চেঞ্জ নাও সামিট-২০২৬
আবু জুবায়ের
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪৮ পিএম
আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৭ পিএম
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড প্যালেসের সুবিশাল ও রাজকীয় কাচের গম্বুজের নিচে আবারও এক অভূতপূর্ব বৈশ্বিক জাগরণের উন্মেষ ঘটেছে। তবে এবারের এই সমারোহ সাধারণ শিল্প বা প্রযুক্তির প্রদর্শনী বললে ভুল হবে মানবজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চূড়ান্ত ও অত্যাবশ্যকীয় প্রয়াস হিসাবে দেখতে পারি। ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রভাব-সৃষ্টিকারী এবং জলবায়ু সমাধানের যুগান্তকারী সম্মেলন ‘চেঞ্জ নাও সামিট ২০২৬’। এই অভাবনীয় সম্মেলনে বিশ্বের ১৪০টি দেশ থেকে প্রায় ৪০,০০০ অংশগ্রহণকারী, ১০,০০০ করপোরেট ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান, ১,২০০ প্রভাব-বিনিয়োগকারী এবং ৫০০-এর বেশি বৈশ্বিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধি একত্রিত হয়েছেন। ১০০০টি সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবসম্মত উদ্ভাবনী সমাধানের পসরা সাজিয়ে গ্র্যান্ড প্যালেস এমন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে নীতিনির্ধারক, শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী, আদিবাসী নেতা, প্রতিবাদী তরুণ জলবায়ুকর্মী এবং করপোরেট নির্বাহীরা এক ছাদের নিচে এসে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্যের মতো অস্তিত্বগত সংকটগুলো মোকাবিলার টেকসই পথ খুঁজছেন। বিশ্লেষকদের সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে, এটি কেবল একটি সম্মেলন নয় আগামী দশকের বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্ধারিত দিকনির্দেশনাও বটে, যার পরবর্তী আসর ২০২৭ সালের ২৬ থেকে ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রাক-নিবন্ধন ইতোমধ্যে পূর্ণোদ্যমে চলমান রয়েছে।
২০২৬ সালটি বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মাইলফলক। ২০১৫ সালে এই প্যারিস নগরীতেই স্বাক্ষরিত হয়েছিল যুগান্তকারী ‘প্যারিস চুক্তি’। দীর্ঘ এক দশক পর, সেই চুক্তির সাফল্য, ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন উপস্থাপিত হয়েছে এবারের চেঞ্জ নাও সামিটে। উদ্বোধনী দিনের উচ্চপর্যায়ের গাম্ভীর্যপূর্ণ আলোচনায় প্যারিস চুক্তির অন্যতম রূপকার এবং কপ-২১-এর তৎকালীন সভাপতি লঁরা ফাবিয়ুস গভীর উদ্বেগের সাথে বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, প্যারিস চুক্তির কাঙ্ক্ষিত সাফল্য সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করেছিল বিজ্ঞান, সুশীল সমাজ এবং সরকারগুলোর সম্মিলিত ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ওপর। বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানের কারণে এই ঐক্য চরম হুমকির সম্মুখীন। আয়ারল্যান্ডের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের অগ্রণী প্রবক্তা মেরি রবিনসন জলবায়ু পদক্ষেপের একেবারে কেন্দ্রে ‘ন্যায়বিচার’-কে অধিষ্ঠিত করার ওপর প্রবল জোর দেন। তার সুচিন্তিত মতানুসারে, ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, নতুন সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে জলবায়ু ন্যায়বিচার কেবল একটি নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং অর্থবহ ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক জোট গঠনের এক অবিচ্ছেদ্য পূর্বশর্ত। একই সাথে, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা ফেক নিউজের এই ভয়াল যুগে বিজ্ঞান ও সত্যকে পুনরায় নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে সগৌরবে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ‘উই ডোন্ট হ্যাভ টাইম’ প্লাটফর্ম বিজ্ঞানকে পুনরায় মহান করার এক সুদূরপ্রসারী বৈশ্বিক ক্যাম্পেইন চালু করেছে।
চেঞ্জ নাও সামিটের অন্যতম প্রধান ও সর্বজনীন আকর্ষণ ছিল জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের বরেণ্য পরিচালক এবং ‘প্ল্যানেটারি বাউন্ডারিজ’ বা গ্রহের সীমানা তত্ত্বের প্রখ্যাত প্রবক্তা অধ্যাপক জোহান রকস্ট্রমের উপস্থিতি। বিশ্বনেতৃবৃন্দের সামনে তিনি তার সর্বশেষ বিজ্ঞানভিত্তিক ‘প্ল্যানেটারি হেলথ চেক’ উপস্থাপন করেন, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য এক চরম অশনিসংকেত বা ‘রেড অ্যালার্ট’। বিজ্ঞানভিত্তিক এই রূঢ় প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৃথিবীর স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী ৯টি পরিবেশগত সীমানার মধ্যে ৬টিই ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে, যা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে আমাদের এই সুজলা-সুফলা পৃথিবী একটি অপরিবর্তনীয় এবং চরম বিপজ্জনক অস্থিতিশীলতার দিকে দ্রুতবেগে ধাবিত হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক তথ্যটি উঠে এসেছে মহাসাগরের অম্লকরণ বা ওশান এসিডিফিকেশন প্রসঙ্গে। বিজ্ঞানীদের নিবিড় গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, বিশ্বের মহাসাগরগুলোর ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা অম্লকরণের নিরাপদ সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে, যা প্রবাল প্রাচীর ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক প্রলয়ঙ্করী হুমকি।
সম্মেলনে বিশ্বের এমনসব বরেণ্য ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন, যারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যুগান্তকারী রূপান্তরের নেতৃত্ব প্রদান করছেন। অধ্যাপক জোহান রকস্ট্রম এবং লঁরা ফাবিয়ুসের প্রাঞ্জল আলোচনার পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত ছিলেন ডোনাট ইকোনমিক্স অ্যাকশন ল্যাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা কেট রাওর্থ, যিনি প্রকৃতির নির্ধারিত সীমানার মধ্যে থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাঠামোগত রূপান্তরের অপরিহার্যতার ওপর আলোকপাত করেন। মোনাকোর রাষ্ট্রপ্রধান প্রিন্স আলবার্ট দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন এবং স্বনামধন্য অস্কারজয়ী অভিনেতা ম্যাট ডেমন ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সংকট মোকাবিলায় অর্থনৈতিক সমাধান ও বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক শাসন ব্যবস্থা এবং জলবায়ু কূটনীতিতে আমূল রূপান্তর নিয়ে কথা বলেন ইউএনএফসিসিসি-এর প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার ক্রিস্টিয়ানা ফিগারেস। আইইউসিএন-এর সুযোগ্য প্রেসিডেন্ট রাজান খলিফা আল মুবারক বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩০ শতাংশ স্থল ও জলভাগ সংরক্ষণের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার অনিবার্যতা বিশ্ববাসীকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন। এছাড়া, ইউনিলেভারের সাবেক সিইও পল পোলম্যান টেকসই ব্যবসায়িক মডেল ও করপোরেট দায়বদ্ধতা নিয়ে এবং জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল মেলিসা ফ্লেমিং জলবায়ু সাংবাদিকতায় গণতন্ত্রের সুদৃঢ় ভূমিকা নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের আদি ও অকৃত্রিম কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও যুগান্তকারী বিষয়েও এই সামিটে সুতীব্র ও জোরালো আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি নন-প্রোলিফারেশন ট্রিটি ইনিশিয়েটিভের সুযোগ্য প্রেসিডেন্ট কুমি নাইডু এবং অ্যামাজনের আদিবাসী নেত্রী নেমোন্টে নেংকুইমো বিশ্বনেতৃবৃন্দের চরম নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতার কঠোর সমালোচনা করেন। নেমোন্টে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রশ্ন তোলেন যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো টেকসই সমাধান তৈরি করলেও, বিশ্বনেতাদের কাছে আদতে কোনো বাস্তবসম্মত উত্তর আছে কি না। এই প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক জোহান রকস্ট্রম একটি গভীর দার্শনিক সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন যে, জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মানবজাতি হয়তো বড্ড বেশি দেরি করে ফেলছে। অন্যদিকে, জার্মান জলবায়ুকর্মী লুইসা নিউবাউয়ার বর্তমান সময়ের রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত ও ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের এই বৈরী যুগে সাধারণ মানুষকে পুনরায় জলবায়ু কর্মপরিকল্পনায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পৃক্ত করার জন্য একটি অনুকূল ও উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ সৃষ্টি করাটা সর্বাধিক জরুরি।
প্রযুক্তি এবং ব্যবসায়িক মডেলের কাঠামোগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও এবারের সামিটটি ছিল এক অভাবনীয় মাইলফলক। ইনসিয়াডের স্বনামধন্য অধ্যাপক ফেলিপ মন্টেরো এবং সেন্ট-গোবাইনের মতো বৈশ্বিক নির্মাণসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত সুচারুভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উদ্ভাবনী অনুশীলন ও আন্তঃক্ষেত্রীয় অংশীদারত্বের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। তবে করপোরেট জগতের সব খবরই ইতিবাচক নয়; সম্মেলনে ‘গ্রিনহাশিং’ বা ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে গোপনে পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার মতো নেতিবাচক প্রবণতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই সংকটময় প্রেক্ষাপটে ফ্যাশন শিল্পের সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি নিয়ে একটি যুগান্তকারী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে অপরিকল্পিত রৈখিক উৎপাদন মডেল বা ‘গ্রহণ কর, তৈরি কর, ফেলে দাও’ নীতি থেকে সম্পূর্ণ রূপে বেরিয়ে এসে পুনর্বিক্রয়, মেরামত এবং ডেটা নির্ভর সেবার মাধ্যমে টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রদান করা হয়েছে।
স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তরুণদের অদম্য উদ্ভাবনী শক্তির এক অপূর্ব ও প্রাণবন্ত প্রদর্শনী ছিল জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত ‘ইয়ুথ ইকোপ্রেনিউর অ্যাওয়ার্ডস’। ১২০টিরও বেশি দেশের ১,৫00 আবেদনকারীর মধ্য থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাছাইকৃত তরুণ উদ্যোক্তারা গ্র্যান্ড প্যালেসের মূল মঞ্চে তাদের সমাধানগুলো উপস্থাপন করেন। ল্যান্ড রেস্টোরেশন বা ভূমি পুনরুদ্ধার ক্যাটাগরিতে সম্মানজনক ১০,০০০ ডলারের পুরস্কার জিতে নেন আর্জেন্টিনার স্যাটেলাইটস অন ফায়ারের স্বপ্নদ্রষ্টা ক্যামিলা সা, যিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্যাটেলাইট ডেটার এক অনবদ্য সমন্বয় ঘটিয়ে দাবানলের পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরি করেছেন। গ্রিন বিজনেস সলিউশনস ক্যাটাগরিতে চূড়ান্ত বিজয়ী হন উগান্ডার হেলটন ট্রেডার্স লিমিটেডের উদ্যোক্তা হেলেন মুনিয়াসা, যিনি বর্জ্য প্লাস্টিক বোতল রিসাইকেল করে সাশ্রয়ী মূল্যের সেলাইয়ের সুতায় রূপান্তর করার মাধ্যমে সমাজে এক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন। এছাড়া পাবলিক চয়েস উইনার হিসেবে বার্বাডোজের জশুয়া ফোর্টে এবং ফাইনালিস্ট হিসেবে ফিলিপাইনের মারিয়া উইলভেন্না আনোরা ও মিসরের মোহাম্মদ খালেদ নিজ নিজ অভাবনীয় ও কল্যাণমুখী উদ্ভাবনের জন্য বৈশ্বিক স্বীকৃতি লাভ করেন।
চেঞ্জ নাও সামিটের এই সুবিশাল ও বহুবিধ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ও অসহায় ভুক্তভোগী হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত হলেও এখন সময় এসেছে এই অদম্য দেশটিকে কেবল অনুকম্পার পাত্র হিসেবে না দেখে, উদ্ভাবন এবং ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য ও প্রাণবন্ত পরীক্ষাগার হিসেবে দেখার। এর আগের আসরে ফ্রেন্ডশিপ এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নদীভাঙন-কবলিত বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিছক ‘অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত’ নয়, বরং ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও হৃদয়গ্রাহীভাবে তুলে ধরেছিলেন। এবারের সামিটে ফ্যাশন শিল্পের সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন নিয়ে আলোচনার সময়ও বৈশ্বিক সংঘাত, অর্থনৈতিক মন্দা ও জলবায়ু সংকটের কারণে বাংলাদেশের মতো পোশাক উৎপাদনকারী দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাবের বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে এসেছে। তবে এই সাময়িক হতাশার ঘন অন্ধকারেও আশার প্রদীপ হয়ে অবিচল জ্বলছে বাংলাদেশের তরুণ উদ্ভাবকদের বিশ্বজয়ের গল্প।
