রাসেল আহমদ
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪২ পিএম
গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরগুলো আবারও পরিচিত এক সংকটের মুখোমুখি। জলাবদ্ধতা, উজানের ঢল এবং নদীর পানির ক্রমবর্ধমান চাপ মিলিয়ে কৃষকের চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে সোনালি স্বপ্নের বোরো ধান। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর যেসব ক্ষেত থেকে ধান ঘরে ওঠার কথা ছিল, সেখানে এখন কোথাও কোমরসমান, কোথাও বুকসমান পানি। কৃষকরা অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নিজেদের জমির দিকেÑ কিছু করার নেই, অপেক্ষা ছাড়া।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শুধু সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলাতেই প্রায় ২৯৫ হেক্টর জমির বোরো ধান ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতির হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে ধরা পড়ে না, পানি নামার পর দেখা যায়, ধান পচে গেছে, শিষ নষ্ট হয়ে গেছে, কিংবা ফলন অর্ধেকেরও কমে এসেছে।
কৃষকের আর্তনাদ : উন্নয়নের ভেতরে অনিয়মের ছায়া
হাওরের কৃষকদের অভিযোগ নতুন নয়। প্রতিবছরই তারা একই সমস্যার মুখোমুখি হন। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, সময়মতো সংস্কার না হওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে থাকে গাফিলতি। কোথাও নিম্নমানের কাজ, কোথাও অসময়ে কাজ শুরু, আবার কোথাও সঠিক নকশার অভাব, সব মিলিয়ে বাঁধ হয়ে ওঠে অকার্যকর। ফলে যে বাঁধ ফসল রক্ষার কথা, সেটিই হয়ে দাঁড়ায় পানি আটকে রাখার ফাঁদ।
এই বাস্তবতায় কৃষকরা অনেক সময় নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেন বাঁধ কেটে দেওয়ার। কারণ, জমিতে পানি জমে থাকলে ধান নিশ্চিতভাবে নষ্ট হবে। বাঁধ কেটে দিলে অন্তত পানি নেমে যাওয়ার সুযোগ থাকে। যদিও এতে অন্য এলাকায় হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থাৎ, এটি এক ধরনের ‘বাঁচা-মরার’ সিদ্ধান্ত।
নজরখালী বাঁধ : এক প্রতীকী উদাহরণ
টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালী বাঁধের ঘটনা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ৮২টি গ্রামের কৃষক প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। এই পুরো এলাকার ফসল নির্ভর করছিল একটি অরক্ষিত বাঁধের ওপর। টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রামসার সাইট হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড সরাসরি বাঁধ নির্মাণ করে না। ফলে প্রতিবছর কৃষকরাই নিজেদের অর্থে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করেন। কিন্তু চলতি বছর অর্থসংকটের কারণে সেই কাজটি যথাযথভাবে করা সম্ভব হয়নি।
ফলাফল ভয়াবহ। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বৌলাই ও পাটলাই নদীর পানি বেড়ে গেলে অরক্ষিত বাঁধ দিয়ে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে। কৃষকরা তড়িঘড়ি করে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রবল স্রোতের কাছে তারা অসহায় হয়ে পড়েন। কয়েক দিনের মধ্যেই তলিয়ে যায় নিচু জমির ধান।
স্থানীয় কৃষক রইচ মিয়া ও নূরুজ্জামান সিদ্দিকির মতো অনেকেই জানাচ্ছেন, তাদের ধান পচে গেছে, এখন তা কোনো কাজে আসবে না। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তারা এখন দিশাহারা। এক কৃষকের কথায়, ‘গত বছরের ঋণই শোধ করতে পারিনি, এবার নতুন ঋণ যোগ হয়েছে। কীভাবে বাঁচব?’
উন্নয়ন বনাম বাস্তবতা : কোথায় ফাঁক?
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাল খনন, স্লুইসগেট নির্মাণসহ নানা পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে এসব উদ্যোগ অত্যন্ত যৌক্তিক। কারণ, হাওর অঞ্চলের মূল সমস্যা হলো পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়া। হাওরের ভেতরে পানি প্রবেশ ও নিষ্কাশনের ছোট নালাগুলো যদি নিয়মিত খনন করা হয় এবং সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মানই এখানে বড় সমস্যা। কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও তার সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছে না।
প্রকৃতি ও নীতির দ্বন্দ্ব
টাঙ্গুয়ার হাওর একটি সংরক্ষিত জলাভূমি। এখানে পরিবেশ রক্ষা একটি বড় অগ্রাধিকার। কিন্তু একই সঙ্গে এই হাওরের ওপর নির্ভর করে লাখো মানুষের জীবিকা। ফলে একটি জটিল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছেÑ প্রকৃতি সংরক্ষণ বনাম মানুষের বেঁচে থাকা। জেলা প্রশাসকের পরামর্শÑ ভবিষ্যতে এখানে চাষাবাদ না করাÑ বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, সেটিও বড় প্রশ্ন। কারণ, বিকল্প জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া কৃষকদের চাষাবাদ থেকে সরে যেতে বলা মানে তাদের আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া।
পূর্বাভাস : স্বস্তি না নতুন শঙ্কা?
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শিগগিরই হাওরাঞ্চলে ১০০ থেকে ১২৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। যদিও বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা কম বলা হয়েছে, তবুও এই অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ইতোমধ্যে জলাবদ্ধ এলাকায় নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কিছুটা কমলেও ধনু-বাউলাই নদীর পানি বাড়ছে। অর্থাৎ, পরিস্থিতি এখনও নাজুক। সামান্য অব্যবস্থাপনাই বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সমাধানের পথ : কী করা জরুরি?
এই সংকট থেকে বের হতে হলে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদিÑ দুই ধরনের পদক্ষেপই প্রয়োজন। প্রথমত, বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় কৃষকদের সম্পৃক্ত করে কাজের মান তদারকি করা গেলে অনিয়ম অনেকটাই কমানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, খাল ও নদী খননকে প্রকল্পভিত্তিক নয়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে নিতে হবে। পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বজায় রাখা ছাড়া হাওর রক্ষা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, স্লুইসগেট ও পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। শুধু বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা সমাধান নয়। নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। চতুর্থত, সংরক্ষিত হাওর এলাকায় বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করে কৃষি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। এতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়বে।
সবশেষে, পরিকল্পনা গ্রহণে স্থানীয় বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। হাওরের কৃষকরাই এই ভূখণ্ডের প্রকৃত বিশেষজ্ঞ, তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত উপেক্ষা করে কোনো পরিকল্পনা টেকসই হবে না।
হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ আজ এক দ্বিমুখী বাস্তবতার প্রতীক। একদিকে এটি কৃষকের আশাÑ ফসল রক্ষার শেষ ভরসা। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে এটি অনেক সময় ফসলহানির ফাঁদে পরিণত হয়। প্রশ্নটি তাই সরল নয়Ñ বাঁধ থাকবে কি থাকবে না। প্রশ্নটি হলো, বাঁধ কেমন হবে, কোথায় হবে, কীভাবে পরিচালিত হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণÑ কার স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
যদি পরিকল্পনা, জবাবদিহিতা ও বাস্তবায়নের সমন্বয় না ঘটে, তবে প্রতিবছর একই দৃশ্য ফিরে আসবে। ডুবে যাবে ফসল, বাড়বে ঋণ, আর কৃষকের চোখে জমবে হতাশার জল। আর যদি এই সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়, তবে হাওর একদিন সত্যিই হতে পারে সম্ভাবনার ভান্ডারÑ যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান হবে টেকসই ও নিরাপদ।
রাসেল আহমদ
সাংবাদিক ও কলাম লেখক