নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫১ পিএম
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কয়েকটি নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের আলোচনা হয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী দেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য দুই বছরের একটি ডেডলাইন ঘোষণা করেছেন। এরকম উদ্যোগ আগেই নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কেননা দুই বছর ধরে ব্যবসায়ীরা একেবারে দিশাহারা অবস্থার মধ্যে আছে। মূলত ব্যবসায়ীদের সমস্যা শুরু হয়েছে পাঁচ বছর আগে থেকে, যখন করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব-অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়েছিল। আগের সব সমস্যা সামাল দিতে পারলেও বিগত দুই বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ব্যবসায়ীরা যে মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন, সেটি আর কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। এরকম একটি সংকটজনক অবস্থায় অনেক বেশি দেরি হওয়ার আগেই দেশের সরকারপ্রধানের সাথে ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সরাসরি আলোচনা নিঃসন্দেহে একটি ভালো দিক।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের আলোচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ১. ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার, ২. বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিরাজমান প্রতিবন্ধকতা সমূলে উৎপাটন, ৩. শিল্পায়নের ক্ষেত্রে যে সকল সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ আছে, সেগুলোর সমাধান, ৪. জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান এবং ৫. সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় যে বিঘ্ন ঘটেছে, সেটি জরুরি ভিত্তিতে ঠিক করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত হচ্ছে দেশের প্রথিতযশা ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি বেসরকারি খাত পরামর্শক কাউন্সিল গঠন করা। প্রধানমন্ত্রীর সাথে ব্যবসায়ীদের আলোচনার কয়েক দিন আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ঘোষণা করেছেন যে তিনি বন্ধ হওয়া মিলকারখানা চালু করার ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের পাশে থাকবেন এবং এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবেন। ব্যবসা এবং বিনিয়োগের সমস্যা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর দুই বছরের ডেডলাইন ঘোষণা এবং বন্ধ মিলকারখানা চালুর ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সহযোগিতার আশ্বাস খুবই সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ, যা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করবে।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনায় যে সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়েছে, তা মূলত একটি চলমান প্রক্রিয়া। দেশের অর্থনীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যখন স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করে, তখন এই ধরনের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। কেননা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত করা এবং বিনিয়োগের গতি আনতে অনেক প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে, যা দূর করা অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমাদের দেশে এখন স্বাভাবিক অবস্থা একেবারেই নেই। কি ব্যবসা-বাণিজ্য বা কি অর্থনীতি; কোনো ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে না। আমাদের দেশে বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এমন কিছু প্রতিবন্ধকতা এবং জটিলতা আছে, যা দুই বছর কেন, আগামী দশ বছরেও দূর করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। যেমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবর্তন সাধিত হওয়ায় এখন এশিয়ার অনেক দেশ ‘বিক্রয় অথবা ফেরত এবং পরে অর্থ পরিশোধ’ পদ্ধতিতে পণ্য রপ্তানি করছে। অর্থাৎ, প্রথমে রপ্তানি পণ্য পাঠিয়ে দিতে হবে আমদানিকারক বা রিটেইল স্টোরের মালিকের কাছে এই শর্তে যে তারা যা বিক্রি করতে পারবে, তা বিক্রি করে মূল্য পাঠিয়ে দেবে। আর যেগুলো বিক্রি হবে না সেগুলো ফেরত পাঠিয়ে দেবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে, বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং যথেষ্ট আধুনিকতার ছাপ লেগেছে। যেমন, অনেক ক্ষেত্রেই রপ্তানিকারক আমদানিকারকের দেশে নিজ দায়িত্বে পণ্যসামগ্রী পাঠিয়ে নিজেদের গুদামে সংরক্ষণ করে এবং সেখান থেকে রিটেইল স্টোরের চাহিদা মোতাবেক পণ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়। রপ্তানি পণ্যের মূল্য পাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে অবশ্য স্ট্যান্ডবাই এলসি নেওয়া হয়। আমাদের দেশে এই ধরনের রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক যুগের বেশি সময় লেগে যাবে। পক্ষান্তরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি সঞ্চার করতে কিছু সিদ্ধান্ত আছে, যা তাৎক্ষণিক গ্রহণ করা প্রয়োজন। এসব সিদ্ধান্ত দুই বছর কেন, দুই মাসও বিলম্ব করার সুযোগ নেই। যেমন, যেসব ব্যবসায়ীর ব্যবসা চালু আছে, কিন্তু ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, সেসব ব্যবসায়ীর ব্যাংকঋণের সমস্যা দূর করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় পরিচালনা করতে যে মাপের ব্যাংকঋণের প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করা উচিত। এমনকি ব্যাংকঋণের ওপর সুদের হার হ্রাস করা প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে ব্যাংকঋণের ওপর সুদের হার ১৫% বা তার বেশি। এত উচ্চ হারের সুদে ঋণ নিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে ব্যবসা করে সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব। কেননা এত উচ্চ সুদে ঋণের টাকা প্রতি পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। যদি কোনো ব্যবসায়ী ১৫% বা তার অধিক হার সুদে ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে, সেই ঋণ পাঁচ বছরে সুদে-আসলে দুই কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। দেশে খুব কমসংখ্যক ব্যবসায়ী আছেন, যারা পাঁচ বছরে এক কোটি টাকা ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করে এক কোটি টাকা মুনাফা করতে পারবে। ফলে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি হয়ে যেতে পারে।
ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করে নেওয়া। অথচ এই পুনঃতফসিল করার বিষয়টি এমন জটিল করে রাখা হয়েছে, তাতে অধিকাংশ ব্যবসায়ী এই ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা নিতেই পারছে না। অথচ পদ্ধতিটা সহজ করা যেত। যেহেতু এই ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা পাবে নিয়মিত ব্যবসায়ীরা, তাই তাদের নগদ প্রবাহ বা ক্যাশ-ফ্লোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে দশ/পনেরো/বিশ বা পঁচিশ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেটি না করে দশ বছরের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তাতে মাসিক কিস্তির পরিমাণ ঋণগ্রহীতার নগদ প্রবাহের মধ্যে থাকুক বা না থাকুক। এই ধরনের ঋণ পুনঃতফসিল কোনো কাজে আসে না।
দেশের পুঁজিবাজার স্তিমিত হয়ে আছে বেশ কয়েক বছর ধরে। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহের পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। তা ছাড়া অর্থনীতি যেভাবে এগিয়েছে এবং আগামীতে যেভাবে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির সম্ভাবনা আছে বলে মনে করা হচ্ছে, তাতে সেই মাপের অর্থনীতিকে সাপোর্ট করার জন্য একটি কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট থাকা অপরিহার্য। বন্ড মার্কেট থাকার সুবিধা অনেক। প্রথমত, সরকার ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংগ্রহের জন্য ব্যাংকঋণের পরিবর্তে বন্ড মার্কেট থেকে অপেক্ষাকৃত অল্প সুদে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদের ঋণের পরিবর্তে অল্প সুদের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলো অল্প সুদে ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রদানের জন্য উচ্চ সুদের হারের আমানতের ওপর নির্ভর না করে অল্প সুদে বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। এ কারণেই দেশে কার্যকর সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন অনতিবিলম্বে।
ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে দেশের সরবরাহ বা সাপ্লাই চেইনে চরম অব্যবস্থা এবং নৈরাজ্য। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে দেশে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা, যেখানে উৎপাদন মৌসুমে পণ্য সংগ্রহ করে আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের মাধ্যমে সারা বছর ধরে নিয়মিত সরবরাহ করা যায়। এর ওপর আছে পদে পদে এবং ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অবশ্য সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন এখনই এবং তা কার্যকরও করা প্রয়োজন অনতিবিলম্বে। কর, ভ্যাট এবং শুল্ক নিয়েও ব্যবসায়ীদের সমস্যা এবং ভোগান্তির শেষ নেই। বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষেই আলোচনা আছে। এনবিআর থেকে অভিযোগ করা হয় যে ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ সঠিকভাবে কর প্রদান করে না। আবার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ হচ্ছে, কর দিতে যেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। উভয় পক্ষের অভিযোগের কিছু সত্যতা একেবারে যে নেই, তেমন নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবস্থা এমন যে ব্যবসায়ীরা কর পরিশোধের চেয়ে কর পরিশোধ করতে যেতেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। অবস্থা যাই হোক না কেনÑ এসব অভিযোগ কাটিয়ে করবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, যেখানে ব্যবসায়ীরা কর পরিশোধ করতে ভয় পাবে না, বরং কর পরিশোধ না করতে ভয় পাবে।
ব্যবসা এবং বিনিয়োগে গতি আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এরকম দাবি করার সময় হয়নি। এখনও একটা উত্তেজনাকর বা অনিশ্চয়তার পরিবেশই বিরাজ করছে। বিভিন্ন দলের মধ্যে যদি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কখনোই সেভাবে নিশ্চিত হবে না। আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো ব্যবসায়ী বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করবে না। আমাদের স্বাধীনতার পর দেশে অনেক উত্থান-পতন ঘটেছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা কখনোই সেভাবে আক্রান্তের শিকার হয়নি, যেমনটা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আগামী দশ থেকে বিশ বছর সামনে রেখে। তাই তারা এখন কীভাবে আস্থা রাখবে যে আজ থেকে দশ/পনেরো বছর পরে তাদের বিনিয়োগ আবার আক্রান্ত হবে না। তারা তখনই আশ্বস্ত এবং নিশ্চিত হবে যখন দেখবে যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিরাজ করছে। আর তেমনটা না হলে, ব্যবসায়ীরা হয়তো সাহস করে কিছু বলবে না, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগও করবে না। ব্যবসা চালু রাখার জন্য যতটুকু বিনিয়োগ না করলেই নয়, ঠিক ততটুকু করেই বসে থাকবে। ফলে দেশের অর্থনীতি চলবে ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা উন্নতি বলতে যা বোঝায়, সেটা হয়তো কঠিন হয়ে যাবে। এ কারণেই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দুই বছরের ডেডলাইনের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও প্রয়োজন।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা