× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

ট্রান্সজেন্ডার: করুণা নয়, অধিকার চায়

মতিলাল দেব রায়

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৩ পিএম

ট্রান্সজেন্ডার: করুণা নয়, অধিকার চায়

আমরা রাস্তাঘাটে বা কোনো মার্কেটে কোনো তৃতীয় লিঙ্গ বা কোনো ট্রান্সজেন্ডার (হিজড়া) সম্প্রদায়ের সাথে দেখা হলে অনেকেই ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেই। কেউবা ওদেরকে সরে যেতে বলি। অথবা আমরা ওদের কাছ থেকে দূরে চলে গিয়ে যেন বাঁচি। কেউবা আবার বিরক্তিও প্রকাশ করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাকা চেয়ে বা জোর করে আদায় করে জীবিকা নির্বাহ করতে দেখা যায় তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের। এমনকি  কিছু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মধ্যে অভ্যাসগত অপরাধী আছে, যারা নানা রকম কুকর্মে অভ্যস্ত, ফলে তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের প্রতি সাধারণ মানুষের অবহেলা ও বৈষম্য লক্ষণীয়।

এই বৈষম্য দূর করতে ও সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে নভেম্বরে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তৎকালীন সরকার। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে প্রায় ১২টি বছর। দীর্ঘ এই সময় পেরিয়ে গেলেও তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি তাদের জীবনের কোনো উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। স্বীকৃতির পর সরকার শুধু মাসিক ৬০০ টাকা করে ভাতা দিচ্ছে, যাদের বয়স ৫০ এবং এর অধিক যা তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তাদের একটি সংগঠন ‘সুস্থ্ জীবন’- এর প্রধানের মতে তাদের অনেক দাবিদাওয়া আছে সরকারের কাছে।

বিগত সরকারের সময়ে তাদেরকে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে সরকার, এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ডাকা হয়, আলোচনা করা হয় কীভাবে তাদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা যায়, তা নিয়ে কথা হয় কিন্তু অগ্রগতি নেই । ঢাকার হাতিরঝিল এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের একটি কমিউনিটি হল আছে। সেখানে এলাকার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ প্রতিদিন সমবেত হন, আড্ডা দেন এবং সারাদিনের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেন কে কোন এলাকায় চাঁদা তুলতে যাবেন ইত্যাদি এখানে নির্ধারণ করা হয়। তাদের একজন সর্দারনি আছেন। তিনি কিছুদিন পর পর এখানে আসেন এবং বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়ে যান।

২০১৫ সালের ১৯ মে সচিবালয়ে এক বৈঠকের সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আগামী বছর (২০১৬) থেকে ট্রাফিক পুলিশ হিসেবে হিজড়াদের নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।’ এই ঘোষণার পরও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি। ইউক্রেনে সেনাবাহিনীতে ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা খুব দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। কারণ তাদের কোনো পিছুটান নেই। বাংলাদেশও এ ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে পারে। সামরিক বাহিনী, ট্রাফিক পুলিশ, আনসার ও বর্ডার গার্ডে (বিজিবি) তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কর্মসংস্থান হলে তাদের দ্বারা সৃষ্ট সামাজিক অস্থিরতা বন্ধ হবে। হিজড়াদেরও সরকারের ওপর আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে।

তৃতীয় লিঙ্গের অনেক লোকজনের তাদের নিয়ে সরকারি/বেসরকারি কর্মসূচির বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। তবে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতির বিষয়ে অনেকের জানা থাকলেও অধিকার ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তারা বলছেন, স্বীকৃতির চার বছর পর তারা শুধু স্মার্টকার্ড পেয়েছেন। নিজস্ব পরিচয়ে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন। কিন্তু এতে ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন মেলেনি। আগেও তারা মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে টাকা তুলে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, এখনও সেটাই করছেন। 

গত ১৩ আগস্ট ২০২২ বাংলা নিউজ ২৪-এ রাজিব সরকারের লেখা একটি সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনাবাড়ী থানাধীন বাইশমাইল মধ্যপাড়া বাঁশতলা হিজড়া পট্টির হিজড়াদের বসবাস। এখানে কিছু অভ্যাসগত অপরাধী হিজড়ার একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা সুস্থ মানুষকে না না প্রলোভন দেখিয়ে সার্জারি করে হিজড়া বানায়। জানা যায়, গত ১০ বছর আগেও সমাজের সবার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন আসাদুল। তার মধ্যে ছিল মেয়েলি ভাব। তখন তিনি আশুলিয়ায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। হঠাৎ হিজড়াদের প্রলোভনে সার্জারি করে ছেলে থেকে হিজড়া বানানো হয় আসাদুলকে। লিঙ্গ পরিবর্তনের মাধ্যমে আসাদুল হয়ে যান টাপুর। টাঙ্গাইলের মধুপুর থানা এলাকার আসাদুল ওরফে টাপুর এভাবেই তার হিজড়া হওয়ার গল্প বলেন। তিনি এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। বাবু ওরফে কাজল ও শহীদ হিজড়া সিন্ডিকেট প্রলোভন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে আসাদুলের মতো আরও অনেক ছেলেকেই লিঙ্গ পরিবর্তন করে হিজড়া বানিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আকুতি জানিয়েছেন।

যারা বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গ তথা হিজড়া নামে পরিচিত, তারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে তারা যেমন বঞ্চনা, নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে, ঠিক তেমনি অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ারও প্রবণতা বেড়ে চলেছে তাদের মধ্যে। ফলস্বরূপ ভুক্তভোগী হচ্ছে সমাজের অনেকেই। মানবাধিকারের মৌলিক নীতিতে, প্রতিটি মানুষের শিক্ষা, সম্মান ও জীবনমান উন্নয়নের সমান সুযোগ থাকার কথা, যেখানে বৈষম্যের সুযোগ নেই। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে সব থেকে বাস্তবসম্মত ভূমিকা রাখতে পারে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের লোহার ব্রিজ এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে তৃতীয় লিঙ্গ মাদ্রাসা। ঢাকার বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, সিলেট বাজার ও কামরাঙ্গীরচর এলাকার দেড় শতাধিক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এই কওমি মাদ্রসায় ভর্তি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য দশজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। যদিও শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার, সমাজের মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর পড়াশোনার সুবিধা নেই বললেই চলে। থাকলেও সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজড়া জনগোষ্ঠী স্টিগমা ও সামাজিক কুসংস্কারজনিত কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই মানুষগুলোকে সেজন্য জীবিকার তাগিদে বেছে নিতে হয় অন্য কোনো পথ। নিজেকে প্রকৃতভাবে জানার জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বিভিন্ন বাধাবিপত্তির কারণে হয়তো আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তাদের স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাদের সেই স্বপ্নকে পূরণ করতে সোশ্যাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (সাদা) এবং সিলেট হিজড়া বাউল সংগঠন যৌথভাবে বাংলাদেশে এই প্রথম শুরু করতে যাচ্ছে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘স্কুল অব হিউম্যান্স’।

২০১৮ সালে বাউবির ওপেন স্কুল কমনওয়েলথ অব লার্নিংয়ের সহায়তায় ‘জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং ও জেন্ডার পলিসি উন্নয়ন’ শীর্ষক কর্মশালা আয়োজন করেছিল। এর মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা গড়ে তোলার একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি হয়। এই নীতিমালায় সরাসরি তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে ‘আদার্স ক্যাটাগরি’ হিসেবে। তবে এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রশ্ন উঠেছেÑ এই স্বীকৃতি বাস্তব ক্ষেত্রে এমন কী পরিবর্তন এনেছে?

একটি স্টল পরিচালনাকারী প্রথম হিজড়া নারী প্রিয়া খানের জীবনের গল্প বদলে দিয়েছে। ক্যাম্পাস থেকে অননুমোদিত বিক্রেতাদের বিতাড়নে তার স্টলটি ১১টির মধ্যে ছিল। যারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে টিএসসি প্রাঙ্গণে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে। প্রায়শই গ্রাহকদের ভিড়ে, স্টলটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তাকে এক মুহূর্ত অলসভাবে বসতে দেখা যায় না। এলাকার অন্যান্য চায়ের স্টলের মতো, তার মেন্যুতে লেবু চা, মাল্টা চা এবং মাল্টোভা চাসহ বিভিন্ন স্বাদের চা রয়েছে। তিনি কফি চা, মশলাদার চা এবং তেঁতুল চা-এর মতো নতুন স্বাদেরও প্রবর্তন করেন, যা কিছু গ্রাহক বিশ্বাস করেন যে সাধারণের চেয়ে বেশি। তার দোকানে কেক, বিস্কুট, পাউরুটি এবং কলা বিভিন্ন ধরনের বিক্রি হয়। যা গ্রাহকদের জন্য এটি একটি জনপ্রিয় টি স্টলে পরিণত করে। প্রিয়ার জীবনে একটি সংজ্ঞায়িত মুহূর্ত এসেছিল জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনের সময়। যখন তিনি এবং তার চারজন শিষ্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসার জন্য স্বেচ্ছায় কাজ করেছিলেন। বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনা শেয়ার করতে চাওয়া হলে, প্রিয়া বলেন, ‘আমরা আর প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসেবে ক্ষান্ত হব না। আমরা সবার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াব এবং একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে অবদান রাখব।’

আমরা সরকারের কাছে হিজড়াদের সুরক্ষায় কার্যকর সহযোগিতা কামনা করি। সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া সত্ত্বেও হিজড়া জনগোষ্ঠী আজও নানা ধরনের বৈষম্য, অবহেলা ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। ফলে জীবিকার তাগিদে তাদের অনেককে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলতে হয়। রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে চায়, তবে হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনের সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমাজে তাদের প্রতি বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হয়ে হিজড়াদের ওপর নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মানবিক ও ন্যায্য সমাজ গড়তে হলে হিজড়া জনগোষ্ঠীর মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সরকার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই তাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব।


মতিলাল দেব রায়

কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা