× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সীমান্ত হোক নিরাপদ

জাহিদ ইকবাল

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪৪ পিএম

সীমান্ত হোক নিরাপদ

মানুষের তৈরি সীমান্ত যখন মানুষেরই বুকের পাঁজরের ওপর বিষাক্ত ফণা তোলে, তখন সভ্যতার চকচকে মুখোশটা খসে পড়ে বীভৎস এক কঙ্কাল বেরিয়ে আসে। কাঁটাতারের বেড়ায় তো আগেই আমাদের হৃদ ক্ষতবিক্ষত  করেছে। এখন সেই সীমান্তে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যদি পপ্রাকুতিক প্রাণিকে খুনি হিসেবে ব্যবহারের নীলনকশা করা হয়, তাহলে তা শুধু অমানবিক নয়, বরং  চরম নিষ্ঠুরতা ও নৈতিক দেউলিয়াত্বের উলঙ্গ প্রকাশ। সম্প্রতি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নির্দেশনায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নদী ও জলাভূমিতে বিষধর সাপ ও হিংস্র কুমির ব্যবহারের যে পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে, তা সচেতন ব্যক্তিদের বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। কেননা, এটা কোনো প্রতিরক্ষা কৌশল হতে পারে না। এটি সরাসরি মানবতা, সৎপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের পরিপন্থি  এবং আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন। একবিংশ শতাব্দিতে দাঁড়িয়ে যখন বিশ্বজুড়ে মানুষের অধিকার নিয়ে বড় বড় কথা হচ্ছে, তখন এই বর্বরোচিত পরিকল্পনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মধ্যযুগীয় সেই অন্ধকার সময়কে, যেখানে ক্ষমতার দম্ভে মানুষের প্রাণকে স্রেফ সংখ্যা হিসেবে গণ্য করা হতো। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নিজ দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রতিবেশী দেশের মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে ভূমিকা রাখবে এটাই প্রত্যাশিত। ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে জাহির করে। কিন্তু তাদের এই ‘সাপ-কুমির’ পরিকল্পনা যে গণতন্ত্রের অন্যতম পূর্বশর্ত মানবাধিকারের প্রতি  বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে, এটা বোধকরি তারা খেয়াল করতে পারছেন না।

আমরা যদি বৈশ্বিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিকে তাকাই, তাহলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সহাবস্থানের দৃশ্যই দেখতে পাই। আমেরিকা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিশাল সীমান্ত রয়েছে, যেখানে প্রায়ই হাজার হাজার মানুষ অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। সেখানে দেয়াল তোলা নিয়ে রাজনীতি হয়, বিতর্ক হয়, কিন্তু কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা মন্ত্রী কখনো বলেননি যে ‘রিও গ্র্যান্ডে’ নদীতে ক্ষুধার্ত কুমির ছেড়ে দেওয়া হোক। এমনকি ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সীমান্তেও, যেখানে সংঘাতের মাত্রা চরম, সেখানেও প্রাণিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এমন কুৎসিত প্রস্তাব আধুনিক ইতিহাসে বিরল। 

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার এখনও উন্মুক্ত এবং ১৭৫ কিলোমিটার এলাকা নদী ও জলাভূমি। এই বিশাল অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিএসএফ-এর। কিন্তু আমরা বিগত বছরগুলোতে কী দেখেছি? সীমান্তে ফেলানীর নিথর দেহ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল দীর্ঘ সময়, যা সারা বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমরা দেখেছি কীভাবে সীমান্তে গরু পারাপারের নামে নিরপরাধ মানুষকে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত দুই দশকে সীমান্তে সহস্রাধিক বাংলাদেশি বিএসএফ-এর হাতে প্রাণ হারিয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কেবল ২০২৩ সালেই অন্তত ৩১ জন বাংলাদেশি সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছেন, যার অধিকাংশ ছিল বিনা উস্কানিতে গুলিবর্ষণ। এখন কি তারা  বন্দুকের গুলির খরচ বাঁচাতে কিংবা আন্তর্জাতিক সমালোচনা এড়াতে নিরব হত্যার পন্থা অবলম্বন করতে চাচ্ছেন? 

সীমান্তের এই ‘বিষাক্ত প্রতিরোধ’ ব্যবস্থা কেবল তথাকথিত অনুপ্রবেশকারী নয়, বরং আক্রান্ত করবে সীমান্তের পাড়ে বাস করা হাজারো নিরীহ প্রান্তিক মানুষকেও। বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে নদীগুলোতে যে জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন,  তাদের কী হবে? যে শিশুটি তপ্ত দুপুরে টলটলে জলে ডুব দিয়ে, সাঁতার কেটে অপার আনন্দে মেতে ওঠে, তার নিরাপত্তার গ্যারান্টি কোথায়? কিংবা যে তৃষ্ণার্ত গবাদিপশুকে কৃষক নদীতে জল পান করাতে নিয়ে যায়Ñ তাদের জন্য এই নদীগুলো পরিণত হবে সাক্ষাৎ যমদূতে। সাপ-কুমির তো কোনো দেশের পাসপোর্ট চেনে না, বোঝেনা নগিরিকত্ব। তারা বোঝে শুধু রক্ত-মাংসের স্বাদ। ফলে এমন প্রাণ-সংহারি ব্যবস্থা কোনোভাবেই সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি  হবে পৈশাচিক মারণফাঁদ। এটি আন্তর্জাতিক নদী আইনেরও চরম লঙ্ঘন, কারণ যৌথ নদীগুলোতে এমন হিংস্র জলজ প্রাণী অবমুক্ত করা নদীর প্রাকৃতিক গতি ও মানুষের অধিকারকে খর্ব করে।

এই পরিকল্পনা কেবল মানবিক নয়, ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়েরও কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কৃত্রিমভাবে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জলাভূমিতে বিপুল পরিমাণ বিষধর সাপ ও কুমির ছেড়ে দিলে সেই অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। স্থানীয় জলজ প্রাণিকুল বিলুপ্তির মুখে পড়বে এবং প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। প্রকৃতি যখন মানুষের প্রতিহিংসার হাতিয়ার হয়, তখন প্রকৃতি নিজেই প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। এই সাপ ও কুমিরগুলো যে কেবল বাংলাদেশের দিকেই থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। জোয়ার-ভাটার টানে কিংবা খাবারের সন্ধানে তারা ভারতীয় জনপদেও হানা দেবে। ফলে নিজেদের পাতা ফাঁদে একদিন ভারতকেও রক্তাক্ত হতে হবে। একটি সভ্য রাষ্ট্র কীভাবে এমন অবিবেচক এবং অবৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবতে পারে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক তো কেবল কাগজের দলিল নয়, এটি এক ঐতিহাসিক ও আবেগীয় বন্ধন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সেই সহমর্মিতা ও সহযোগিতা আমরা আজও কৃতজ্ঞতার সাথে হৃদয়ে ধারণ করি। কিন্তু আজ যখন সীমান্তে পশুর মতো মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা হয়, তখন সেই সম্পর্কের ভিত কেঁপে ওঠে। 

ভারতের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ় হওয়া প্রয়োজন। এটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। জেনেভা কনভেনশন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার চার্টার অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র সীমানা রক্ষার নামে এমন কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে না- যা বেসামরিক নাগরিকদের জন্য নির্বিচার মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখনই বিশ্বমহলে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে এই বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাতে হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা জরুরি, কিন্তু তা কখনোই মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে হতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রশ্ন তোলা দরকারÑ ভারত কি তবে মানুষের প্রাণের চেয়ে তার কাঁটাতারকে বেশি মূল্য দেয়?

মানবতা, নৈতিকতা আর স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি মমতাÑ এই হলো আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। ক্ষমতার মোহে যদি সেই ভিত্তিকেই ধ্বংস করা হয়, তবে তা কোনো রাষ্ট্রের জন্যই গৌরব বয়ে আনে না। ভারত যখন নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ দাবি করে, তখন তাদের এই হৃদয়হীন আচরণ কেবল তাদের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকেই ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মনে বপন করছে দীর্ঘমেয়াদি ঘৃণা ও অবিশ্বাসের বিষবীজ। আমরা চাই বন্ধুত্ব, আমরা চাই ব্যবসা ও সংস্কৃতির বিনিময়; আমরা চাই না কোনো বিষাক্ত ফণা কিংবা রক্তমাখা দাঁত। মানুষের রক্ত নদী দিয়ে বয়ে যাবেÑ এমন দৃশ্য সহ্য করার শক্তি কোনো বিবেকবান মানুষের নেই। আপনি নদীকে বিষাক্ত করতে পারেন, কিন্তু সেই বিষের ছোঁয়া থেকে নিজের তীর রক্ষা করতে পারবেন না। এই সাপ আর কুমির একদিন হয়তো তাদেরই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। কারণ প্রকৃতি এবং স্রষ্টা কেউই জুলুম সহ্য করেন না।

প্রতিবেশী হিসেবে আমরা ভারতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা কি একপাক্ষিক হবে? ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের বুঝতে হবে যে, উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষ যখন সীমান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তার ক্ষত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রয়ে যায়। ফেলানির ঝুলে থাকা নিথর দেহটি যেমন আজও আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়, তেমনি সীমান্তের জলাভূমিতে মানুষের রক্ত মিশে থাকলে তা কখনও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সুফল বয়ে আনবে না। আমরা কি এমন এক দক্ষিণ এশিয়া চাই যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলো একে অপরকে হিংস্র পশু দিয়ে ভয় দেখাবে? নাকি এমন এক অঞ্চল চাই যেখানে সহযোগিতা আর ভালোবাসার সীমান্ত থাকবে?

পরিশেষে বলতে চাই, ঘৃণা দিয়ে নয়, মমতা আর সংলাপ দিয়েই প্রকৃত সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। সীমান্তের দুই পাশেই একই লাল রক্ত বয়ে চলা মানুষ বাস করে। তাদের দুঃখ, অভাব আর ভালোবাসা একই রকম। আর মানুষই এই ধরণীর সবচেয়ে বড় সত্য।  আসুন, আমরা এমন এক সীমান্তের স্বপ্ন দেখি যেখানে সাপ বা কুমিরের হিংস্রতা নয়, বরং দুই দেশের মানুষের ভ্রাতৃত্বের হাতছানি থাকবে। স্রষ্টার সৃষ্টিকে যারা তুচ্ছ করে, মহাকাল তাদের কখনোই বীর হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। ইতিহাস কেবল তাদেরই মনে রাখে, যারা মানবতার জন্য কাজ করে। জয় হোক মানবতার, বিনাশ হোক সকল বর্বরতার। মানুষ মানুষের জন্যÑ এই পরম সত্যটিই হোক আমাদের আগামী দিনের পাথেয়। 

আমরা চাই, কাঁটাতারের বদলে হৃদয়ের বন্ধন, গুলির বদলে সহমর্মিতার বার্তা। কারণ দিনশেষে মানুষই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুন্দর ও শক্তিশালী সত্য। সীমান্তের ওপার থেকেও যখন মানবতার কণ্ঠস্বর শোনা যাবে, তখনই কেবল আমাদের সভ্যতা সার্থক হবে। তার আগে পর্যন্ত সাপ-কুমিরের এই বীভৎস রাজনীতি আমাদের সভ্যতার মুখে এক কলঙ্কজনক তিলক হয়েই থাকবে।


জাহিদ ইকবাল

সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা