× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থ পাচার

কূটনৈতিক আশ্বাস নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চাই

সহিদুল আলম স্বপন

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৮ পিএম

কূটনৈতিক আশ্বাস নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চাই

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বিশেষ করে অর্থ পাচার রোধ এবং বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেংগলির মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠক নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। কিন্তু এই ধরনের বৈঠক ও আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন কতটা দৃশ্যমান হবে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ, বাংলাদেশের অর্থ পাচার সমস্যার শেকড় এত গভীরে প্রোথিত যে কেবল কূটনৈতিক সদিচ্ছা দিয়ে তা সমাধান সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর ধরন ও কৌশল আরও জটিল হয়েছে। বাণিজ্য মিসইনভয়েসিং, হুন্ডি, ওভার-ইনভয়েসিং কিংবা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মতো প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল প্রতারণা। অনলাইন বিনিয়োগ প্রতারণা, ভুয়া ট্রেডিং প্লাটফর্ম, এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সির অপব্যবহার অর্থ পাচারের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে। ফলে এটি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা রয়েছে যে পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ সুইস ব্যাংকগুলোতে জমা থাকে। তবে বাস্তবতা হলো, শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করলেই সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি কাঠামো, নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্ত প্রক্রিয়া। এখানেই বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে কার্যকর তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় না থাকলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও অকার্যকর হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি সংস্থা যে তথ্য সংগ্রহ করে তা অন্য সংস্থার কাছে সময়মতো পৌঁছে না। ফলে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় এবং অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে যায়।

বাস্তবতা হলো, অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে দূতাবাসগুলোকে একটি সক্রিয় গোয়েন্দা ও সমন্বয়কারী ইউনিট হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকে। অবৈধ অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত একশ্রেণির তথাকথিত ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে তৎপর রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিশেষ করে আগের সরকারের সময় এই চক্রের একটি বড় অংশ সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ সরিয়ে নিতে সক্রিয় ছিল; উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই নেটওয়ার্কেরই কিছু অংশ আবার নতুন করে সক্রিয় হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় কেবল নীতিগত আলোচনা বা কূটনৈতিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়; বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর ভূমিকা আরও সতর্ক, পেশাদার এবং গোয়েন্দা-সংবেদনশীল হওয়া জরুরি।

দূতাবাসগুলোকে এখন প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে একটি প্রো-অ্যাকটিভ এবং গোয়েন্দা-সংবেদনশীল কাঠামোতে রূপান্তরিত করতে হবে। স্বাগতিক দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট এবং আইনশৃঙ্খলা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা তাদের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন, অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি কিংবা বাংলাদেশি নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতায় কোনো আর্থিক অনিয়ম দেখা গেলে তা দ্রুত দেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

বিশেষ করে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দুবাই, যুক্তরাজ্য বা কানাডার মতো দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে আরও বেশি সতর্ক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ, এই দেশগুলোতে পাচার হওয়া অর্থের প্রবাহ থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দূতাবাসগুলো যদি সক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সমন্বয়ের কাজ না করে, তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কখনোই বাস্তব ফল দেবে না। এখানে একটি কঠিন বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে অর্থ পাচার অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকে। ফলে তদন্ত প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রে একই ধরনের অভিযোগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। এই দ্বৈত মানদণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে।

যদি বাংলাদেশ সত্যিই পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে চায়, তবে তাকে প্রথমে এই দ্বৈত নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান হতে হবে সে যে রাজনৈতিক অবস্থানেই থাকুক না কেন। একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে কোনো আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই কার্যকর হবে না।

এই প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, বিদ্যমান আইনগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ অনুসন্ধান ও পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা যেতে পারে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে রিয়েল-টাইম ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। চতুর্থত, দূতাবাসগুলোকে এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

কূটনৈতিক বৈঠক ও আশ্বাস একটি ইতিবাচক সূচনা হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই চূড়ান্ত সমাধান নয়। বাস্তব পরিবর্তন নির্ভর করে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর। বিশেষ করে, দূতাবাসগুলো যদি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে, তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে যাবে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সফল হতে চায়, তবে তাকে কেবল নীতিগত আলোচনা নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।আর সেই পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে জবাবদিহিতামূলক, সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল দূতাবাস ব্যবস্থা। অন্যথায়, এই ধরনের বৈঠক ও আশ্বাস কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাবে না।


সহিদুল আলম স্বপন

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কবি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা