আনু মুহাম্মদ
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২৯ এএম
আনু মুহাম্মদ। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ ছয় ঋতুতে সমৃদ্ধ অঞ্চলÑ গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত। প্রাণবৈচিত্র্য ঋতুবৈচিত্র্য আমাদের শক্তির জায়গা। বছর শুরু বাংলা বছরের প্রথম দিনÑ গ্রীষ্ম ঋতুর প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। অনেকে বলেন, বছরের শুরু এরকম গরমে না হয়ে শীত ঋতুর প্রথম দিন পহেলা পৌষ হলে গরম কম থাকত, বাংলা নববর্ষের উৎসব আরও আনন্দদায়ক হতে পারত। কিন্তু কোনদিন থেকে বছর শুরু হবে, বছর কীভাবে হিসাব হবে কিংবা মাস কীভাবে ভাগ হবে তার নানা ইতিহাস আছে, ব্যাখ্যা আছে, কাহিনীও আছে।
এই অঞ্চলে প্রাচীনকালে বছর মাস ইত্যাদি কীভাবে দেখা হতো তার একটা চিত্র পাওয়া যায় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রণীত গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র থেকে। কথিত আছে যে এটি রচিত হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দে ভারতবর্ষের প্রথম সম্রাট মৌর্য্য বংশীয় চন্দ্র গুপ্তের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্যের নেতৃত্বে। এই গ্রন্থে বৎসরের বিভিন্ন মৌসুম ও ঋতুর নাম- শ্রেণিকরণ করা হয়েছিল এভাবেÑ
‘২ মাসে ১ ঋতু হয়। শ্রাবণ ও প্রোষ্ঠপদ (ভাদ্র) দুই মাস বর্ষা ঋতু। আশ্বিন ও কার্ত্তিকÑ এই দুই মাস শরৎ ঋতু। মার্গশীর্ষ (বা অগ্রহায়ণ) ও পৌষÑ দুই মাস হেমন্ত ঋতু। মাঘ ও ফাল্গুনÑ এই দুই মাস শিশির (বা শীত) ঋতু। চৈত্র ও বৈশাখ এই দুই মাস বসন্ত ঋতু। জ্যেষ্ঠামূলীয় (জ্যৈষ্ঠ) ও আষাঢ় এই দুই মাস গ্রীষ্ম ঋতু।’
আরও বলা হয়েছে, ‘শিশিরাদি ৩ ঋতুর (অর্থাৎ শিশির, বসন্ত ও গ্রীষ্ম) নাম উত্তরায়ণ। বর্ষাদি ৩ ঋতুর (অর্থাৎ বর্ষা, শরৎ ও হেমন্ত) নাম দক্ষিণায়ন।’ (কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র)
সেসময় পহেলা বৈশাখ বর্ষশুরু ধরা হয়নি, বছরে দিনও ধরা হয়েছে কম। কর্মবৎসর নির্দেশ করা হয়েছে এভাবেÑ
‘তিনশত চুয়ান্ন (৩৫৪) দিনরাত্রি (দিবস) ধরিয়া (রাজসরকারের কর্মবৎসর গণনা করিতে হইবে। এই কর্ম্মবৎসর আষাঢ় মাসের পূর্ণিমায় সমাপ্ত বলিয়া ধৃত হইবে...।’ (ঐ)
এরপর বহু বছর পার হয়েছে। এই অঞ্চলে বহু শাসক এসেছে। মোগল আমলে বহুদিন চান্দ্র বর্ষ ধরে খাজনা আদায় হতো কিন্তু চান্দ্র বর্ষের সাথে যেহেতু ফসলের মৌসুম মেলে না সেহেতু সৌর বর্ষ শুরু হয় সম্রাট আকবরের সময়ে, অনেক গবেষণার পর। তখন থেকেই নতুন হিসাবে আমরা পাই ছয় ঋতু বারো মাসের সুসংগঠিত হিসাব।
এই জনপদে চৈত্র মাসের শেষ দিন (চৈত্রসংক্রান্তি) এবং পহেলা বৈশাখ (নতুন বাংলা বছরের প্রথম দিন) জীবন জীবিকার অংশ হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে বহু বছর ধরেই। এক বছরের হিসাব-নিকাশ শেষ করে আরেক বছর নতুন করে শুরুর হালখাতা খোলা। ১৯৬৬ সালে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি বাংলা দিনপঞ্জি সংশোধন করে। এখানে প্রথম পাঁচ মাসকে ৩১ দিন, আর বাকি মাসগুলোকে ৩০ দিন বানানো হয়। প্রতি অধিবর্ষে ফাল্গুন মাসে ৩১ দিন ধার্য করা হয়। ১৯৮৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে এই দিনপঞ্জি গ্রহণ করা হয়। এর কয়েক বছর পর দ্বিতীয় সংশোধনীতে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিনÑ এই ছয় মাস ৩১ দিনে, ফাল্গুন মাস ছাড়া অন্য পাঁচ মাস ৩০ দিনে পালন করা ধার্য হয়। ফাল্গুন মাস ২৯ দিনের, কেবল অধিবর্ষের বছর ফাল্গুন মাস ৩০ দিন। এই হিসাবে ইংরেজি ১৪ এপ্রিলে পহেলা বৈশাখ নির্দিষ্ট হয়। কিন্তু হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ হয় ১৫ এপ্রিল। তার ফলে পশ্চিমবাংলাসহ সনাতন ধর্মাবলম্বী অনেকে এখনও ১৪ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তি ও ১৫ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করেন।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নানাবিধ আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরদার হয় ১৯৬০-এর দশকে। রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রতিবাদ সংঘটিত হয়। পাশাপাশি পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে। পহেলা বৈশাখে সূর্যোদয়ের পরপর ছায়ানটের শিল্পীরা গানের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানান। এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন ক্রমে বিস্তৃত হয়, আরও বহু সংগঠন দেশজুড়ে এই উৎসবে শামিল হয়।
গত কয় দশকে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনের বাইরে গিয়ে শহরে গ্রামে এই দিনগুলো পরিণত হয়েছে উৎসবে। শুধু বাঙালি সমাজে নয়, বাংলাদেশের চাকমা-মারমা-ত্রিপুরা-সাঁওতালসহ অন্যান্য জাতির জন্যও এই দিনগুলো উদযাপনের। তাই বাংলা নববর্ষ ঘিরে সব আয়োজন উৎসব শুধু বাঙালির নয়, অন্যান্য জাতিরও। পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈশালী, সাংগ্রাই, বিজুসহ নানা উৎসব বিভিন্ন জাতির প্রধান উৎসব। শুধু বাংলাদেশও নয়, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামেও এই দিনে নতুন বর্ষবরণের উৎসব পালন করা হয়।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে এই উৎসব সবচাইতে বড় জাতীয় সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। কেননা এই উৎসব সকল ধর্ম জাতি বিশ্বাস শ্রেণি লিঙ্গের মানুষকে ধারণ করতে পারে। এই উৎসবে শ্রমজীবী সকল স্তরের শিশু বৃদ্ধ নারী পুরুষের অংশগ্রহণও সবচাইতে বেশি, কারণ অন্যান্য উৎসবের তুলনায় এর ব্যয়ভার অনেক কম। তা ছাড়া আমাদের জন্য এটাই একমাত্র জাতীয় উৎসব, যার মধ্যে এই ভূমির জীবন সংস্কৃতি প্রাণ প্রকৃতির বৈচিত্র্য আর সৃজনশীলতা প্রকাশিত হয়। যার শেকড়ে প্রাণবিনাশী মুনাফা টান, বৈষম্য, নিপীড়ন, আধিপত্য ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ডাক শোনা যায়।
তবে মানুষের প্রাণবন্ত উৎসব আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অপপ্রচার, হুমকি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর শক্তির আওয়াজও আছে। যাদের মন-মগজ ‘অন্য’দের প্রতি বিদ্বেষভরা, মানুষের সৃজনশীলতা আনন্দ উদযাপন যাদের কাছে অসহ্য, যারা এই প্রাণ প্রকৃতি ভূমির টান অস্বীকার করে তারাই এই উৎসবকে নানাভাবে বিরোধিতা করতে চেষ্টা করে। এ রকম কিছু মানুষ ছাড়া কারও পক্ষেই এই উৎসবকে খাটো করা সম্ভব নয়। এই প্রধান জাতীয় উৎসবকে কাটাছেঁড়া করা, তাকে সীমিত করা, উৎসবের বিপক্ষে ভয়-অপবাদ-মিথ্যাচারের সব অপচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আর এসব আনন্দ-স্বস্তি-শেকড়বিদ্বেষী গোষ্ঠীর অপতৎপরতায় কাবু হয়ে বছর বছর বিভিন্ন সরকার নিরাপত্তার নামে নানাবিধ বিধিনিষেধ আরোপ করতে চেষ্টা করে। এগুলো মানা যাবে না।