× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যুদ্ধবিরতি: কার জয় কার পরাজয়

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪৯ পিএম

যুদ্ধবিরতি: কার জয় কার পরাজয়

প্রায় পাঁচ সপ্তাহ ধরে তুমুল হামলা-পাল্টা হামলার পর অবশেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছেÑ যা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এক স্বস্তির বার্তা। অবিরাম সংঘাত, ধ্বংস আর প্রাণহানির দগদগে বাস্তবতার মধ্যে এই বিরতি যেন ক্লান্ত মানবতার জন্য এক ক্ষণিক আশ্রয়। প্রতিদিনের বিস্ফোরণ, অনিশ্চয়তা আর ভয়ের আবহে যে অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অস্থির ছিল, সেখানে এই সাময়িক নীরবতা নতুন করে আশা সঞ্চার করছে। তবে এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে জটিল কূটনীতি, হিসাব-নিকাশ আর ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের ইঙ্গিত। তাই এই যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তির হলেও গভীর উদ্বেগেরও যথেষ্ট কারণ আছে। আর সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে যে, এই যুদ্ধবিরতিতে আসলে কার জয়, আর কার পরাজয়?

আপাত দৃষ্টিতে দৃশ্যপটটি একেবারেই স্পষ্টÑ এটি ইরানের এক কৌশলগত বিজয়। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, এই ‘বিজয়’ যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বহুস্তরীয় বাস্তবতা, যেখানে কোনো পক্ষই পুরোপুরি পরাজিত নয়, আবার নিখুঁত বিজয়ীও নয়।

প্রথমেই যে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে, তা হলো ইরানের উত্থাপিত দশ দফা প্রস্তাব। ইরানের রাষ্ট্রীয় মাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নীতিগতভাবে এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলোচনায় সম্মত হয়েছে। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ আগ্রাসন বন্ধের নিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতি, সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার প্রস্তাব বাতিল, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার।

এই দশ দফার অন্তত পাঁচটিও যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে ইরানের জন্য একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হবে। কারণ এগুলো কেবল সামরিক চাপ মোকাবিলার ফল নয়; বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে ইরানের দীর্ঘদিনের দাবির স্বীকৃতি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান Quincy Institute for Responsible Statecraft-এর ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ত্রিটা পারসি এই প্রেক্ষাপটকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যত এই চুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তার মতে, একটি পূর্ণমাত্রার ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হলে তা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত।

পারসির এই বক্তব্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আসল সত্য- যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধবিরতি ছিল প্রয়োজনীয় এক কৌশলগত পিছু হটা। ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে কঠোর হুমকি দিলেও, শেষ পর্যন্ত তারা এমন এক আলোচনার পথে এসেছে, যা মূলত ইরানের প্রস্তাবিত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারেÑ তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত? বিষয়টি এতটা সরলীকরণ করা এখনই যথেষ্ট বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই যুদ্ধবিরতি একটি বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল। মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি যুদ্ধ মানেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিপর্যয়, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল সরবরাহ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যদি পাল্টা আঘাত হিসেবে এই রুটে অস্থিতিশীলতা তৈরি করত, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলত।

সুতরাং যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন তাৎক্ষণিক বিপর্যয় এড়িয়েছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। এটিকে একধরনের ‘কৌশলগত স্থগিতাদেশ’ বলা যেতে পারে, যেখানে যুদ্ধের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সময় কেনা হয়েছে।

তবে এই সমীকরণে সবচেয়ে বড় লাভবান হিসেবে ইরানকে দেখা হচ্ছে কেন?

প্রথমত, ইরান তার মৌলিক কৌশলগত লক্ষ্যগুলো আলোচনার টেবিলে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রকে সেই কাঠামোতে আলোচনায় বসাতে পেরেছে। তৃতীয়ত, সামরিক চাপের মুখেও তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে যায়নি বরং আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করেছে।

বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতি ইরানের জন্য একটি বড় অর্জন হতে পারে। এটি কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; বরং এটি সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন। একইভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনাও ইরানের অর্থনীতির জন্য বিশাল স্বস্তি বয়ে আনতে পারে।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের দাবিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই দফাটি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য পাল্টে দিতে পারেÑ যেখানে ইরান আরও প্রভাবশালী অবস্থানে চলে আসবে। তবে এই ‘বিজয়গাথা’র মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে।

প্রথমত, এটি এখনও একটি চূড়ান্ত চুক্তি নয়; বরং আলোচনার কাঠামো মাত্র। ইরান নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হিসেবে বিবেচিত হবে না। অর্থাৎ এই যুদ্ধবিরতি একটি ‘বিরতি’, সমাপ্তি নয়।

দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের অবস্থান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সমঝোতা ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে, তা নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। ফলে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত তার সমর্থকগোষ্ঠীর কাছে কীভাবে প্রতিফলিত হবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে ‘দৃশ্যমান বিজয়’ ইরানের হলেও, ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ এখনও নির্ধারিত হয়নি।

ইরান এই মুহূর্তে কূটনৈতিকভাবে এগিয়ে আছেÑ তারা তাদের শর্তে আলোচনার ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সংঘাত এড়িয়ে একটি বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে।

অতএব, এই যুদ্ধবিরতিকে একপাক্ষিক বিজয় বা পরাজয়ের চশমায় দেখলে বাস্তবতা ধরা পড়বে না। এটি বরং একটি জটিল কূটনৈতিক অচলাবস্থা, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের ক্ষতি কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত, যদি ইরানের প্রস্তাবিত দফাগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়িত হয়, তবে ইতিহাস এই মুহূর্তটিকে ইরানের এক বিশাল কৌশলগত বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করবে। আর যদি আলোচনা ভেঙে যায়, তবে এই যুদ্ধবিরতি হয়তো কেবল আরেকটি ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


আহসান হাবিব বরুন

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা