× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চড়কপূজার ইতিবৃত্ত

সঞ্জয় সরকার

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৩৮ পিএম

চড়কপূজার ইতিবৃত্ত

ভয়ংকর অগ্নিকুণ্ডের ওপর দিব্যি হেঁটে যাচ্ছেন মানুষ! লম্ফ-ঝম্প করছেন ধারালো ছুরি বা দায়ের ওপর। জিহ্বায় লোহার শলাকা বিদ্ধ করে ঘুরছেন এদিক-সেদিক। কেউ আবার পিঠে গাঁথা বড়শির সাহায্যে ২৫-৩০ ফুট উঁচু চড়ক আকৃতির গাছে ঘুরছেন অবিরাম। শিব-কালীর বেশে রামদা-ত্রিশূল হাতে করছেন উদ্দাম নৃত্য। দর্শনার্থীরা ঘিরে ধরছেন তাদের, ছিটিয়ে দিচ্ছেন খেলনা-বাতাসা-পানি। হাজার হাজার পুণ্যার্থীর মুহুর্মুহু উলুধ্বনি আর ঢাক-কাঁসর-শঙ্খের শব্দে মুখরিত করে তুলছেন গোটা এলাকা।

চোখ চড়কগাছ হয়ে ওঠার মতো এমন সব ভয়ংকর ও বিচিত্র আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিবছরের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তিতে গ্রামবাংলায় অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহ্যবাহী চড়কপূজা। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব বলে বিবেচিত হয়ে আসছে এটি। চড়কপূজার আনুষ্ঠানিকতার ধরন কিছুটা আলাদা; যা আদিম লোকাচারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। 

চৈত্র মাসের শেষ দিন অনুষ্ঠিত হলেও পূজার প্রস্তুতি শুরু হয় আরও দুই-তিন সপ্তাহ আগে থেকে। পূজাকে কেন্দ্র করে আয়োজকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। আর পূজার দিন চড়কপূজার মাঠ পরিণত হয় সকল ধর্মাবলম্বীর মিলনমেলায়। চড়কপূজা মূলত গ্রামীণ কৃষি দেবতা শিবের আবাহন। দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি, নিঃসন্তান দম্পতির সন্তান লাভ, মনোবাসনা পূরণসহ মহাদেবতা শিবের সন্তুষ্টি লাভই এই পূজার উদ্দেশ্য। শিবের গাজন, গম্ভীরা পূজা, নীলপূজা বা হাজরাপূজাও চড়কপূজারই নামান্তর। উচ্চ শ্রেণির ব্রাহ্মণরা এই পূজায় অংশ নেন না। আয়োজনের দিকটি নির্দিষ্ট বর্ণ-সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর আনন্দ-উৎসবে সকল বর্ণ-মতের লোকেরাই অংশগ্রহণ করেন। চড়কপূজাকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে চৈত্রসংক্রান্তির বারোয়ারি মেলা। 

কবে কখন চড়কপূজার প্রচলন হয়, এর ইতিহাস জানা আজ দুঃসাধ্য। লিঙ্গপুরাণ, ধর্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের মতো আদি ধর্মগ্রন্থগুলোতে শিব আরাধনার উল্লেখ থাকলেও চড়কপূজার উল্লেখ নেই। এমনকি গোবিন্দানন্দের বর্ষক্রিয়াকৌমুদী এবং রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্বেও চড়কপূজার কথা বলা হয়নি। অনেকের মতে, তান্ত্রিক সাধনা ও লৌকিক বিশ্বাসকে ভিত্তি করেই এই পূজার প্রচলন। কালের পরিক্রমায় আনুষ্ঠানিকতার ধরন এবং ব্যাপ্তি কিছুটা কমলেও বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও ঘটা করে চড়কপূজার আয়োজন হয়। ঝিনাইদহের মহেশপুরের দত্তপুরে চড়ক উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে কয়েকশ বছর ধরে। ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামে এক রাজা তার নিচু বর্ণের প্রজাকুলের জন্য এই ধর্মীয় উৎসব শুরু করেছিলেন। একইভাবে নেত্রকোণার ঋষিপাড়া, সাতপাই; সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর শিবমন্দির, শ্রীধরপুর কালীমন্দির, বাহাদুরপুর মন্দির; বরিশালের জুমলাখলা; পাবনার পূর্ণানন্দ যোগাশ্রম; গাজীপুরের কালিয়াকৈর; ঠাকুরগাঁও সদরের বুড়াশিব মন্দির; নাটোরের শঙ্করভাগ; মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, বগুড়া, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চলে শত বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে চড়কপূজা।

ব্রিটিশ সরকার ১৮৬৫ সালে চড়কপূজায় বড়শি ও জ্বলন্ত বাণবিদ্ধ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু আয়োজকরা তাদের ঐতিহ্য ও পূজার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আদিম বর্বরতাসম্পন্ন এসব দৈহিক যন্ত্রণার নানা কলাকৌশল আজও ধরে রেখেছেন। চড়কপূজার কয়েকটি পর্ব রয়েছে। এক এক করে পর্বগুলো পালন করার মধ্য দিয়েই পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। পূজায় নেতৃত্ব দেন একজন ‘গুরু সন্ন্যাসী’। তার সঙ্গে থাকেন আরেকজন ‘বালা’। পূজার সূচনা হয় অধিবাসের মধ্য দিয়ে। এই পর্বে গ্রামের নবীন-প্রবীণরা গুরু সন্ন্যাসীর কাছ থেকে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন। তারা পূজার দিন পর্যন্ত আতপ চালের ভাত ও নিরামিষ খান। তাদের খাবার জোগাড় করতে হয় বাড়ি বাড়ি মাগন (ভিক্ষা) করে। এই পূজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ‘পাট স্নান’ বা ‘পাট নাচানি’। চড়কের দেব মূর্তির নাম ‘পাট’। কাঠের তৈরি পাট দেখতে অনেকটা নৌকার আগার মতো। পাটের মধ্যে থাকে শিবলিঙ্গ। পূজার সাত দিন আগে তা নামানো হয়। রাজ সন্ন্যাসী শিবলিঙ্গসহ পাটটি নদীতে নিয়ে স্নান করান। এ সময় আয়োজকরা ভূত-প্রেত-দৈত্য-দানব সেজে বাধা দেন। সন্ন্যাসী তার তন্ত্র-মন্ত্র জপে সব বাধা পেরিয়ে পাট স্নান করিয়ে তেল-সিঁদুর-চন্দন মাখান। এ সময় মুহুর্মুহু ঢাক, কাঁসর-ঘণ্টা-শঙ্খ বাজানো হয়। 

পাট স্নানের পরবর্তী পর্বটির নাম ‘পাট নাচানি’। সন্ন্যাসীরা পাট মাথায় নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে যান। তখন ‘বালা’ গান করেন। সন্ন্যাসীরা কালী, শিব, পার্বতী প্রভৃতি রূপ ধারণ করে ঢাকের তালে তালে পরিবেশন করেন নৃত্য। কেউ কেউ ধারালো রামদার ওপর খালি পায়ে লাফঝাঁপ করেন অথবা অন্যান্য উপায়ে ক্ষিপ্রতা দেখান। বাড়ির কুলবধূরা পাটে তেল-সিঁদুর-চন্দনের ফোঁটা দিয়ে প্রণাম করেন। সবশেষে কিছু উপকরণ যেমন : নগদ টাকা, চাল, তেল, আলু, নারকেল, শসা প্রভৃতি দিয়ে তাদের বিদায় করেন। কোথাও কোথাও এসব উপঢৌকনকে বলা হয় ‘সিধা’। সন্ন্যাসীরা আসার সময় সিধার সামান্য অংশ গৃহকর্ত্রীকে ফেরত দিয়ে আসেন। গৃহকর্ত্রীরা পরিবারের মঙ্গল কামনায় তা ধানের গোলায় রেখে দেন। কিছু এলাকায় ‘অষ্টক গান’ও পরিবেশন করা হয়। চড়কপূজার আরও দুটি পর্ব হচ্ছে ‘চড়ক ঘোরানো’ এবং ‘নীলপূজা’। চড়ক ঘোরানো হয় সংক্রান্তিতে অর্থাৎ মূল পূজার দিন। আর নীলপূজা অনুষ্ঠিত হয় সংক্রান্তির রাতে। চড়ক ঘোরানো হচ্ছে চড়কপূজার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব। ২৫-৩০ ফুট উঁচু বৈদ্যুতিক খুঁটির মতো সোজা একটি কাষ্ঠখণ্ডকে বলা হয় ‘চড়কগাছ’। কদম গাছের মূল কাণ্ড দিয়ে তৈরি করা হয় এটি। সারা বছর গাছটি জলে ডোবানো থাকে। চৈত্রসংক্রান্তির দিন তা ঢাকঢোল পিটিয়ে ওঠানো হয়। এরপর বারোয়ারি তলায় বা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় চড়কপূজা। গুরু সন্ন্যাসী পূজায় পৌরহিত্য করেন। এ সময় অনেকে কবুতর, পাঁঠা বলি দেন। বিকালের দিকে চড়কগাছটি সোজা করে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়। গাছের আগায় বেঁধে দেওয়া হয় কাঠ ও দড়ি। সন্ন্যাসীরা তখন স্নান করে নতুন ধুতি পরে গুরু সন্ন্যাসীর কাছে গিয়ে মন্ত্রপূত হন। তন্ত্র-মন্ত্র শেষ হলে তাদের পিঠের নিচে চামড়ায় লোহার তৈরি বড় সাইজের একটি করে বড়শি গেঁথে দেওয়া হয়। এরপর বড়শিটি বেঁধে দেওয়া হয় গাছে ঝোলা দড়ির সঙ্গে। মহাদেবতা শিবের নাম নিয়ে বড়শি ও দড়ি সহযোগে ঝুলে থাকা যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষগুলো চড়কার মতো গাছের চারপাশে ঘূর্ণন শুরু করেন। ঘোরার সময় নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের উদ্দেশে ছিটিয়ে দেন বাতাসা, ফল প্রভৃতি। নারীদের উলুধ্বনি আর ঢাক-কাঁসর-ঘণ্টা-শঙ্খের শব্দে তখন সেখানে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমন আদিম উল্লাস দেখে আগন্তুকদের চোখ তখন সত্যি ‘চড়কগাছ’ হয়ে ওঠে। দীর্ঘক্ষণ ঘূর্ণন শেষে তাদের গাছ থেকে নামিয়ে আনা হয়। বড়শি খোলার পর গুরু সন্ন্যাসী একদলা মাটি বা যজ্ঞের ছাই নিয়ে তন্ত্র-মন্ত্র পড়ে তাদের পিঠের ক্ষতস্থানে লাগিয়ে রক্তপাত বন্ধ করেন। 

চড়কপূজায় সন্ন্যাসীদের আরও কিছু কসরত দেখা যায়। প্রতিটি কসরতই একেক ধরনের নরক যন্ত্রণার মতো। কিছু সন্ন্যাসীকে দেখা যায় জিহ্বায় লোহার শলাকা ঢুকিয়ে হেঁটে হেঁটে দর্শককে দেখাচ্ছেন। আবার কেউ উদ্দাম নেচে চলছেন রামদা নিয়ে। মানুষজন তাদের ভয়ে দূরে পালাচ্ছেন। আবার জলভর্তি কলসি বা কাঁটার ওপর দিয়েও দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছেন কেউ কেউ। দৈহিক যন্ত্রণার এমন সব কসরত প্রদর্শনের আগে অনেকে প্রচুর তাড়ি, চোলাই বা গাঁজা সেবন করে নেশায় বুঁদ হয়ে নেন। ফলে যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা মনে হয় না। এভাবেই একে একে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী চড়কপূজা। চৈত্রসংক্রান্তির মতো চড়কপূজাও আবহমান গ্রামবাংলার লোকায়ত এক উৎসব।


সঞ্জয় সরকার

ছড়াকার ও লোকসংস্কৃতি অন্বেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা