মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪১ পিএম
‘আমি মেলা থেকে তাল পাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি/ বাঁশি কই আগের মতো বাজে না/ মন আমার তেমন যেন সাজে না/ তবে কি ছেলেবেলা অনেক দূরে ফেলে এসেছি।’ পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত শিল্পী প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া ভারতীয় এই পুরনো বাংলা গানে ছেলেবেলার হারিয়ে যাওয়া মধুময় স্মৃতি খুঁজে ফেরা ও তা না পাওয়ার হাহাকারই ফুটে উঠেছে। প্রত্যেক মানুষের কাছেই তার কৈশোরের স্মৃতি অত্যন্ত মধুর। পরিণত বয়সে সেসব কথা স্মরণ করে সবাই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। ভাবেন, আহা! আবার যদি কৈশোরকালের সে দুরন্ত দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারতাম! কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে সে কাল হারিয়ে যায় চিরতরে। হাজার চেষ্টা করলেও তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না। কারণ বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার সময়েও পৃথিবীতে এমন কোনো মেশিন আবিষ্কার হয়নি, যা মানুষকে তার অতীতে ফিরিয়ে নিতে পারে। এ পৃথিবী তো প্রতিনিয়ত সামনের দিকে ঘুরছে তার কক্ষপথে। পেছনে ফেরার উপায় যে নেই। তাই মানুষকেও প্রতি মুহূর্তে সামনের দিকে এগোতে হয়। পেছনে ফেরার সাধ্যি তার নেই।
আজ মধ্য ষাট পেরিয়ে এসে যখন পেছনের দিকে তাকাই, মানসচক্ষে ভেসে ওঠে ছেলেবেলার সে দূরন্তপনার স্মৃতি। বাঁধনহারা সে দিনগুলোতে দলবেঁধে স্কুলে যাওয়া-আসা, ছুটির দিনে বন্ধুদের নিয়ে গ্রাম দাবড়ে বেড়ানো, যখন ইচ্ছা গ্রামের মাঝখান দিয়ে প্রবহমান স্বচ্ছ সলিলা খালে ঝাঁপিয়ে পড়ার সে আনন্দময় দিনগুলোর স্মৃতি সিনেমার দৃশ্যের মতো মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। সে দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ছিল বাংলা নববর্ষের আগমন। নতুন বছরের আগমনে যেন পৃথিবী নতুন রূপ ধারণ করবেÑ এমন একটি উচ্ছ্বাস আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখত।
আজ যে সময়টির কথা আমি বলতে চাচ্ছি, সেটা গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে সত্তর দশকের গোড়ার দিকের কথা। জীবন তখন ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল। আজকের যান্ত্রিক সভ্যতা তখনও মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে পারেনি। মানুষ তখনও আজকের দিনের মতো আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠেনি। সবাই মিলেমিশে একসাথে ছিল । কবি বন্দে আলী মিয়ার ‘আমাদের গ্রাম’ কবিতায় সে ছবি ফুটে উঠেছে অত্যন্ত প্রাঞ্জল হয়ে। সে সময় গ্রামীণ জীবনে আনন্দ-বিনোদনের উপলক্ষ খুব কমই ছিল। বিদ্যুতের বালাই ছিল না। সিনেমা-থিয়েটারের তো প্রশ্নই আসে ন। গ্রামে দুয়েক ঘরে ট্রানজিস্টার অবশ্য ছিল। তা শুধু খবর শোনার কাজে ব্যবহার হতো। বিনোদনের একমাত্র অনুষঙ্গ ছিল যাত্রাপালা ও বয়াতিদের পালাগান। হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে উন্মুক্ত মাঠে শামিয়ানার নিচে সেসব গানের আসর বসত। যাদের ভালো লাগত, তারা যেত। যারা পছন্দ করত না তারা দূরে থাকত। তবে এখনকার মতো ‘অনৈসলামিক কার্যকলাপ’ বলে রে রে করে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ত না।
এহেন গ্রামীণ জীবনে অপার আনন্দের বার্তা নিয়ে প্রতিবছর আসত পয়লা বৈশাখ। বছর শুরুর এ দিনটি উদযাপনের আয়োজন শুরু হতো কয়েক দিন আগেই। আগের দিন, অর্থাৎ ৩১ চৈত্র পালিত হতো চৈত্রসংক্রান্তি; গ্রামে আমরা বলতাম ‘সাকরাইন’। সাকরাইন কোনো কোনো এলাকায় বিশেষ উৎসব হিসেবে পালিত হলেও আমাদের এলাকায় তেমনটি ছিল না। নতুন বছরের প্রস্তুতি দিবস হিসেবেই তা পরিচিত ছিল। আমাদের থানা সদর শ্রীনগর বাজারে ব্যবসায়ীগণ নতুন বছরে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার লক্ষ্যে এদিন দোকান ঝাড়ামোছার কাজ করতেন। পরদিন নতুন বছরে হবে হালখাতা। সে প্রস্তুতি চলত পুরোদমে। সাজ সাজ সে অবস্থা দেখে মনে হতো পরদিন যে বছরটি শুরু হবে, তা বোধ করি সবকিছু আমূল পাল্টে দেবে। বলা বাহুল্য, সবকিছু আগের নিয়মেই চলত।
আমরা যারা ছোট ছিলাম সে সময়, তাদের কাছে নতুন বছরের প্রধান আকর্ষণ ছিল মেলা। এখন যেটা ‘বৈশাখী মেলা’ নামে পরিচিত, আমাদের বিক্রমপুরে সেটাকে বলা হতো ‘গলইয়া’। অধুনা বৈশাখী মেলার দাপটে গলইয়া হারিয়ে গেছে। পয়লা বৈশাখের দিন সকাল হলেই দেখা যেত, রঙবেরঙের পোশাকপরা শিশু-কিশোররা দলবেঁধে চলেছে মেলার দিকে। মেলা বসত বাজারের পূর্বপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের পূর্বপাড়ের খোলা মাঠে। এই মেলার কর্তৃত্ব নিয়ে মাঝেমধ্যেই এলাকার প্রভাবশালীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখা দিত। একবার তো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছিল। মেলার মাঠের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নাগরদোলা। আমরা অবশ্য বলতাম ‘চরক’। প্রতিজন এক আনা করে দিয়ে সে নাগরদোলায় চড়তে হতো। বসত পুতুল নাচের আসর। মেলার এক পাশে প্যান্ডেল সাজিয়ে তার ভেতরে পুতুল নাচের আসর বসত। দুটি পুতুল কিচিরমিচির করে কীসব বলে নাচত, মারামারি করত। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। পুতুল কীভাবে নাচে, তা ভেবে অবাক হতাম। পরে অবশ্য জেনেছি ছোট্ট মঞ্চের পেছনে পর্দার আড়ালে থাকত পুতুল নাচের কেরামতি। হাতের আঙুলে সুতা বেঁধে দুইজন লোক পুতুল দুটিকে নড়াচড়া করাত। সেদিনের সে পুতুল নাচেরই আধুনিক সংস্করণ ‘পাপেট শো’। শোলার পুতুলের সে নাচ কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরে প্রাসঙ্গিক হয়েই জায়গা করে নিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় সরকারকে বিদেশি শক্তি নিয়ন্ত্রিত ‘পুতুল সরকার’ বলে অভিযুক্ত করে থাকে। অর্থাৎ পুতুল নাচের পুতুল যেমন পর্দার আড়ালের মানুষের হাতের আঙুলের টানে নাচে, তেমনি বৃহৎ শক্তির ইশারায় নাচে ‘পুতুল সরকার’। যাক, রাজনীতির প্রসঙ্গ এখানেই ক্ষ্যামা দেই। আনন্দময় দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে বসে রাজনীতির মতো রসকষহীন বিষয়ের প্যাঁচাল কারও ভালো লাগার কথা নয়।
মেলার মাঠের আরেকটি আইটেম ছিল বেশ আকর্ষণীয়। সেটি হলো ‘বায়োস্কোপ’। এটা অবশ্য মেলা ছাড়াও হাটেবাজারে দেখানো হতো। এখনও কোথাও কোথাও কালেভদ্রে এর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। উঁচু চৌকোনা একটি ফ্রেমের ওপর বসানো বাক্সের সামনের দিকে তিনটি এবং দুই পাশে দুটি গোলাকৃতির কাচ লাগানো থাকত। অনেকটা গাড়ির হেডলাইট আকৃতির। তার মধ্যে চোখ লাগিয়ে দেখতে হতো। একজন লোক হাতে ঝুনঝুনি বাজিয়ে ওপরের হাতল ঘুরিয়ে সুরের তালে নেচে নেচে ভেতরের ছবি ঘোরাত আর বর্ণনা দিত। এক শো দেখার জন্য বায়োস্কোপওয়ালাকে দিতে হতো ‘আধ আনা’, মানে তিন পয়সা। বলে নেই, সে সময় ছয় পয়সায় ছিল এক আনা, আর ষোলো আনায় ছিল এক টাকা। প্রচণ্ড গরমে ঘেমে নেয়ে উঠেও আমরা ক্লান্ত হতাম না। বরং মনের আনন্দে মেলার মাঠজুড়ে চক্কর দিতে থাকতাম। কিনে খেতাম লজেন্স বা আইসক্রিম নামের জমানো পানি। গ্রামে সে সময় আজকের দিনের মতো দামি আইসক্রিম পাওয়া যেত না। বরফকলে পানির সঙ্গে চিনি ও সামান্য দুধ মিশিয়ে বানানো হতো আইসক্রিম। আমরা বলতাম ‘দুধমালাই’। যদিও তাতে দুধ কিংবা মালাইয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর।
গলইয়ার মাঠে বিক্রি হতো নানারকম মুখরোচক খাবার। সেগুলোর মধ্যে বিন্নি ধানের খৈ আর গুড়ের বিশেষ ধরনের বড় বাতাসা, যেটাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো ‘ফাঁপা’ ছিল অন্যতম। ফাঁপা জিনিসটি ছিল বেশ মিষ্টি আর সুস্বাদু। গোলাকৃতির এ খাবারটি তৈরি হতো গুড় দিয়ে। ভেতরটা ফাঁপা বলেই বোধ করি নাম হয়েছিল ফাঁপা। মুখে দিলেই গলে যেত। এ ছাড়া ছড়িভাঁজা, নিমকি, মুরলি, কটকটি, দুধ-ছানার নানারকম সুস্বাদু মিষ্টির সমারোহ ঘটত গলইয়া মেলায়। সন্ধ্যায় দেখা যেত হাতে মাটির নতুন হাঁড়ি আর মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরছে মেলাফেরত মানুষ। নতুন বছর উপলক্ষে সেসব খাবার পাঠানো হতো আত্মীয়-স্বজনের বাসায়ও।
সে সময় নববর্ষের আরেকটি আকর্ষণীয় পর্ব ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা। সাধারণত যুবকরাই এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। কোনো পুরস্কার ছিল না এ প্রতিযোগিতায়। কে কার ঘুড়িকে বা-কাট্টা দিতে পারে, প্রতিযোগিতা চলত তারই। আমাদের এলাকায় এ প্রতিযোগিতার আসর বসত এখন যেখানে শ্রীনগর স্টেডিয়াম (মুন্সীগঞ্জ) সেখানে। এই ঘুড়িযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হতো কয়েক দিন আগে থেকেই। প্রতিযোগীরা সুতাকে তীক্ষ্ন করার জন্য ‘মাঞ্জা’ দিতেন। বার্লি ও সাগুদানার সঙ্গে কাচের বোতলভাঙা পাউডার মিশিয়ে সে মিশ্রণের মধ্যে সুতাকে ভিজিয়ে রোদে শুকিয়ে নিলেই সুতা হয়ে যেত ধারালো। এই প্রক্রিয়াকে বলা হতো সুতায় ‘মাঞ্জা’ দেওয়া। তারপর নববর্ষের দিন নাটাই ভর্তি মাঞ্জা দেওয়া সুতা ও ঘুড়ি নিয়ে তারা যেতেন যুদ্ধক্ষেত্রে, অর্থাৎ শ্রীনগর মাঠে। আমরা ছেলেছোকরার দল বড় ভাইদের পেছনে পেছনে যেতাম ঘুড়ি ধরতে। কেটে যাওয়া ঘুড়ি ও সুতা ধরে নিজের দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলত আমাদের মধ্যে। কাঁটা ঘুড়ি উঁচু থেকে ধরতে কেউ কেউ বাঁশের লাঠির মাথায় বরই গাছের ডাল বেঁধে নিত। বা-কাট্টা হওয়া ঘুড়ি তাতে পেঁচিয়ে যেত।
কখনও কখনও পহেলা বৈশাখ বিকালে ঈশানকোণে কালো মেঘ জমে উঠত। তারপর শুরু হতো ঝড়। সে প্রবল বাতাস ও বর্ষণে সারাদিনের খরতাপে তেতে থাকা পরিবেশ নিমিষেই শীতল হয়ে যেত। আমরা সে শীতল বারিধারায় সিক্ত হয়ে মেলা থেকে কেনা বাঁশের বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে বাড়ির পথ ধরতাম। আজ জীবনের এ পড়ন্ত বিকালে শৈশবের সে সুখময় দিনগুলো স্মৃতিকাতর করে তোলে। খুব ইচ্ছা করে সে দিনগুলো ফিরে পেতে। আবার যদি গলইয়ার মেলা থেকে বাঁশি কিনে বেসুরো আওয়াজে চারদিক মাতিয়ে বাড়ি ফিরতে পারতাম! হায়, সে দিন যে হারিয়ে ফেলেছি। সে সাথে হারিয়ে ফেলেছি বাঁশির সে বেসুরো সুরও।