট্টগ্রামের অবস্থাও ভয়াবহ। এখানে প্রায় ২ হাজার ৭৭৬ জলাধার বিলীন হয়ে গেছে।
এই অবস্থা চলতে থাকলে জলাধার হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ওপর নির্ভরশীল অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী মারা যাবে। নানা রকম জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী হারিয়ে যাবে। নষ্ট হয়ে যাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে হুমকির মুখে পড়বে জীববৈচিত্র্য। জলাধার না থাকার কারণে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে সেখানে মশার বংশবৃদ্ধি ঘটাবে। বাড়বে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ নানা রকম রোগ।
প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার পরিবর্তন, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। এ আইন ভঙ্গ করলে ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কিন্তু কে শুনে কার কথা। মহাউৎসবের সঙ্গে এসব জলাধার মানুষ ভরাট করছে। নানা রকম অট্টালিকা গড়ে তুলছে। এসবের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তা না হলে হয়তো পানি সংকটও বড় সংকট হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশে।
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
পরিবেশ বিষয়ক কলাম লেখক