সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৩ পিএম
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে চলতি বছরে প্রায় ১২ লাখ গরিব বৃদ্ধির শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গত বুধবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে এজন্য ইরান ও আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এর পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জনগণের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়া ইত্যাদিকে গরিবি বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব কার্যালয়ে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বে ধারণা করা হয়েছিল, চলতি বছরে ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যর যুদ্ধসহ বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়তে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। সে বছর নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র তালিকায় যুক্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, যুদ্ধ না থাকলে ২০২৮ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নামতে পারে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এবার দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের ছয়টি খাতে চাপ পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। তা ছাড়া মূল্যস্ফীতি, নিম্ন রাজস্ব আয়, আর্থিক খাতের ঝুঁকি ও বহিঃখাতের চাপের চ্যালেঞ্জ রয়েছে আগের মতোই। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক বলেছে, রাজস্ব খাতে আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকিং খাত এবং অপর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এসবের প্রধান কারণ।
আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতার কারণে দারিদ্র্য বৃদ্ধির যে শঙ্কা বিশ্বব্যাংক করেছে, তাকে অমূলক বলার অবকাশ নেই। বরং বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সে সাক্ষ্যই দেয়। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ যে বৈশ্বিক সংকটের জন্ম দিয়েছে, গ্লোবাল ভিলেজের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ এর বাইরে থাকার কথা নয়, সম্ভবও নয়। আকস্মিক এ সংকট মোকাবিলার পর্যাপ্ত ক্ষমতা যে বাংলাদেশের নেই, তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষত বিগত পনেরো বছরের সীমাহীন লুটপাট দেশের অর্থনীতিকে ঝাঁজরা করে দিয়েছে। মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়েছে অবাধে। রাষ্ট্রীয় কর ফাঁকি দিয়ে পাচারকৃত এসব অর্থ দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও শিল্পায়নকে করে ফেলে সীমিত। অসাধু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশে অর্থ বিনিয়োগ না করে পাচার করে দিয়েছে বিদেশে। ফলে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়েনি মোটেও। বরং আর্থিক সংকটে পড়ে বহুসংখ্যক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে বেকারত্ব বেড়েছে।
অন্যদিকে জনশক্তি রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এ খাতে নতুন কোনো বাজার খুঁজে বের করতে না পারলেও দুর্নীতি-অনিয়ম, কূটনৈতিক ব্যর্থতাসহ নানা কারণে বন্ধ হয়েছে অনেক শ্রমবাজারের দুয়ার। মধ্যপ্রাচ্যের পরে আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সে শ্রমবাজারের দুয়ার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে আছে। বলা বাহুল্য, জনশক্তি রপ্তানি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ভিত হিসেবে বিবেচিত। প্রায় এক কোটি ত্রিশ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের রিজার্ভ স্থিতিশীলতার অন্যতম নিয়ামক। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা হয়েছে বোঝার ওপর শাকের আঁটি। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক খাতে বর্তমানে বিরাজ করছে শঙ্কাজনক পরিস্থিতি। দূরদর্শী পরিকল্পনা ও সঠিক পদক্ষেপ না নিতে পারলে পরিস্থিতি চলে যেতে পারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এই নেতিবাচক ধারা থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো বিশ্বব্যাংক কর্তৃক চিহ্নিত কারণসমূহ পর্যালোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তদনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়ের কোনো বিকল্প নেই। ব্যাংকিং খাতে যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বর্তমানে বিদ্যমান তা মোকাবিলায় সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যেসব শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো পুনরায় চালু করার ব্যবস্থা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী-শিল্পমালিকরা যাতে নতুন কলকারখানা গড়ে তুলতে আগ্রহী ও উৎসাহী হয়, সেজন্য শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। যাতে তারা দেশে উপার্জিত অর্থ দেশেই বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা পায়। তাদেরকে এ নিরাপত্তা দেওয়া গেলে তারা বিদেশে অর্থ পাচারের চিন্তাভাবনা থেকে সরে আসবে।
বিশ্ব যেখানে প্রতিনিয়ত সামনের দিকে এগোচ্ছে, তখন আমাদের দেশে দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধির খবর জনমনে হতাশা সৃষ্টি করবে নিঃসন্দেহে। হতাশ জনগণকে আশ্বস্ত করা এবং তাদের দারিদ্র্য দূর করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। একমাত্র জনবান্ধব অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা সম্ভব। পাশাপাশি দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে গ্রহণ করতে হবে শূন্য-সহিষ্ণুতা।