ইমেইল থেকে
আমানুর রহমান
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৬ পিএম
একবিংশ শতাব্দীর এই দ্রুতগতির পৃথিবীতে আমরা যেন এক অন্তহীন দৌড়ে মেতেছি। চারপাশের আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রাকে করেছে অভাবনীয় রকম সহজ, কিন্তু এর চরম মূল্য চুকাতে হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান একটি সম্পদ দিয়েÑ আর তা হলো ‘মনোযোগ’। বর্তমান যুগে মনোযোগই হলো সবচেয়ে দামি মুদ্রা। গভীর মনোযোগে কোনো কাজ করার সময় স্মার্টফোনের পর্দায় ভেসে ওঠা একটি নোটিফিকেশনের ‘টুং’ শব্দই আমাদের সেই একাগ্রতা ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আধুনিক সভ্যতার এই মনোযোগহীনতার মহামারির নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে আমাদেরই মস্তিষ্কের একটি বিশেষ রাসায়নিক উপাদানÑ ডোপামিন।
ডোপামিন মূলত একটি ‘ফিল-গুড হরমোন’ বা আনন্দদায়ক অনুভূতি সৃষ্টিকারী নিউরোট্রান্সমিটার। কোনো কাজে পুরস্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে মস্তিষ্ক এই হরমোন ক্ষরণের মাধ্যমে আমাদের এক অদ্ভুত আনন্দ দেয়, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘রিওয়ার্ড মোটিভেশন ইফেক্ট’। সহজ কথায়, এটি আমাদের কাজের প্রেরণা জোগায়। কিন্তু বর্তমান যুগে এই অনুপ্রেরণার উৎসই ফোকাস হারানোর সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, একবার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হলে পুনরায় সেই পূর্ণ ফোকাসে ফিরে যেতে মস্তিষ্কের প্রায় ২৩ মিনিট সময় লাগে। অথচ, আমরা অবিরত সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, কমেন্ট আর মেসেজের ফাঁদে পড়ে নিজেদের সেই অমূল্য সময় ও মনোযোগ বিসর্জন দিচ্ছি।
কয়েক হাজার বছর আগের কথা একবার ভাবুন। আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন গহিন অরণ্যে শিকারে বের হতেন, তখন দীর্ঘ অপেক্ষার পর শিকারের দেখা পেলে তাদের মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নিঃসৃত হতো। সেই ডোপামিন তাদের কঠিন পরিশ্রম ও একাগ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করত। হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের মস্তিষ্কের সেই মৌলিক গঠনে কোনো পরিবর্তন আসেনি, কিন্তু আমূল বদলে গেছে আমাদের চারপাশ। এখন আর ডোপামিন ক্ষরণের জন্য আমাদের কাঠফাটা রোদে শিকারে যেতে হয় না; বরং ১৫ সেকেন্ডের একটি টিকটক বা রিলস ভিডিও স্ক্রল করলেই বিনা পরিশ্রমে মস্তিষ্কে ডোপামিনের বন্যা বয়ে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ওভার স্টিমুলেশন’ বা অতি-উদ্দীপনা।
আধুনিক বিশ্ব এখন ‘সুপারনরমাল স্টিমুলি’তে ভরপুর। এটি আমাদের প্রাকৃতিক চাহিদাকে পাশ কাটিয়ে কৃত্রিম ও চটকদার জিনিসের প্রতি আসক্ত করে তোলে। যেমনÑ একটি সতেজ ও স্বাস্থ্যকর আপেল খাওয়ার চেয়ে প্রিজারভেটিভ মেশানো রঙিন আপেল জুস আমাদের মস্তিষ্ককে বেশি আকর্ষণ করে। ঠিক একইভাবে, বর্তমানের প্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে সাজানো হয়েছে মানুষের মস্তিষ্ককে হ্যাক করার জন্য। এই প্লাটফর্মগুলো আমাদের ডোপামিন লেভেলকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। একটু পর পর সোশ্যাল মিডিয়া চেক না করলে আমাদের ভেতরে তৈরি হয় ‘ফোমো’ বা পিছিয়ে পড়ার তীব্র ভয়। এই মায়াজালে আটকে আমরা প্রতিনিয়ত হয়ে পড়ছি অসহিষ্ণু, ক্লান্ত এবং মানসিকভাবে বিপদগ্রস্ত। এই সর্বনাশা ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে সিলিকন ভ্যালিতে শুরু হয়েছে ‘ডোপামিন ডিটক্স’ বা ডোপামিন উপবাসের ট্রেন্ড। এর লক্ষ্য হলো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে মস্তিষ্ককে সস্তা উদ্দীপনা থেকে দূরে রাখা। তবে সত্যিকারের মুক্তি পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ‘ফ্লো স্টেট’-এ। ফ্লো স্টেট হলো মন ও শরীরের এমন এক নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ, যেখানে মানুষ তার কাজের সাথে সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে যায়। এই অবস্থায় পৌঁছতে হলে নিজেদের আরামদায়ক গণ্ডি বা কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে এসে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও চর্চায় মনোনিবেশ করতে হবে।
দিনশেষে আমাদের একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবেÑ প্রযুক্তি আমাদের দাস হবে, নাকি আমরা প্রযুক্তির দাস হব; সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। যখনই কোনো ম্যানিপুলেটিভ প্রযুক্তি আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিতে চাইবে, অত্যন্ত সচেতনভাবে তাকে প্রতিহত করা আমাদের নিজেদেরই দায়িত্ব। কারণ, নিজের মন এবং জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিখ্যাত আইরিশ কবি উইলিয়াম আর্নেস্ট হেনলির ভাষায় বলতে হয়, ‘আমিই আমার ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক, আমিই আমার আত্মার কাণ্ডারি’। নিজের জীবনের তরী নিজেকেই শক্ত হাতে বাইতে হবে, তবেই এই ডোপামিনের গোলকধাঁধা থেকে আমরা আমাদের হারিয়ে যাওয়া ফোকাস পুনরুদ্ধার করে সফলতার পথে এগিয়ে যেতে পারব।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা