সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৮ পিএম
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো অর্থনৈতিক খাতও রাহুগ্রাসে পতিত হয়েছিলÑ এ কথা সর্বজনবিদিত। শিল্প-বাণিজ্য, ব্যাংক-বীমাসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে চলেছে হরিলুট। যার ফলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক খাতের এ দুরবস্থার কথা কাউকে ব্যাখ্যা করে বলার দরকার পড়ে না। জনসাধারণ প্রতিনিয়ত এর কুফল ভোগ করে চলেছেন। উন্নয়নের নামে লুটপাটের যে মচ্ছব দীর্ঘ দেড় দশক চলেছে, তার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া পড়ছে জনসাধারণের নিত্যদিনের জীবনযাপনে।
গত শুক্রবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে জাতীয় অর্থনীতির চরম দুরবস্থার কথা জানিয়েছেন। বিগত সরকারের আমলে লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এই সীমাহীন লুটপাট ও অব্যবস্থার কারণে দেশের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিগত দিনের একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, যেখানে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে গেছে। আর ২০০৫-০৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা পৌঁছে যায় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে। একই সময়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে নেমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩০ শতাংশে। শিল্প খাতে এই ধসের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতে নিযুক্ত হয়েছে। তবে তাদের কৃষি খাতে সম্পৃক্ত হওয়াকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলা যায় না। বরং এটাকে ছদ্ম বেকারত্ব হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন অর্থমন্ত্রী। এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে গিয়ে সরকারকে নানামুখী চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন আমির খসরু। তিনি বলেছেন, কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, বরং একটি টেকসই স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
শেখ হাসিনার শাসনামলের দুর্নীতি ও অনিয়ম এখন কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সে সময় সারা দেশে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক অনিয়ম ও তছরুপ হয়েছে, তা অনেকের ধারণারও বাইরে। আপাদমস্তক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সে সরকারটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে শূন্য করে দিয়ে গেছে। অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা, স্বাধীনতার পর যখন এই দলটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছিল, তখনও কায়েম হয়েছিল লুটপাটের রাজত্ব। সে সময় মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে ‘নিখিল বাংলা লুটপাট সমিতি’ নামে অভিহিত করেছিলেন। মজলুম জননেতার দেওয়া সে আখ্যা নিরর্থক ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের নিরন্ন-নিরাশ্রয় মানুষের জন্য সাহায্য হিসেবে আসা গম, চাল, টিন, কম্বল, শিশুখাদ্য আত্মসাৎ করেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানায় প্রশাসক হয়ে বসা লীগ নেতারা ব্যাপক লুটপাটের মাধ্যমে শিল্প খাতকে রুগ্ণ করে ফেলেছিল। একইভাবে লীগ সরকারের বিগত আমলটিতেও সে ধারা বজায় ছিল। এ সময় দেশের ব্যাংকিং খাতে বিরাজ করেছে চরম বিশৃঙ্খলা। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও দলীয় বিবেচনায় ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়ে লুটপাটের দরজা চিচিংফাঁক করে দেওয়া হয়েছিল। ওইসব ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানের মালিক আওয়ামী লীগের বরকন্দাজ ব্যবসায়ী কিংবা নেতারা। লুটপাটের টাকা বিদেশে পাচার করতে এসব ব্যাংক ব্যবহৃত হয়েছে চ্যানেল হিসেবে। পনেরো বছরে যে লক্ষাধিক কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়েছে, তার প্রায় সবই গেছে লীগ নেতাদের ব্যাংকের মাধ্যমে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার দেশের শিল্প খাতে সৃষ্টি করেছে বিপর্যয়। ব্যাংকগুলো আক্রান্ত ছিল তারল্য সংকট ব্যাধিতে। এই দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ের কোনো চেষ্টাই করেনি সরকারটি। বরং রাজস্ব ঘাটতির ফলে রাষ্ট্রীয় তহবিল-ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে ব্যাংক খাত থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিয়ে। সরকারের এই ঋণগ্রহণ প্রবণতার ফলেই ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। এর ফলে নতুন শিল্পায়ন বা পুরনো শিল্প-কারখানায় চলতি মূলধন সরবরাহ করে সেগুলোকে সচল রাখার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়ায় অনেক শিল্প-কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়েছে, কোনোটি গেছে বন্ধ হয়ে। আর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া তো দূরের কথা, পুরনোরা নতুন করে কর্মহীন হয়েছে।
অর্থনৈতিক খাতের এ ভঙ্গুর অবস্থা মোকাবিলা করে তাকে সচল করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে বর্তমান সরকারের ওপর। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ এক কঠিন পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে সরকারকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। সেজন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে। বিগত আমলের দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে যাতে তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেদিকে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা দরকার, দুষ্টচক্র বর্তমানে দৃশ্যমান না থাকলেও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। নতুন রূপে নতুন বেশে তারা আবার হাজির হতে পারে। দুর্নীতির ঘুণপোকা দেশের অর্থনৈতিক খাতকে আর যাতে আক্রান্ত করতে না পারে, সেদিকে সতর্কদৃষ্টি রাখা অতীব জরুরি।