ইউএনএফসিসিসির ক্লাইমেট টেকনোলজি সেন্টার অ্যান্ড নেটওয়ার্কের ইনকিউবেটর প্রোগ্রামের অধীনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হয়ে ‘শারি’ (Sharee) নামের একটি সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি উদ্যোগ এই সামিটে সগৌরবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। টেকসই কৃষিকাজের বিভিন্ন সময়োপযোগী সমাধান প্রান্তিক কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করা এই ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ কেবল ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা কোনো নিস্তেজ ও পরমুখাপেক্ষী জনপদ নয়, বরং তথ্যপ্রযুক্তি ও স্টার্টআপ মডেল ব্যবহার করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এক অদম্য যোদ্ধা। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের শোমি হাসান চৌধুরীর মতো তরুণ অধিকারকর্মীদের সরব উপস্থিতির মাধ্যমে বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর ক্রমশ প্রখর, আত্মবিশ্বাসী ও সুদৃঢ় হচ্ছে ।
জলবায়ু পরিবর্তনের রূঢ় অভিঘাত কখনোই লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নয়, আর তাই নারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানের বিষয়টি এই সামিটে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ও পরম গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়েছে। গ্লোবাল সিটিজেনের গিয়ম গ্রোসো বৈষম্যহীন পৃথিবীর রূপরেখা প্রণয়নে অন্তর্ভুক্তিকে ব্যবসায়িক ও সামাজিক অপরিহার্যতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আফ্রিকান উইমেন ইন এগ্রিকালচারাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের আয়োজিত একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সেশনে জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতে নারীদের অবাধ প্রবেশাধিকার এবং জেন্ডার-লেন্স ইনভেস্টিং বা নারীদের কেন্দ্র করে বিনিয়োগ কৌশলের ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একান্তই অপরিহার্য ।
১ এপ্রিল সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সামিটের সমাপনী আসরটি ছিল প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং মানবিকতার এক অভাবনীয়, রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন সংমিশ্রণ। অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস বা এএলএস নামক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ফরাসি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা অলিভিয়ার গোয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে ‘ইনভিনসিবল ভয়েস’ টুলের সাহায্যে তার হারানো কণ্ঠস্বরে কথা বলে উপস্থিত হাজারো দর্শককে নিস্তব্ধ ও অশ্রুসিক্ত করে দেন। তিনি অত্যন্ত গভীর এক বার্তায় বলেন যে, প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মানবিক মর্যাদার নিঃস্বার্থ সেবা করা। অন্ধ ও লাগামহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে অবিরাম ছুটতে গিয়ে মানবজাতি যে বেঁচে থাকার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রকৃতির সাথে আত্মিক সম্পর্ক হারিয়ে ফেলেছে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি তরুণ সমাজকে সফল হওয়ার চেয়ে বরং পৃথিবীর জন্য ‘উপকারী’ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। তার অবিস্মরণীয় ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উক্তিÑ ‘এখনই নিশ্চয়তা। পরে অনুমান-নির্ভর সময়। আর অপেক্ষা করবেন না’ যেন সমগ্র মানবজাতির প্রতি চূড়ান্ত ও অমোঘ সতর্কবাণী।
প্যারিসের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড প্যালেস থেকে সমাপ্ত হওয়া এই সম্মেলন থেকে যে আশাবাদ এবং বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার স্ফুরণ ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নীতি নির্ধারণে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। আর বাংলাদেশের মতো চরম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই সামিটের পরম শিক্ষা হলো, কেবল ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে বসে না থেকে, বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্ভাবন, প্রকৃতির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সবুজ অর্থনীতি এবং অদম্য মানবিক স্পৃহা নিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে অভাবনীয় সাহসিকতার সাথে অবতীর্ণ হওয়া।
আবু জুবায়ের
কবি, গবেষক ও চেঞ্জ নাও সংগঠক