× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কুষ্টিয়ায় পীর হত্যা

এ নৃশংসতার অবসান হবে কবে

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:০৭ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বেশ কিছুদিন থেমে থাকার পর ফের এক পৈশাচিক মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে স্থানীয়ভাবে পরিচিত একজন পীরকে হত্যা করেছে একদল উত্তেজিত জনতা। ঘটনাটি ঘটেছে গত শনিবার কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায়। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ দেশের প্রায় সব জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামের শামীম রেজা জাহাঙ্গীর শিক্ষাজীবন শেষে কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও কয়েক বছর আগে গ্রামে ফিরে ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচার শুরু করেন। গ্রামেই গড়ে তোলেন একটি আস্তানা। কিছু মানুষ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। তবে স্থানীয়দের অনেকেই তার প্রচারণাকে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করতেন। জাহাঙ্গীর নিজেকে পীর হিসেবে পরিচয় দিলেও সমাজের একটি অংশের কাছে তিনি ছিলেন ধর্মের অপব্যাখ্যাকারী। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে তিনি মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করছিলেন। একই অভিযোগে ২০২১ সালে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়েছিল। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল। দীর্ঘদিন কারাভোগ করে ফিরে এসে পুনরায় একই কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন বলে বিরুদ্ধবাদীদের অভিযোগ।

কয়েক দিন আগে ধর্ম সম্পর্কে জাহাঙ্গীরের বিতর্কিত বক্তব্যের একটি ভিডিওক্লিপ  কে বা কারা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়, যদিও ভিডিওটি অনেক আগের। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদল উত্তেজিত মানুষ জাহাঙ্গীরের আস্তানায় হামলা চালায়। তারা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলায় জাহাঙ্গীরসহ কয়েকজন আহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাহাঙ্গীরের মৃত্যু হয়। 

আমাদের সমাজে ধর্মকে পুঁজি করে একশ্রেণির অসৎ ব্যক্তির রমরমা ব্যবসার যেমন কমতি নেই, তেমনি ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে সহিংসতা সৃষ্টির নজিরও কম নয়। বলা নিষ্প্রয়োজন, দুটোই সমান অপরাধ। একটি ধর্মভীরু সরলমনা মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা। আরেকটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া। রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী এ দুটোই অপরাধকর্ম। ধর্মীয় বিষয়ে একেকজন একেক মতবাদে বিশ্বাসী হলেই যে তারা ধর্মবিরোধী হবেন, তা যেমন ঠিক নয়; তেমনি কাউকে ধর্মবিরোধী বা নাস্তিক-মুরতাদ আখ্যা দিয়ে হত্যা করার অধিকারও কারও নেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এসব কথা বহুবার বলা হলেও তা উলুবনে মুক্তা ছড়ানোতেই পর্যবসিত হয়েছে। স্মরণে থাকার কথা, গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে কথিত এক পীরের আস্তানায় তৌহিদী জনতার ব্যানারে একদল উচ্ছৃঙ্খল লোক হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও কবর থেকে কথিত পীর নুরাল পাগলার লাশ তুলে পুড়িয়ে দিয়েছিল। সে ঘটনায় সারা দেশে নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় ওঠে ছিল। ওই ঘটনার পর দেশব্যাপী বাউল সম্প্রদায়ের ওপর একের পর এক হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সরকারি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। কৃষ্টিয়ার দৌলতপুরেও ঘটনার পর পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। 

বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় স্বাধীনতার দেশ। অসাম্প্রদায়িকতা এ দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য। আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছে। ধর্মের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। দৌলতপুরের জাহাঙ্গীর যদি তার ব্যাখ্যায় ইসলাম ধর্মের অবমাননা করে থাকে বা ধর্মীয় বিধানের অপব্যাখ্যা দিয়ে থাকে, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। তেমনি ব্যবস্থার কারণেই ইতঃপূর্বে তিনি কারাভোগও করেছেন। রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধ করলে সে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার কেবল রাষ্ট্র তথা প্রশাসনের। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সে অধিকার নেই। বরং আইন হাতে তুলে নেওয়া অপরাধ। 

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে চলে ধর্মের নামে ধান্ধা-ফিকির। অন্যদিকে ধর্মকে রক্ষার নামে তথাকথিত তৌহিদী জনতার তাণ্ডব। এই তৌহিদী জনতা কারা তার কোনো ব্যাখ্যা আজতক পাওয়া যায়নি। তথাকথিত এই তৌহিদী জনতার ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে চলেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, তৌহিদী জনতার ব্যানারে সংঘটিত কর্মকাণ্ড যেন বৈধ হিসেবে গণ্য। অথচ এ ধরনের কর্মকাণ্ড একটি রাষ্ট্র বা সমাজে কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। তার চেয়ে বড় কথা, ধর্ম রক্ষার নামে যারা এসব সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে, তারা তলিয়ে দেখে না, ইসলাম তা সমর্থন করে কি না। ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং এ ধর্মে সহিংসতা ও জবরদস্তির কোনো স্থান নেই। বিপথগামী কাউকে বলপ্রয়োগে নয়, বরং ইসলামের আকিদার মর্ম অনুধাবন করে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনাকেই ইসলাম সমর্থন করে। কিন্তু ইসলামের সে গূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে ভালোভাবে না জেনেই একদল লোক এর রক্ষক সেজে ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়ে চলেছে। 

আজ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে যে ঘটনা ঘটেছে, আগামীতে যে তা অন্য কোনো স্থানে ঘটবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর কারণ হলো, ঘটনা ঘটার পর মামলা হয়, গ্রেপ্তার হয়, কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব সহিংসতার বিচার হয় না। প্রতিটি ঘটনার পর নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, সংবাদপত্রে নিবন্ধ, টেলিভিশনের আলোচনায় এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। আর সেজন্যই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই নৃশংসতার কি অবসান হবে না?

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা