প্রেক্ষাপট
অঞ্জন মজুমদার
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:০৬ পিএম
বাংলাদেশ আজ এমন একটি জনসংখ্যাগত পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, আশার দিক হলো, যার মধ্যে প্রায় ৬৫% কর্মক্ষম বয়সের (১৫-৬৪ বছর) মানুষ এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ (১৫-৩৫ বছর), এই বিপুল যুবশক্তি যদি সঠিকভাবে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদে ত্বরান্বিত করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬-৭%-এর মধ্যে থাকলেও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এটি আরও উচ্চমাত্রায় উন্নীত করা সম্ভব।
বাংলাদেশের যুবসমাজ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ কর্মীর একটি বড় অংশ তরুণ, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০% জোগান দেয়। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ৬-৭ লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছে, যেখানে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ ফ্রিল্যান্সিং দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। কৃষি খাতেও নতুন প্রজন্মের ‘কৃষি-উদ্যোক্তা’ তৈরি হচ্ছে, যারা আধুনিক প্রযুক্তি, প্রসেসিং ও ভ্যালু চেইন উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে, পোল্ট্রি শিল্প খাতে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে যুক্ত আছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এবং অধিকাংশই যুবশক্তি; তবুও সামগ্রিকভাবে সঠিক নীতি পলিসির কারণে যুবশক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগানো যায়নি।
বর্তমান বাংলাদেশের যুবশক্তির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বেকারত্ব। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১০-১২%-এর মধ্যে, যা সাধারণ বেকারত্বের হারের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে প্রতিবছর প্রায় ২০-২২ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এ ছাড়া ‘স্কিল গ্যাপ’ বা দক্ষতার ঘাটতি একটি বড় সমস্যাÑ শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জিত জ্ঞান ও শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে; এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
প্রথমত, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর মাত্র প্রায় ১৫% টেকনিক্যাল শিক্ষায় যুক্ত, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম, এই হার কমপক্ষে ৩০-৪০% এ উন্নীত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, আইটি ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণরা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
তৃতীয়ত, উদ্যোক্তা উন্নয়নে বাস্তবসম্মত সহায়তা প্রয়োজন; সহজ শর্তে ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ড, ইনকিউবেশন সেন্টার এবং মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে হবেÑ বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং এগ্রো-প্রসেসিং খাতে যুব উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে, এমন পরিকল্পিত উদ্যোগÑ যেমন পারিবারিক পোল্ট্রি, গ্রামীণ উৎপাদন ও ভ্যালু চেইন উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
চতুর্থত, শিল্পায়নের বহুমুখীকরণ জরুরি : তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক্স, ফুড প্রসেসিং, ব্লু ও গ্রিন ইকোনমি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ভবিষ্যতে অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হবে।
যুবশক্তি একটি বিশাল সম্ভাবনা ও আগামীর অগ্রগতির জন্য বাস্তব শক্তি, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাফল্যে রূপ নেবে না। সঠিক নীতি, পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে এই শক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের অভিজ্ঞতা দেখায়Ñ যুবশক্তিকে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। সরকার সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আগামী দশকে একটি শক্তিশালী, উদ্ভাবনী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে বাংলাদেশ।
অঞ্জন মজুমদার
গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি স্পেশালিস্ট, ঢাকা